রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের রেলপথ অবরোধের কারণে ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। আজ দুপুরে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের রেলপথ অবরোধের কারণে ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। আজ দুপুরে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে

রাজশাহীতে আট ঘণ্টা পর শিক্ষার্থীদের রেলপথ অবরোধ প্রত্যাহার, ট্রেন চলাচল শুরু

বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রেন টিকিট এক্সামিনারের (টিটিই) বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার প্রতিবাদ করায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) এক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগের ঘটনায় রেলপথ অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছেন শিক্ষার্থীরা।

বিভাগীয় কমিশনার ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ চার দফা দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেওয়ার পর আজ মঙ্গলবার বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়। এ অবরোধের কারণে অন্তত ১০টি ট্রেনের সময়সূচি বিপর্যস্ত হয়েছে।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, অবরোধ প্রত্যাহারের পর ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছে। তবে বেশ কয়েকটি ট্রেনের সময়সূচি বিপর্যস্ত হয়েছে এবং দিনের কয়েকটি ট্রেনের যাত্রা বাতিলও হতে পারে।

সময়সূচি বিপর্যস্ত হওয়া ট্রেনগুলোর মধ্যে আছে পদ্মা, বনলতা, সিল্কসিটি, মহানন্দা, বরেন্দ্র, কপোতাক্ষ, ঢালারচর, ধূমকেতু ও সাগরদাঁড়ি এক্সপ্রেস। এ ছাড়া মধুমতি, তিতুমীর ও টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেসসহ আরও কয়েকটি ট্রেনের সময়সূচি বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা আছে।

আজ বেলা সোয়া ৩টার দিকে অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, তাঁদের দাবিগুলো মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তাঁরা সার্বিক বিষয়ে অত্যন্ত সন্তুষ্ট। অপেক্ষমাণ যাত্রীদের কাছে তিনি সাময়িক দুর্ভোগের জন্য ক্ষমা চান এবং বলেন, এই সাময়িক অসুবিধার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করছেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চার দফা দাবি মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে। আজ মঙ্গলবার দুপুরে তোলা

এর আগে গতকাল সোমবার রাতে পদ্মা এক্সপ্রেসে ঢাকা থেকে রাজশাহী ফিরছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফোরকান উদ্দীন। তিনি টিকিটবিহীন যাত্রীদের কাছ থেকে রসিদ ছাড়া অর্থ আদায়ের প্রতিবাদ করেন। এ সময় টিটিই সুমন আলী তাঁকে মারধর করেন বলে অভিযোগ ওঠে।

এর প্রতিবাদে আজ ভোরে বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসসংলগ্ন চারুকলা এলাকায় রেললাইন অবরোধ করেন। এতে রাজশাহীর সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। অভিযুক্ত টিটিইর শাস্তিসহ চার দফা দাবি জানান তাঁরা। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, পুলিশ, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ, শিক্ষার্থী প্রতিনিধি ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের কর্মকর্তারা বৈঠকে বসেন।

বৈঠকে অভিযুক্ত টিটিই সুমন আলীকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত হয়। পাশাপাশি ঘটনার তদন্তে দুটি কমিটি গঠন করা হয়। একটি কমিটি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের, অন্যটিতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) সদস্য ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি থাকবেন।

এ ছাড়া আহত শিক্ষার্থী ফোরকান উদ্দীনের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে গভীর রাতে চলাচলকারী পদ্মা, সাগরদাঁড়ি ও তিতুমীর এক্সপ্রেসের যাত্রাবিরতি চালু করা এবং আগামী ৬ আগস্ট সিদ্ধান্তগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনায় আবার বৈঠক করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বৈঠক শেষে বিভাগীয় কমিশনার আ ন ম বজলুর রশীদ বলেন, সভায় শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত চারটি দাবি মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটুক।

শিক্ষার্থীর সঙ্গে ঘটে যাওয়া অনভিপ্রেত ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হয়েছে জানিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল আলীম বলেন, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ও বিভাগীয় কমিশনার শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন।

ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় রেলস্টেশনে ভোগান্তি পোহান যাত্রীরা। আজ মঙ্গলবার দুপুরে রাজশাহী রেলস্টেশনে

‘ট্রেন না ছাড়লে যাওয়ার কোনো উপায় নেই’

রেলপথ অবরোধের কারণে ভোগান্তিতে পড়েন রাজশাহীর অসংখ্য যাত্রী। সকাল থেকে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় অনেকেই শেষ পর্যন্ত যাত্রা বাতিল করে ফিরে যান। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কাউন্টার থেকে কাটা টিকিটের টাকা ফেরত দেয়। তবে অনলাইনে টিকিট কাটা যাত্রীদের পরে টাকা ফেরত দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া রহনপুর থেকে আসা খুলনাগামী মহানন্দা এক্সপ্রেস ও ঢাকা মেইল নির্ধারিত সময়ে ছাড়তে পারেনি। রাজশাহীতে প্রবেশের অপেক্ষায় বিভিন্ন স্টেশনে আটকে ছিল ঢালারচর এক্সপ্রেস, ঈশ্বরদী থেকে আসা কমিউটার এক্সপ্রেস, ঢাকা থেকে আসা ধূমকেতু এক্সপ্রেস ও যশোর থেকে আসা কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস।

পাঁচ ঘণ্টার বেশি ট্রেনে বসে ছিলেন জানিয়ে বনলতা এক্সপ্রেসের যাত্রী চিকিৎসক ফেরদৌস ইমতিয়াজ বেলা একটার দিকে প্রথম আলোকে বলেন, আইন অনুযায়ী ওই টিটিইর বিচার হবে, কিন্তু ছাত্ররা তাঁকে সশরীর তাদের সামনে হাজির করতে বলছে, এটার অর্থ মব সৃষ্টি করা। কর্তৃপক্ষ কখনোই এটা করতে পারে না।

একই ট্রেনের যাত্রী ওয়াহিদা রুমি বলেন, ‘আমি একজন স্কুলশিক্ষক। ছুটি নিয়ে একটা কাজে যাচ্ছিলাম। আজ যেতে না পারলে শুধু ছুটিটাই নষ্ট হবে। এই অবরোধে ট্রেন চলবে না, এটা কেন আগেই আমাদের বলা হয়নি? তাহলে সকালেই যাত্রা বাতিল করতে পারতাম।’

আজ দুপুরে রাজশাহী সিল্কসিটি এক্সপ্রেসের একটি বগিতে দেখা যায়, বেশির ভাগ যাত্রী নেমে গেছেন। তবে উল্লাপাড়ার যাত্রী স্বপন ট্রেনেই অপেক্ষা করছিলেন। তিনি বলেন, ‘অনলাইন টিকিটের টাকা ফেরত পেতে ১০ থেকে ১২ দিন লাগবে। আমার কাছে আর নগদ টাকা নেই। তাই ট্রেন ছাড়ার অপেক্ষায় আছি। ট্রেন না ছাড়লে যাওয়ার কোনো উপায় নেই।’

রাজশাহীর স্টেশনমাস্টার হাসানুর রহমান বলেন, যাত্রা বাতিল করা যাত্রীদের টিকিটের মূল্য ফেরত দেওয়া হচ্ছে। অনলাইনে কাটা টিকিটের অর্থ পরে ফেরত দেওয়া হবে।