
বর্তমানে পদ্মা নদীর ভাঙনের কবলে আছে আলম খানকান্দি গ্রামের ১৫০টি পরিবারের বসতবাড়ি ও একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
পঞ্চাশোর্ধ্ব গৃহবধূ নার্গিস আক্তার। তাঁর বাড়ি ছিল শরীয়তপুরের জাজিরার মাঝিকান্দি এলাকায়। পদ্মা নদীর ভাঙনে এক যুগ আগে তাঁর সেই বাড়ি ও ফসলি জমি বিলীন হয়। এরপর পদ্মার আরেক তীরে আলম খানকান্দি গ্রামে বসতি গড়েন। সেই বসতবাড়িও এবার পদ্মার ভাঙনের কবলে পড়েছে।
গতকাল শনিবার দুপুরে ঘরের টিন খুলে রাখছিলেন নার্গিস আক্তার। অন্য আসবাবও ঘর থেকে বের করেন। কিন্তু টিন ও আসবাব কোথায় সরিয়ে নেবেন, তা বুঝতে পারছিলেন না। পরে ৫০০ মিটার দূরে সড়কের পাশে টিন ও আসবাব নিয়ে রাখেন।
শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের আলম খানকান্দি গ্রামে স্বামী ও তিন সন্তান নিয়ে নার্গিস আক্তারের গত ১২ বছরের সংসার। পদ্মার ভাঙনে ফসলি জমি ও ভিটেমাটি হারিয়ে এখন তিনি নিঃস্ব।
আলম খানকান্দি গ্রামে গত দুই মাসে পদ্মার ভাঙনে বসতবাড়ি ও ফসলি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে নার্গিসের মতো তিন শতাধিক পরিবার। বর্তমানে ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে এই গ্রামের আরও ১৫০টি পরিবারের বসতবাড়ি ও একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
হঠাৎ উদ্বাস্তু হয়ে গেলাম। কাগজে–কলমে গ্রামটির নাম এখনো আছে। কিছুদিন পর হয়তো এই নামে কোনো গ্রামের অস্তিত্ব আর থাকবে না।কুদ্দুস ব্যাপারী, বাসিন্দা, আলম খানকান্দি গ্রাম
গতকাল দুপুরে আলম খানকান্দি গ্রামে কথা হয় নার্গিস আক্তারের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা কৃষি পরিবার। ১২ বছর আগে পদ্মার ভাঙনে সব হারাইয়ে ঘুইরা দাঁড়াইছিলাম। জমিতে চাষবাস করে পরিবার নিয়ে দিন কাটছিল। এহন তা–ও গেল। বসতবাড়ি, ১০ বিঘা ফসলি জমি হারাইছি। জানি না ভাগ্যে কী আছে।’
আলম খানকান্দি গ্রামে ২০ বছর আগে বসতি গড়েন নাসির কাজী ও সুফিয়া দম্পতি। পাঁচ বিঘা জমিতে চাষাবাদ করে তাঁদের সংসার চলত। গত সপ্তাহে পদ্মার ভাঙনে ফসলি জমি ও বসতবাড়ি হারিয়ে তাঁরা আশ্রয় নিয়েছেন অন্যের জমিতে।
সুফিয়া প্রথম আলোকে বলেন, দুই ছেলে তাঁদের ভাগের জমি নিয়ে আলাদা হয়ে গেছে। ভিটেমাটি ও জমি হারিয়ে এখন তাঁরা কোথায় যাবেন, কী কাজ করে বেঁচে থাকবেন কিছুই বুঝতে পারছেন না।
গত ৩০ বছরে চারবার ভাঙনের শিকার হয়েছেন আলম খানকান্দি গ্রামের কুদ্দুস ব্যাপারী। নদী বাড়ির কাছে চলে আসায় গতকাল বসতবাড়ি ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নিচ্ছিলেন তিনি।
কুদ্দুস ব্যাপারী প্রথম আলোকে বলেন, ‘হঠাৎ উদ্বাস্তু হয়ে গেলাম। কাগজে–কলমে গ্রামটির নাম এখনো আছে। কিছুদিন পর হয়তো এই নামে কোনো গ্রামের অস্তিত্ব আর থাকবে না।’
শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, পদ্মা নদীর উত্তর তীরে ৩০ বছর আগে জাজিরার পাইনপাড়া মৌজায় চর জেগে ওঠে। সেখানে মানুষ বসতি গড়েন। ওই চরের ছয়টি গ্রাম নিয়ে নাওডোবা ইউনিয়নের ২ নম্বর ও ৩ নম্বর ওয়ার্ড গঠিত। সেখানে দুই বছর আগেও সাড়ে ছয় হাজার মানুষের বসবাস ছিল। ভাঙনের কারণে এখন কমে দেড় হাজারে দাঁড়িয়েছে।
ওই ছয়টি গ্রামের মধ্যে ৩ নম্বর ওয়ার্ডের আলম খানকান্দি গ্রাম একটি। গত আগস্ট মাস থেকে এখানে ভাঙন দেখা দেয়।
পাউবো সূত্র জানায়, গত দুই মাসে এই গ্রামে পদ্মার ভাঙনে ৩০৩টি পরিবারের বসতবাড়ি ও ৬০০ একর ফসলি জমি বিলীন হয়েছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে গ্রামে আলতাফ হোসেন খান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন খান প্রথম আলোকে বলেন, পদ্মা সেতুর পূর্ব দিকে পাইনপাড়া চরটি। তিন-চার বছর ধরে এ চরে ভাঙন দেখা দিয়েছে। তাঁরা পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনেকবার অনুরোধ করেছেন। কিন্তু তারা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বছর পদ্মার ভাঙনে নাওডোবা ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের আহম্মদ মাঝিকান্দি, মঙ্গল মাঝিকান্দি, আলীম উদ্দিন ব্যাপারীকান্দি ও মাঝিকান্দি গ্রাম বিলীন হয়ে যায়। তখন গৃহহীন হয় ১ হাজার ৫০০ পরিবারের বসতবাড়ি। বিলীন হয় ৫ হাজার একর ফসলি জমি। ৫২ নম্বর পাইনপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও রেজিয়া আমিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও নদীগর্ভে চলে যায়।
২০২১ সালে পাইনপাড়া মৌজার চরে সাড়ে ৪ কিলোমিটার পাকা সড়ক নির্মাণ করা হয়েছিল। সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে পদ্মার তলদেশ দিয়ে চরের ছয়টি গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। সাড়ে ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩০ কিলোমিটার বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে ১ হাজার ২০০ গ্রাহককে বিদ্যুৎ দেওয়া হয়। ভাঙনে গত এক বছরে ২২ কিলোমিটার বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ও ৪ কিলোমিটার পাকা সড়ক বিলীন হয়েছে।
গত সপ্তাহে ভাঙনের শিকার ২৭৩টি পরিবারের মধ্যে চাল, ডাল ও শুকনা খাবার বিতরণ করেছেন শরীয়তপুর-১ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য সাঈদ আহমেদ।
আলম খানকান্দি গ্রামে পদ্মার ভাঙনে মানুষের ভিটেমাটি হারানোর বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেন পাউবোর শরীয়তপুর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মিল্টন হোসেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নদীতীরবর্তী অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ভাঙনের মুখে পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হয়ে থাকে। কিন্তু ভাঙন চর এলাকায় হওয়ায় তা রক্ষার জন্য জরুরি কোনো বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে ভাঙন ঠেকাতে এই মুহূর্তে তাঁরা কিছু করতে পারছেন না।