চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে পুরোনো জাহাজ কাটার সময় অসুস্থ হয়ে ১০ জনের প্রাণহানির ঘটনায় শিল্প মন্ত্রণালয়ে প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে বিশেষজ্ঞ দল। জাহাজের ট্যাংকের পানিতে দ্রবীভূত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসকে প্রাথমিকভাবে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে। ট্যাংক থেকে পানি বের করার সময় পানিতে দ্রবীভূত গ্যাসটি মুক্ত হয়ে শ্রমিকেরা এর সংস্পর্শে আসেন বলে ধারণা বিশেষজ্ঞ দলের।
দুর্ঘটনাস্থল সরেজমিন পরিদর্শন করে গত বুধবার শিল্প মন্ত্রণালয়ে প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দেয় বিশেষজ্ঞ দলের সদস্যরা। তবে দলটির তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. ইয়াসির আরাফাত খান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
১৪ আগস্ট সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ নামের একটি জাহাজভাঙা কারখানায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। পুরোনো এলএনজিবাহী জাহাজ ‘এমটি রাসি’র একটি ট্যাংকে কাজ করার সময় দুর্ঘটনাটি ঘটেছে।
আমরা বিস্তারিত বিশ্লেষণের জন্য নমুনা দিয়েছি। পরীক্ষার ফল পাওয়া গেলে পানিতে হাইড্রোজেন সালফাইড কী অবস্থায় ছিল, কীভাবে তৈরি বা জমা হয়েছিল—এসব বিষয়ে আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে।ইয়াসির আরাফাত খান, বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান
অধ্যাপক ইয়াসির আরাফাত খান বলেন, ‘আমাদের প্রাথমিক অনুসন্ধানে ঘটনাস্থলে হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এখন বাতাসে গ্যাসটির উপস্থিতি নেই। তবে পানিতে দ্রবীভূত অবস্থায় এটি ছিল, প্রাথমিকভাবে এমন প্রমাণ আমরা পেয়েছি। ট্যাংকের পানি বের হওয়ার সময় হাইড্রোজেন সালফাইড মুক্ত হয় এবং সেই গ্যাসের সংস্পর্শে আসার কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে বলে আমাদের প্রাথমিক ধারণা।’
অধ্যাপক ইয়াসির জানান, জাহাজটিতে চারটি ট্যাংক রয়েছে। এর মধ্যে একটি ট্যাংকের কাজ আগেই শেষ হয়েছিল। তিন নম্বর ট্যাংকে কাজ করার সময় দুর্ঘটনা ঘটে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ট্যাংকে তখন ডি-ব্যালাস্টিং বা ব্যালাস্টের পানি বের করার কাজ চলছিল। এই পানি বের হওয়ার সময়ই পানিতে দ্রবীভূত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস আকারে মুক্ত হয়ে থাকতে পারে। তখন শ্রমিকেরা গ্যাসটির সংস্পর্শে আসেন।
বাতাসে এখন নেই, নমুনা পরীক্ষাগারে
বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে গিয়ে ট্যাংকের ভেতরের বাতাস ও পানির অবস্থা পরীক্ষা করেছে। অধ্যাপক ইয়াসির আরাফাত খান বলেন, বর্তমানে দুর্ঘটনাস্থলের বাতাসে হাইড্রোজেন সালফাইড শনাক্ত হচ্ছে না। তবে পানিতে দ্রবীভূত অবস্থায় গ্যাসটির উপস্থিতির বিষয়টি আরও নিশ্চিত হতে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা বিস্তারিত বিশ্লেষণের জন্য নমুনা দিয়েছি। পরীক্ষার ফল পাওয়া গেলে পানিতে হাইড্রোজেন সালফাইড কী অবস্থায় ছিল, কীভাবে তৈরি বা জমা হয়েছিল—এসব বিষয়ে আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে।’
বিশেষজ্ঞ দলের সামনে এখনো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। ট্যাংকের পানিতে হাইড্রোজেন সালফাইড কীভাবে তৈরি বা জমা হলো, পানিতে এর ঘনত্ব কত ছিল, পানি বের করার সময় কী পরিমাণ গ্যাস মুক্ত হয়েছিল এবং শ্রমিকেরা কী মাত্রায় গ্যাসটির সংস্পর্শে এসেছিলেন—এসবের উত্তর পেতে বিস্তারিত পরীক্ষার ফলের অপেক্ষা করতে হবে। এ ঘটনায় তিনটি তদন্ত কমিটি কাজ করছে।
এর আগে দুর্ঘটনার পরপরই বিস্ফোরক পরিদপ্তরের পরীক্ষায় ঘটনাস্থলে হাইড্রোজেন সালফাইড শনাক্ত হয়েছিল। দুর্ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঘটনাস্থলে গিয়ে পরীক্ষা চালায় বিস্ফোরক পরিদপ্তর। সংস্থাটির সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক এস এম সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, জাহাজটির যে অংশে শ্রমিকেরা আক্রান্ত হয়েছিলেন, সেখানে তাঁদের যন্ত্রে হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি ধরা পড়ে। তখন বাতাসে গ্যাসটির মাত্রা ছিল ১০ দশমিক ৮ পিপিএম, অর্থাৎ বাতাসের প্রতি ১০ লাখ অংশে ১০ দশমিক ৮ অংশ হাইড্রোজেন সালফাইড ছিল।
সাখাওয়াত হোসেনের ভাষ্য, দুর্ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর পরীক্ষা করায় ওই মাত্রা পাওয়া গেছে; শ্রমিকেরা আক্রান্ত হওয়ার মুহূর্তে গ্যাসটির মাত্রা কত ছিল, তা এই পরীক্ষায় জানা যায়নি।
জাহাজের ট্যাংক ও এর আশপাশের আবদ্ধ অংশে গ্যাসের উৎস খুঁজে দেখা হয়েছে। এখন বিশেষজ্ঞ দলের প্রাথমিক অনুসন্ধানেও ট্যাংকের পানিতে দ্রবীভূত হাইড্রোজেন সালফাইড থাকার তথ্য উঠে এল। তবে দুর্ঘটনার সময় গ্যাসটির ঘনত্ব কত ছিল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অধ্যাপক মো. ইয়াসির আরাফাত খান বলেন, পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
কার্বন মনোক্সাইড পাওয়া যায়নি
দুর্ঘটনাস্থলে অন্য কোনো বিষাক্ত গ্যাস ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছে বিশেষজ্ঞ দল। অধ্যাপক মো. ইয়াসির আরাফাত খান বলেন, এ ধরনের ঘটনায় হাইড্রোজেন সালফাইড ও কার্বন মনোক্সাইড—দুটি গ্যাসই মারাত্মক হতে পারে। তবে তাঁদের পরীক্ষায় কার্বন মনোক্সাইড পাওয়া যায়নি। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কার্বন মনোক্সাইড পাইনি। হাইড্রোজেন সালফাইডই পেয়েছি, বিশেষ করে ট্যাংকের ভেতরের পানির সঙ্গে সম্পর্কিত অবস্থায়।’
বিশেষজ্ঞ দলের সামনে এখনো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। ট্যাংকের পানিতে হাইড্রোজেন সালফাইড কীভাবে তৈরি বা জমা হলো, পানিতে এর ঘনত্ব কত ছিল, পানি বের করার সময় কী পরিমাণ গ্যাস মুক্ত হয়েছিল এবং শ্রমিকেরা কী মাত্রায় গ্যাসটির সংস্পর্শে এসেছিলেন—এসবের উত্তর পেতে বিস্তারিত পরীক্ষার ফলের অপেক্ষা করতে হবে। এ ঘটনায় তিনটি তদন্ত কমিটি কাজ করছে। এর মধ্যে শিল্প মন্ত্রণালয়ের ১১ সদস্যের কমিটিও ঘটনাস্থলে সরেজমিন ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করেছে। তাঁরা জাহাজের ভেতরেও প্রবেশ করেছেন। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুন নাসের খান প্রথম আলোকে বলেন, ১১ সদস্যের তদন্ত কমিটি কাজ করছে। শিগগির প্রতিবেদন জমা পড়বে। তখন বিস্তারিত জানা যাবে।
ফেরদৌস স্টিলের দুর্ঘটনায় প্রথমে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল। আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন আরও একজনের মৃত্যু হওয়ায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ১০ হয়েছে। দুর্ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানটির সব কার্যক্রম স্থগিত করেছে বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড।