২০২৩ সালে পাকস্থলীর তৃতীয় পর্যায়ের ক্যানসার শনাক্ত হয়েছিল নাজমুল হাসানের। চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে পিএইচডি শেষ করেন তিনি। চলতি বছরের শুরুতে আবার চতুর্থ পর্যায়ের ক্যানসার ধরা পড়ে। কঠিন অসুস্থতার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন এই শিক্ষার্থী।

২০২৩ সালে পাকস্থলীর ক্যানসার ধরা পড়েছিল নাজমুল হাসানের। দীর্ঘ চিকিৎসার পর সেবার সেরে উঠেছিলেন তিনি। তবে চলতি বছরের জানুয়ারিতে তাঁর শরীরে আবার ক্যানসার শনাক্ত হয়। এবার রোগটি চতুর্থ পর্যায়ে। তবে কঠিন অসুস্থতার মধ্যেও তিনি দমে যাননি। চিকিৎসার পাশাপাশি গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন এই গবেষক।
নাজমুল হাসান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগের ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা কুমিল্লার কোটবাড়ীতে। তাঁর বাবা বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমিতে (বার্ড) প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা ছিলেন। নাজমুল বার্ডের শিশু বিধান প্রাথমিক বিদ্যালয়, কুমিল্লা জিলা স্কুল এবং ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়াশোনা করেছেন।
পাঁচ ভাই ও এক বোনের মধ্যে নাজমুল সবার ছোট। পরিবারের প্রত্যাশা ছিল, তিনি চিকিৎসক হবেন। তবে মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ না পেয়ে জীববিজ্ঞানের অন্য শাখায় পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগে। স্নাতকে তাঁর সিজিপিএ ছিল ৩ দশমিক ৩৯, স্নাতকোত্তরে ৩ দশমিক ৪০।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উৎসাহে গবেষণার প্রতি আগ্রহ বাড়ে নাজমুলের। বিভাগের অধ্যাপক লিলু ওয়াল মারজানের তত্ত্বাবধানে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে গবেষণায় যুক্ত হন। পরে স্নাতকোত্তর শেষ করার আগেই তাঁর চারটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। তবে তখন গবেষণাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল না তাঁর। পড়াশোনা শেষে চাকরি করতে চেয়েছিলেন তিনি।
চাকরি ছেড়ে পিএইচডি, এরপর গবেষণা
স্নাতকোত্তর শেষ করে ২০১৪ সালে ঢাকায় একটি ওষুধশিল্প প্রতিষ্ঠানে চাকরি শুরু করেন নাজমুল। এক বছর পর যোগ দেন আরেকটি প্রতিষ্ঠানে। প্রায় সাড়ে তিন বছর চাকরি করার পর বিদেশে গবেষণার ইচ্ছা হয় তাঁর। ২০১৭ সালের শেষ দিকে চাকরির পাশাপাশি আইইএলটিএসের প্রস্তুতি শুরু করেন। দিনে অফিস, রাতে পড়াশোনা—এভাবেই চলতে থাকে প্রস্তুতি। চার মাসের চেষ্টায় আইইএলটিএসে ৬ দশমিক ৫ স্কোর করেন তিনি।
এরপর বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের ই-মেইল করতে শুরু করেন নাজমুল। নিজের গবেষণার আগ্রহ ও উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা জানিয়ে এক বছরে তিন শতাধিক অধ্যাপকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। প্রথমে অস্ট্রেলিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলেও পরে সুযোগ পান মালয়েশিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে সেখানে অণুজীবের জিনগত পরিবর্তন নিয়ে পিএইচডি গবেষণা শুরু করেন।
আমার কাছে গবেষণা মানে ব্যক্তিগত সাফল্য অর্জনের নয়। মানুষের কাজে লাগে, এমন কিছু করার সুযোগ চাই।নাজমুল হাসান, গবেষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী
বর্তমানে নাজমুল যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় স্যান ডিয়াগো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে গবেষণা সহযোগী হিসেবে যুক্ত রয়েছেন। একই সঙ্গে ড. ক্রিস্টাল জুনিগারের গবেষণাগারে পোস্টডক্টরাল গবেষক হিসেবে কাজ করছেন তিনি। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের গর্ডন অ্যান্ড বেটি মুর ফাউন্ডেশন থেকে গবেষণা অনুদান পেয়েছেন নাজমুল। সাতজন উদীয়মান পোস্টডক্টরাল গবেষকের জন্য ফাউন্ডেশনটি মোট ১৫ লাখ মার্কিন ডলারের অনুদান দিয়েছে। অনুদান পাওয়া সাতজনের একজন তিনি। সম্প্রতি তাঁর একটি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক একটি সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে তাঁর প্রায় ১০টি গবেষণাপত্র রয়েছে।
পিএইচডির শেষ পর্যায়ে ক্যানসার
নাজমুলের জীবনে বড় ধাক্কা আসে ২০২৩ সালের ৯ মার্চ। তখন মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণার শেষ পর্যায়ে ছিলেন তিনি। ডিগ্রি অর্জনের প্রস্তুতির মধ্যেই চিকিৎসকেরা তাঁর পাকস্থলীর তৃতীয় পর্যায়ের ক্যানসার শনাক্ত করেন। রোগ শনাক্ত হওয়ার মাত্র চার দিন আগেও এক অধ্যাপকের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পোস্টডক্টরাল গবেষণার বিষয়ে কথা হয়েছিল তাঁর।
ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য এক পর্যায়ে গবেষণা থামিয়ে দিতে হয় নাজমুলকে। মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফিরে চিকিৎসার জন্য ভারতে যান তিনি। সেখানে কেমোথেরাপির পাশাপাশি অস্ত্রোপচারও করতে হয়। প্রথম অস্ত্রোপচার চলে টানা ১২ ঘণ্টা। এর মাত্র ১০ দিন পর অন্ত্রে জটিলতা দেখা দিলে দ্বিতীয়বার অস্ত্রোপচার করতে হয়।
চিকিৎসার সেই সময়ের কথা বলতে গিয়ে নাজমুল বলেন, ‘কখনো কখনো সারা দিন এক জায়গায় শুয়ে থাকতে হয়েছে আমাকে। অসহনীয় ব্যথা সহ্য করে দীর্ঘ সময় কাটাতে হয়েছে। দীর্ঘ চিকিৎসার পর ২০২৩ সালের অক্টোবরে পরীক্ষায় ক্যানসারমুক্ত হওয়ার খবর পেয়েছিলাম। ধীরে ধীরে শারীরিক সক্ষমতা ফিরে পেতে শুরু করি। এরপর আবার পিএইচডি করে ডিগ্রি অর্জন করি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উৎসাহে গবেষণার প্রতি আগ্রহ বাড়ে নাজমুলের। বিভাগের অধ্যাপক লিলু ওয়াল মারজানের তত্ত্বাবধানে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে গবেষণায় যুক্ত হন। ডিগ্রি শেষ করার আগেই তাঁর চারটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়।
তবে নাজমুলের সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। চলতি বছরের শুরুতে তাঁর পাকস্থলীর ক্যানসার আবার ফিরে আসে। এবার ধরা পড়ে চতুর্থ পর্যায়ের ক্যানসার। এ ক্যানসারের চিকিৎসা চলছে তাঁর। সেই সঙ্গে চলছে তাঁর গবেষণাও।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক লিলু ওয়াল মারজান বলেন, ‘নাজমুল খুবই মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থী ছিল। আমার পরিচিত ২০ জন পরিশ্রমী মানুষের মধ্যে একজন হবে নাজমুল। আমার মনে হয়, তাঁর এই নিষ্ঠার কারণেই শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও তিনি গবেষণা চালিয়ে যেতে পারছেন। নাজমুল সফল হোক, এটাই আমার চাওয়া।’
যা নিয়ে নাজমুলের গবেষণা
নাজমুলের গবেষণার মূল বিষয় অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু। অর্থাৎ অ্যান্টিবায়োটিক-রেজিস্ট্যান্স। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বলতে এমন এক অবস্থাকে বোঝায়, যখন কতিপয় ব্যাকটেরিয়া অ্যান্টিবায়োটিকের আক্রমণ থেকে বেঁচে থাকার ক্ষমতা অর্জন করে। এসব ব্যাকটেরিয়াকে বলা হয় অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া। এরা অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতিতেও স্বাভাবিক গতিতে বেড়ে উঠতে ও বংশবিস্তার করতে পারে। এতে মানুষ বা পশুর শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা হ্রাস পায়। আগে যে অ্যান্টিবায়োটিকে রোগ সেরে যেত, সেই অ্যান্টিবায়োটিকে তা সারে না।
এই সমস্যা মোকাবিলায় বিকল্প সমাধান খুঁজছেন নাজমুল। জীবাণুর জৈবিক বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে সংক্রমণ মোকাবিলার নতুন কৌশল উদ্ভাবন করাই তাঁর গবেষণার লক্ষ্য। নাজমুল বলেন, ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বর্তমানে বিশ্বস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতিতে বিকল্প চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে গবেষণা ভবিষ্যতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। আমার কাজও সেই বৃহত্তর বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টার অংশ।’
নিজের গবেষণার উদ্দেশ্য সম্পর্কে নাজমুল বলেন, ‘আমার কাছে গবেষণা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য অর্জনের পথ নয়। মানুষের কাজে লাগে, এমন কিছু করার সুযোগ। অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর বিরুদ্ধে বিকল্প কৌশল উদ্ভাবনের চেষ্টা সেই লক্ষ্য থেকেই। নিজের অসুস্থতার মধ্যেও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত থাকার চেষ্টা করছি, যেন মানুষের উন্নত জীবনযাপনে অবদান রাখতে পারি।’
প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে চান নাজমুল। তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি যেমনই হোক, আমি এগিয়ে যেতে চাই। কষ্টের মধ্যেও নিজের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে হবে, বাধা অতিক্রম করে নতুন পথ খুঁজে নিতে হবে। নিজের স্বপ্ন ও বিশ্বাস ধরে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়াটাই সবচেয়ে জরুরি।’