
পত্নীতলা ও ধামইরহাট উপজেলা নিয়ে গঠিত নওগাঁ-২ আসন। কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগের বিগত তিনটি একক নির্বাচন (২০১৪ থেকে ২০২৪) বাদে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক চারটি (১৯৯৬ থেকে ২০০৮) নির্বাচনে দুবার বিএনপি ও দুবার আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা এই আসনে জিতেছেন। এবার একক প্রার্থী থাকায় শুরুতে নির্ভার ছিল বিএনপি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জামায়াতের প্রার্থীর কাছে হেরেছেন বিএনপির প্রার্থী।
অন্যদিকে তিনটি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও বিএনপির নেতা-কর্মীরা ঐক্যবদ্ধ থাকায় পরাজয়ের আশঙ্কা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ঘুরে দাঁড়িয়ে জয় পেয়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা। এ ছাড়া অন্য দুটি আসনে একক প্রার্থী থাকায় প্রত্যাশিত জয় পেয়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা।
নওগাঁ-২ আসনের বিএনপির নেতা-কর্মী ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপি প্রার্থীর হারার পেছনে তিনটি কারণ আলোচনায় আছে। এগুলো হলো সাংগঠনিক দুর্বলতা, সক্রিয় নেতাদের দূরে সরিয়ে রাখা ও বিতর্কিত লোকদের নিয়ে প্রচারণা করা।
অন্যদিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জামায়াতে ইসলামীর ঘরে ঘরে গিয়ে প্রচারণা ও দলে কোন্দল না থাকায় প্রার্থী নির্বাচনী প্রচারণা ও কৌশলে এগিয়ে থাকায় জামায়াত প্রথমবারের মতো জয় পায় নওগাঁ-২ আসনে।
গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নওগাঁর ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে নওগাঁ-২ আসনে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য সামসুজ্জোহা খানকে পরাজিত করে জয় পান জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এনামুল হক। নির্বাচনে এনামুল হক ১ লাখ ৪১ হাজার ৫২৬ ভোট পেয়েছেন। সামসুজ্জোহা খান পেয়েছেন ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৩৩ ভোট। ৬ হাজার ৯৩৩ ভোটে এনামুল হক বিজয়ী হন।
নেতা-কর্মীরা জানান, এবার পরাজয়ের কারণ হিসেবে প্রথমে উঠে আসছে দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা। সামসুজ্জোহা খান ছাড়াও এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন চেয়েছিলেন পত্নীতলা উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য খাজা নাজিবুল্লাহ খান। মনোনয়ন না পাওয়ার পর নাজিবুল্লাহ খান বিদ্রোহী প্রার্থী না হলেও তাঁকে দলের প্রাথমিক সদস্য ও দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। এর পর থেকেই নাজিবুল্লাহ খানের কর্মী-সমর্থকেরা ধানের শীষের প্রচারণায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। এ ছাড়া দলের ত্যাগী নেতা হিসেবে পরিচিত পত্নীতলার নজিপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আনোয়ার হোসেনসহ দলের অনেক সক্রিয় নেতাকে ধানের শীষের প্রচারণা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়।
অভিযোগ আছে, সামসুজ্জোহা খান এলাকায় বিতর্কিত হিসেবে পরিচিত পত্নীতলা উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোকসেদুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল ফারুক, ধামইরহাট উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হানজালাসহ নিজেদের পছন্দের লোকদের নিয়ে প্রচারণা চালানোর কারণে দলের ত্যাগী নেতা-কর্মীরা মুখ ফিরিয়ে নেন।
এ বিষয়ে জানতে সামসুজ্জোহা খানের মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি ধরেননি। তাঁর নির্বাচনী প্রধান এজেন্ট পত্নীতলা উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের প্রার্থীর হারের অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে, আমাদের নেতা-কর্মীরাই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তারা প্রকাশ্যে আমাদের সঙ্গে থাকলেও তলে তলে জামায়াতের পক্ষে কাজ করেছে। এ ছাড়া খাজা নাজিবুল্লাহসহ যেসব নেতা-কর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে, সেটা নির্বাচনের আগে না করলেও হয়তো হতো। নির্বাচনের পর তাঁদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করে দলীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেত। আগেই বহিষ্কার করায় অনেক নেতা-কর্মী নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন।’
নওগাঁ-২ আসন বিএনপির হাতছাড়া হলেও জেলার অন্য পাঁচটি আসনে জয় পেয়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা। তিনটি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকলেও বিএনপির প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন। এই ফলাফলের পরিসংখ্যানে অবাক হয়েছেন বিএনপির নেতা-কর্মীরাই।
নওগাঁ-৩ (মহাদেবপুর ও বদলগাছী) আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও বিএনপির প্রার্থী বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছেন। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন জাতীয়তাবাদী কৃষক দল কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও বদলগাছী উপজেলা বিএনপির সভাপতি ফজলে হুদা বাবুল। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৬৫ হাজার ৬৪৬ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মাহফুজুর রহমান পেয়েছেন ১ লাখ ১৭ হাজার ৮৩৮ ভোট। ৪৭ হাজার ৮০৮ ভোটের ব্যবধানে ফজলে হুদা জয়ী হয়েছেন। বিদ্রোহী প্রার্থী পারভেজ আরেফিন সিদ্দিকী পেয়েছেন ১৭ হাজার ৫৫৪ ভোট।
এ ছাড়া বিদ্রোহী থাকা সত্ত্বেও জয় পেয়েছেন নওগাঁ-১ (নিয়ামতপুর, পোরশা ও সাপাহার) আসনের বিএনপির প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৭৩ হাজার ৮৬৪ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী মাহবুবুল আলম পেয়েছেন ১ লাখ ৫৩ হাজার ৮১৬ ভোট। মোস্তাফিজুর রহমান ২০ হাজার ৪৮ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। বিদ্রোহী প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য ছালেক চৌধুরী পেয়েছেন ১৮ হাজার ৩৫৬ ভোট।
নওগাঁ-২ আসনে নেতা-কর্মীরা ওইভাবে কাজ করেনি হয়তো। পরাজয়ের কারণগুলো খুঁজে বের করে ভবিষ্যতের জন্য আমরা সতর্ক থাকব।মামুনুর রহমান, নওগাঁ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক
নওগাঁ-৬ (রানীনগর ও আত্রাই) আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবির। অনেকের ধারণা ছিল, শক্তিশালী বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় এই আসনে বিএনপির ভোট ভাগাভাগি হয়ে সহজেই জয় পেয়ে যাবেন জামায়াতের প্রার্থী। কিন্তু ভোটের সব হিসেব উল্টে জয় পেয়েছেন বিএনপির প্রার্থী শেখ রেজাউল ইসলাম। তিনি ভোট পেয়েছেন ১ লাখ ৮ হাজার ৭০ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের খবিরুল ইসলাম পেয়েছেন ৯৫ হাজার ৮৮৬ ভোট। ১২ হাজার ১৮৪ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন শেখ রেজাউল ইসলাম।
অন্যদিকে একক প্রার্থী থাকায় নওগাঁ-৪ (মান্দা) ও নওগাঁ-৫ (নওগাঁ সদর) আসনে প্রত্যাশিত জয় পেয়েছেন বিএনপির প্রার্থী ইকরামুল বারী ও জাহিদুল ইসলাম।
নওগাঁয় ছয়টি আসনে বিএনপির প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘তিনটি আসনে বিদ্রোহী থাকায় দলের প্রার্থীর জয় নিয়ে শঙ্কিত ছিলাম। কিন্তু দলের নেতা-কর্মীরা ওই সব আসনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করায় দলের প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন। তবে নওগাঁ-২ আসনে নেতা-কর্মীরা ওইভাবে কাজ করেনি হয়তো। পরাজয়ের কারণগুলো খুঁজে বের করে ভবিষ্যতের জন্য আমরা সতর্ক থাকব।’