আলোঝলমলে কৃত্রিম ঘাসের মাঠে বিকেল নামলেই জমে ওঠে ফুটবল, ক্রিকেটসহ নানা ধরনের খেলা। গত ২৪ মার্চ রাতে নগরের নাদের হাজীর মোড়ে
আলোঝলমলে কৃত্রিম ঘাসের মাঠে বিকেল নামলেই জমে ওঠে ফুটবল, ক্রিকেটসহ নানা ধরনের খেলা। গত ২৪ মার্চ রাতে নগরের নাদের হাজীর মোড়ে

রাজশাহীতে টার্ফের টানে খেলাধুলায় ফিরছেন তরুণেরা, হয়ে উঠেছে নতুন বিনোদনকেন্দ্র

মানুষ টাকা দিয়ে মাঠ ভাড়া করে খেলবে—কয়েক বছর আগেও রাজশাহীতে এমন ধারণা অনেকের কাছেই ‘অবাস্তব’ মনে হয়েছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ধারণা বদলে গেছে। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে গড়ে উঠেছে পাঁচটি কৃত্রিম টার্ফের মাঠ, যার জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়েছে যে, অনেক ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১৫ দিন আগেই মাঠ বুকিং দিতে হয়।

রাজশাহী শহরের উত্তর পাশে বিহাস থেকে বিমানচত্বর পর্যন্ত সড়কের মধ্যে গ্রামীণ পরিবেশঘেরা নাদের হাজীর মোড়। সেখানে ৩০০ থেকে ৪০০ মিটারের মধ্যে রয়েছে পাঁচটি টার্ফের মাঠ। আলোঝলমলে কৃত্রিম ঘাসের মাঠে বিকেল নামলেই জমে ওঠে ফুটবল, ক্রিকেটসহ নানা ধরনের খেলা। কখনো কখনো খেলা গড়ায় রাত পেরিয়ে ভোর পর্যন্ত। কিশোর–তরুণসহ সব বয়সীদের কোলাহলে মাঠগুলো মুখর হয়ে ওঠে। এখন টার্ফ শুধু খেলার জায়গা নয়, হয়ে উঠেছে বিনোদনকেন্দ্র। টার্ফ ঘিরে গড়ে উঠেছে সুইমিংপুল, রেস্তোরাঁসহ নানা সুবিধা।

টার্ফের খেলোয়াড় ও উদ্যোক্তারা বলছেন, মুঠোফোনে ডুবে থাকা প্রজন্ম এখন আবার মাঠমুখী হচ্ছে। বন্ধুবান্ধব নিয়ে দল গড়ে তাঁরা টার্ফে খেলতে ছুটে আসছেন। এতে তাঁদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকছে। পাশাপাশি মাদক থেকেও দূরে থাকছে। আগে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়াদের লক্ষ্য করে টার্ফ বানানো হলেও এখন সব শ্রেণির মানুষ টার্ফে এসে খেলছেন।

শুরুর গল্প

দুই থেকে তিন বছর আগেও রাজশাহীতে টার্ফ ছিল প্রায় অচেনা একটি ধারণা। খেলার ভরসা ছিল খোলা মাঠ। তবে মাঠগুলো দিন দিন কমে আসছিল। সেই শূন্যতা থেকেই শুরু হয় টার্ফ–সংস্কৃতি। শুরুতে অনেকে বিষয়টি নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ধারণা বদলে গেছে। এখন টার্ফ হয়ে উঠেছে নগরের অন্যতম বিনোদনকেন্দ্র।

টার্ফে খেলতে এসে উচ্ছ্বাসে মেতেছেন একদল তরুণ। গত ২৪ মার্চ রাতে নগরের নাদের হাজীর মোড়ে

২০২৪ সালে টার্ফ তৈরির পরিকল্পনা করেন রাজশাহীর একদল তরুণ। নগরের নাদের হাজীর মোড়ে একটি নিচু জমি ইজারা নিয়ে মাটি ভরাট করেন। ওই বছরের ডিসেম্বরে ১১০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৭৬ ফুট প্রস্থের প্রথম টার্ফ মাঠটি উদ্বোধন করা হয়। উদ্যোক্তাদের দাবি, এটিই রাজশাহী তথা উত্তরাঞ্চলের প্রথম টার্ফের মাঠ। এরপর ২০২৫ সালের অক্টোবরে ১৪০ বাই ৯৫ ফুট আয়তনের আরও বড় একটি মাঠ চালু হয়, যা ফিফা স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী নির্মিত। তাঁদের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় আশপাশে আরও টার্ফ গড়ে উঠেছে।

রাজশাহী টার্ফের উদ্যোক্তা সরকার শামীম আহমেদ বলেন, অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে শহরে মাঠ কমেছে। সেই চিন্তা থেকেই তাঁরা টার্ফ শুরু করেন। শুরুতে অনেকে বিষয়টি বুঝতে পারেননি। কিন্তু তাঁদের বিশ্বাস ছিল, ভালো পরিবেশ তৈরি হলে মানুষ আসবে।

শুধু দল আনলেই খেলা যায়

টার্ফগুলোয় নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিয়ে শুধু স্লট কিনতে হয়। পরে নির্দিষ্ট সময়ে মাঠে এলে খেলার যাবতীয় উপকরণ সরবরাহ করে টার্ফ কর্তৃপক্ষ। এমনকি মাঠে কেউ আহত হলে তাঁর প্রাথমিক চিকিৎসাও দেওয়া হয়।

রাজশাহী টার্ফের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা মো. মাহি প্রথম আলোকে বলেন, এখানে দুটি টিম নিয়ে এলেই হয়। এখান থেকে হ্যান্ড গ্লাভস, অ্যাপ্রন, ফুটবলসহ অন্যান্য উপকরণ দেওয়া হয়। মাঠ ভালো হওয়ায় ইনজুরি খুব কম হয়। তারপরও প্রাথমিক চিকিৎসার যাবতীয় ব্যবস্থা রাখা আছে।

ইনডোর পার্ক টার্ফের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সজীব ইসলাম বলেন, ‘বর্তমান প্রজন্ম মুঠোফোনের প্রতি বেশি আসক্ত। আমরা চেয়েছি, তাদের খেলাধুলায় ফিরিয়ে আনতে। এখানে ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, টেবিল টেনিসসহ নানা ধরনের খেলার সুযোগ রাখা হয়েছে, যাতে একে অপরকে দেখে সবাই উৎসাহ পায়।’

গ্রাম থেকে টার্ফে

গত ২৪ মার্চ রাত সাড়ে ৯টা। শহরের সবচেয়ে বড় টার্ফ মাঠে তুমুল খেলা চলছে। মাঠের ভেতরে দর্শকেরা হইহুল্লোড় করছেন। ঠিক বাইরে তখন ৭০ জনের রান্না চলছে। উদ্দেশ্য, খেলা শেষে সবাই একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করবেন। তাঁরা পবা উপজেলার হাট রামচন্দ্রপুর গ্রাম থেকে এসেছেন।

ওই দলের তারিক হোসেন বলেন, ‘আমরা প্রায় ৭০ জন এসেছি। খেলা শেষে এখানেই খাওয়াদাওয়া হবে। আমরা কয়েক দিন আগে দুটি স্লট, মানে তিন ঘণ্টা ভাড়া নিয়েছি। চারটি টিম করে খেলা হচ্ছে। শুধু আনন্দ আর খেলার জন্য এখানে এসেছি। ঈদের আনন্দের সঙ্গে এই ফুটবলও মিশে গেছে। এখানে খরচটা মুখ্য নয়, আনন্দটাই বড়।’
মধ্যবয়সী শোয়েব আলী পেশায় ব্যবসায়ী। এলাকার তরুণ–যুবকদের সঙ্গে তিনিও মাঠে খেলছিলেন। শোয়েব আলী বলেন, ‘আমাদের অনেক ছেলেপেলে এখানে আসে। যারা আগে নেশার সঙ্গে যুক্ত ছিল। খেলার কারণে তারা নেশামুক্ত হয়েছে। এখানকার মাঠ অনেক ভালো। এ জন্য তরুণেরা আগ্রহ দেখাচ্ছে, আমরাও উৎসাহ দিচ্ছি।’

টার্ফের পাশেই রয়েছে রেস্টুরেন্ট। গত ২৪ মার্চ রাতে নগরের নাদের হাজীর মোড়ে

অন্য একটি টার্ফে দেখা যায়, ১৬ জনের একটি দল দেড় ঘণ্টার জন্য মাঠ ভাড়া নিয়েছে। খরচ ভাগ করে নেওয়ায় মাথাপিছু খুব বেশি পড়ছে না। তরুণ আবির হাসান বলেন, ‘আমরা নিয়মিত টাকা জমিয়ে খেলতে আসি। এতে শরীর ও মন দুটিই ভালো থাকে।’

প্রতি বৃহস্পতিবার টার্ফে এসে খেলেন রাজশাহীর একটি শোরুমের কর্মচারীরা। ঈদের সময় ব্যস্ততার কারণে মঙ্গলবার টার্ফে এসেছেন। টাকা সবাই মিলে ভাগ করে নেন। তাঁদের একজন ইয়াসিন আরাফাত বলেন, ‘আমরা সপ্তাহের ছয় দিনই খুব ব্যস্ত থাকি। একটা দিনই খেলার জন্য সময় পাই। এক দিন খেললে মনটা খুব ফ্রেশ হয়।’

রাজশাহীতে বিনোদনের জায়গা কম হওয়ায় টার্ফের জনপ্রিয়তা বাড়ছে বলে মনে করেন প্লে ল্যান্ড টার্ফের উদ্যোক্তা মো. জাহিদ হাসান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা আরও বড় পরিসরে মাঠ তৈরির পরিকল্পনা করছি, যাতে আরও বেশি মানুষ খেলাধুলার সুযোগ পায়।’

বাড়ছে ব্যবসা–বাণিজ্য

শহরের এক পাশে হওয়ায় একসময় নাদের হাজীর মোড় ছিল নিভৃত পল্লি। কয়েক বছর আগে ওই এলাকার মাঝ দিয়ে বাইপাস সড়ক নির্মাণ করা হয়। তার পর থেকে বদলে যেতে থাকে এলাকাটি। ধীরে ধীরে বিভিন্ন খাবারের দোকান হতে থাকে। টার্ফ চালুর পর এলাকাটির আমূল পরিবর্তন হয়েছে। এখানে রাতভর ব্যবসা করেন অনেকে।
নাদের হাজীর মোড়ে ১১ বছর ধরে চায়ের দোকান পরিচালনা করেন মো. সেলিম। আগে শুধু দিনের বেলায় চা বিক্রি করতেন। এখন এলাকার বাইরের অনেকে চা পান করেন। দুই বছর ধরে তাঁর ব্যবসা ভালো চলছে। সেলিম বলেন, ‘এই মোড়ে আগে কিছুই ছিল না। ফাঁকা মাঠ ছিল। পরে বিলের ভেতর দিয়ে রাস্তা হয়। এখানে খেলার মাঠ হওয়ায় ব্যবসা–বাণিজ্য বেড়েছে। রাত দুইটা থেকে তিনটা পর্যন্ত ব্যবসা হয়।’