হাসনাত আবদুল্লাহ
হাসনাত আবদুল্লাহ

কুমিল্লা-৪

‘হাসনাত বিজয়ী হচ্ছেন, এটা সময়ের ব্যাপারের মতো’

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনে বিএনপির প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর অংশগ্রহণের সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেছে বলা চলে। প্রার্থিতা ফিরে পেতে তাঁর করা লিভ টু আপিল খারিজ করে দিয়েছেন আপিল বিভাগ। আইনজীবীরা বলছেন, আদালতের এই আদেশের ফলে বিএনপির প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না।

হাইকোর্টে বিফল হয়ে প্রার্থিতা ফিরে পেতে সর্বোচ্চ আদালতে লিভ টু আপিল করেছিলেন মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী। শুনানি শেষে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের আপিল বিভাগ আজ রোববার লিভ টু আপিল খারিজ করে আদেশ দেন।

এর আগে গত ২১ জানুয়ারি প্রার্থিতা ফিরে পেতে মঞ্জুরুল আহসানের করা রিট খারিজ করে দিয়েছিলেন হাইকোর্ট।

কুমিল্লা-৪ আসনে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ। হাসনাত ছাড়া ভোটের মাঠে আছেন আরও চারজন প্রার্থী। তবে স্থানীয় ব্যক্তিদের অনেকে মনে করছেন, মঞ্জুরুল আহসান নির্বাচন করতে না পারায় ভোটের মাঠে ‘শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী’ নেই হাসনাত আবদুল্লাহর। ফলে তাঁর বিজয় হয়তো ‘সময়ের ব্যাপার’।

মঞ্জুরুল আহসান ভোটের মাঠ থেকে পুরোপুরি ছিটকে পড়ায় কুমিল্লা-৪ আসনের নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে না বলে মনে করেন দেবীদ্বার পৌর এলাকার বাসিন্দা কামাল হোসেন। আজ রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী ভোটের মাঠে হাসনাতের শক্ত প্রতিপক্ষ ছিলেন। তিনি নির্বাচনের মাঠ থেকে পুরোপুরি ছিটকে পড়ায় এই আসনের নির্বাচন সেভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হচ্ছে না। এখন সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ। অন্য প্রার্থী যাঁরা আছেন, তাঁরা সেভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে পারবেন না।’

এই আসনে বর্তমানে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মো. আবদুল করিম হাতপাখা, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের প্রার্থী ইরফানুল হক সরকার আপেল প্রতীক ও গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. আ. জসিম উদ্দিন ট্রাক প্রতীক নিয়ে মাঠে আছেন। খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মোহাম্মদ মজিবুর রহমান দেয়াল ঘড়ি বরাদ্দ পেলেও তিনি হাসনাতকে সমর্থন দিয়ে ভোটের মাঠ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।

এর আগে আসনটিতে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করলেও জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির নির্বাচনী সমঝোতা হওয়ায় জামায়াতের প্রার্থী সাইফুল ইসলাম (শহিদ) মনোনয়ন জমা দেননি। সাইফুল ইসলাম কুমিল্লা উত্তর জেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি। বর্তমানে সাইফুল ইসলামও হাসনাতের পক্ষে ভোটের মাঠে সক্রিয় প্রচারে আছেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)–এর কুমিল্লার সভাপতি শাহ মোহাম্মদ আলমগীর খান মনে করেন, কুমিল্লা-৪ আসনের নির্বাচনে সেভাবে প্রতিযোগিতা হবে না। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী প্রার্থিতা হারানোর কারণে এই আসনে বর্তমানে হাসনাত আবদুল্লাহ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রার্থী কার্যত নেই। এ কারণে বলা যাচ্ছে, এই আসনের ভোটারেরা সেভাবে প্রতিযোগিতা বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখতে পাবেন না। হাসনাত বিজয়ী হচ্ছেন, এটা সময়ের ব্যাপারের মতো।

গত ২ জানুয়ারি রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে যাচাই-বাচাইয়ে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা হয়। তবে ওই দিন হাসনাত আবদুল্লাহ ও তাঁর আইনজীবী হলফনামায় তথ্য গোপনের অভিযোগ তোলেন মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর বিরুদ্ধে। তাঁরা দাবি করেন, বিএনপির প্রার্থীর আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দায় আছে। ব্যাংকের ঋণখেলাপি হওয়ার পরও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে উচ্চ আদালত থেকে তিন মাসের একটি স্থগিতাদেশ এনেছেন তিনি। কিন্তু সেসব তথ্য হলফনামায় উল্লেখ করেননি।

পরে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর আইনজীবী যুক্তি তুলে ধরেন। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে প্রায় এক ঘণ্টা বাহাসের পর রিটার্নিং কর্মকর্তা মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেন।

রিটার্নিং কর্মকর্তার এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে আপিল করেন এনসিপির প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশনে শুনানি শেষে ১৭ জানুয়ারি হাসনাত আবদুল্লাহর আপিল মঞ্জুর করে ইসি। এতে মঞ্জুরুল আহসানের মনোনয়নপত্র অবৈধ ঘোষণা করা হয়। ইসির এই সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে মঞ্জুরুল আহসান ১৯ জানুয়ারি উচ্চ আদালতে রিট করেন। তবে ২১ জানুয়ারি রিটটি সরাসরি খারিজ করে দেন হাইকোর্ট।

সর্বশেষ হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে মঞ্জুরুল আহসান আপিল বিভাগে আবেদন করেন। গত ২৬ জানুয়ারি আপিল বিভাগ এই আবেদনের শুনানি ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত মুলতবি করেন। এর মধ্যে হাইকোর্টের আদেশের প্রত্যায়িত অনুলিপি পেয়ে তিনি নিয়মিত লিভ টু আপিল করেন। ৩০ জানুয়ারি লিভ টু আপিলের ওপর শুনানি শেষে আপিল বিভাগ আজ আদেশের জন্য দিন রাখেন। এখানেও তাঁর করা লিভ টু আপিল খারিজ করে দিয়েছেন আপিল বিভাগ।

দেবীদ্বার পৌর এলাকার বাসিন্দা প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম আতিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী স্থানীয় বিএনপির প্রবীণ নেতা ও এখন পর্যন্ত চারবার জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে চারবারই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। আর জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া এনসিপির নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ ১১-দলীয় জোটের তরুণ প্রার্থী। এ কারণে এই আসনের ভোটারদের প্রত্যাশা ছিল, এবারের নির্বাচনটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। তবে এখন ভোটের মাঠের পরিস্থিতি পুরোপুরি পাল্টে গেছে। বর্তমানে হাসনাতের সঙ্গে লড়াই হওয়ার মতো কোনো প্রার্থী মাঠে নেই।