আগুনে পুড়ে যাওয়া অনেক বাড়িঘরে এখন সিমেন্টের খুঁটি আর ভিটি ছাড়া কিছু নেই। গত ৩০ আগস্ট কিশোরগঞ্জের ভৈরবের আকবরনগর গ্রামে
আগুনে পুড়ে যাওয়া অনেক বাড়িঘরে এখন সিমেন্টের খুঁটি আর ভিটি ছাড়া কিছু নেই। গত ৩০ আগস্ট কিশোরগঞ্জের ভৈরবের আকবরনগর গ্রামে

আকবরনগর-মিরারচর: বাজারের নামের বিরোধে এক মাস ধরে ঘরছাড়া অনেক পরিবার

আকবরনগর না মিরারচর-বাজারের নাম কী হবে, তা নিয়ে কিশোরগঞ্জের ভৈরবে বিরোধের জেরে এক মাস আগে আকবরনগর গ্রামের নয়াহাটির আলী হায়দার, আলী আকবর ও আলী আক্কাসের ঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এখন সেখানে সিমেন্টের খুঁটি আর ভিটি ছাড়া কিছু নেই। এক মাস পর গত ৩০ আগস্ট আবার সেই পোড়া বাড়িগুলোতে আগুন দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আরও কয়েকটি পোড়া বাড়িতেও আগুন দেওয়া হয়।

নতুন করে আগুনে পুড়েছে মিরারচর গ্রামের কয়েকটি ঘরও। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও লুটপাটের ঘটনা ঘটছে। এতে দুই গ্রামের মানুষের মধ্যে আবার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক পরিবার এক মাস ধরে ঘরছাড়া।

পোড়া ঘরে আবার আগুন

সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কের বিভিন্ন স্থানে ইট ও সুরকি পড়ে আছে। সড়কে মানুষের চলাচলও কম। দুই গ্রামের অনেক বাড়িঘরে এখনো পোড়ার চিহ্ন। বিশেষ করে আকবরনগর গ্রামের নয়াহাটি পাড়ায় প্রায় কোনো ঘরই অক্ষত নেই। কোনো বাড়িতে শুধু সিমেন্টের খুঁটি দাঁড়িয়ে আছে। কোনো বাড়িতে ভিটি ছাড়া কিছু নেই। গাছপালাতেও আগুনের চিহ্ন।

এই পাড়ার মিজান মিয়ার ছেলে রোহান (১২)। প্রথম দফার সংঘর্ষে তাদের ঘরও পুড়িয়ে দেওয়া হয়। তার পর থেকে তারা পাশের একটি গ্রামে থাকছে। গত সোমবার সকালে বন্ধু হুসাইন, তারেক ও তানজিমকে সঙ্গে নিয়ে পোড়া বাড়ি দেখতে এসেছিল রোহান।

পোড়া বাড়ির ভিটিতে দাঁড়িয়ে রোহান বলছিল, ‘আমরার পোড়া ঘর আবার পুড়ছে।’ তার বন্ধু হুসাইন বলছিল, মনে হয় আবার পুড়ব। আরেক বন্ধু তারেক রোহানের উদ্দেশে বলে, ‘তোরা থাকলে তোদেরও পুইড়া ফালাইব।’

কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রথম দফার সংঘর্ষে আকবরনগরের নয়াহাটির শতাধিক মানুষ ঘর হারিয়েছেন। তাঁদের অনেকে অন্যত্র বসতি গড়েছেন। এক মাস পরও তাঁরা নিজেদের ঘরে ফিরতে পারেননি।

পোড়া ঘর এখনো সংস্কার হয়নি। যাঁদের ঘর পুড়েছে, তাঁদের অনেকেই আয় হারিয়েছেন। কেউ ঢাকায় গিয়ে রিকশা চালাচ্ছেন। কেউ নিজের ব্যবসা ছেড়ে অন্যের দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করছেন।

উপজেলার কালিকাপ্রসাদ আদর্শপাড়ার জুতা ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন বলেন, পরিস্থিতি ঠিক হয়ে গেলেও মানুষ সহজে আবার নিজ গ্রামে আশ্রয় ফিরে পাবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।

কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান লিটন মিয়ারও ভাষ্য একই। তিনি বলেন, দুই গ্রামের মানুষের আগের জীবনে ফিরে যাওয়া অনেকের পক্ষে কঠিন হতে পারে।

আকবরনগর ও মিরারচর বাজারের নামকরণ নিয়ে সংঘর্ষের পর অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ। গত ৩০ আগস্ট তোলা

বন্ধ বাজার, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা

দুই গ্রামের অর্থনীতি কৃষি, গবাদিপশু পালন ও বিরোধপূর্ণ ওই বাজার ঘিরে। বিরোধের কেন্দ্র সেই বাজারটিও এখন অনেকটা ফাঁকা। এক মাসের আগের ঝগড়ার পর অধিকাংশ বন্ধ দোকান আর খোলেনি। যে কয়েকটা খুলেছিল, নতুন করে সংঘাত শুরুর পর সেগুলোও বন্ধ। বাজারের সবচেয়ে পুরোনো দোকানগুলোর একটি গোলাপ মিষ্টান্ন। স্বাধীনতার আগে থেকে দোকানটি চলছে। এবারের সংঘর্ষে দোকানটি ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছে। চুলাটিও ভেঙে দেওয়া হয়েছে। দোকানের মালিক আকবরনগর গ্রামের।

গত সোমবার দোকানের ধ্বংসাবশেষের সামনে নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন মালিক মানিক মিয়ার বোন রুনা আক্তার। তিনি বলেন, বাজারটির যেমন নামডাক, গোলাপ মিষ্টান্নেরও তেমন নামডাক। সব শেষ করে দিল।

বাজারে খোলা থাকা অল্প কয়েকটি দোকানের একটি আল্লাহর দান ভ্যারাইটিজ স্টোর। দোকানটির মালিক দুই গ্রামের কোনোটিরই বাসিন্দা নন। কর্মচারী মো. রাজ বলেন, এক মাস ধরে ব্যবসা নেই। কোনো দিন দোকান খোলেন, কোনো দিন খোলেন না। ভয় লাগে।

আতকাপাড়া গ্রামের জাহের মিয়ার চা ও শিঙাড়ার দোকান অবশ্য খোলা ছিল। সেখানে কয়েকজন বসে চা খাচ্ছিলেন। জাহের মিয়া বলেন, বাজারে আগে চা ও শিঙাড়ার ৮-১০টি দোকান ছিল। তাঁর দোকান ছাড়া বাকিগুলো আকবরনগর বা মিরারচরের মানুষের। সেগুলো বন্ধ থাকায় তাঁর দোকানে ক্রেতা বেড়েছে।

তবে জাহের মিয়া বলেন, তিনি এমন লাভ চান না। দ্রুত বাজারের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসুক।

সরেজমিনে দেখা গেছে, এবারের সংঘর্ষে অধিক ক্ষতি হয়েছে মিরারচর গ্রামের। ঘর পোড়ানোসহ কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ব্যাপক লুটপাট হয়েছে।

মিরারচর গ্রামের মায়ের দোয়া অটোরিকশার গ্যারেজে গিয়ে দেখা যায়, মালিক খোকন মিয়া গ্যারেজের সামনে বসে আছেন। সংঘর্ষে তাঁর গ্যারেজে ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া হয়।

খোকন মিয়া বলেন, তাঁর ১২টি অটোরিকশা নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অনেক ব্যাটারিও নিয়ে গেছে। ভাঙচুর করা হয়েছে গ্যারেজ। সব মিলিয়ে তাঁর প্রায় ৪০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

আরও কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে লুটপাট হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এবার আকবরনগর গ্রামের কয়েকটি ভবনের আরসিসি পিলারও ভেঙে ফেলা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ছাদ।

আবার যেভাবে সংঘর্ষ

তিন বছর ধরে বাজারের নামকরণ নিয়ে দুই গ্রামের বিরোধ চলছে। এর মধ্যে ব্যক্তিগত ঘটনাও অনেক সময় দুই গ্রামের বিরোধে রূপ নেয়।

সর্বশেষ সংঘর্ষের আগে ১৯ জুলাই সকালে বাজার সড়কে মিরারচর গ্রামের দ্বীন ইসলামের সঙ্গে আকবরনগর গ্রামের রিকশাচালক শরিফ মিয়ার কথা-কাটাকাটি হয়। পরে বিষয়টি বাজারের নামকরণ নিয়ে বিরোধের সঙ্গে যুক্ত হয়।

এর জেরে ২৭ জুলাই প্রথম দফায় বড় সংঘর্ষ হয়। এতে মিরারচর গ্রামের মাসুদ মিয়া ও হিরণ মিয়া নিহত হন। পরে এ ঘটনায় ভৈরব থানায় দুটি হত্যা মামলা হয়। মামলায় আকবরনগর গ্রামের ৮৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। আরও ১৩০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। রোববার এসব মামলার ৪১ আসামি কিশোরগঞ্জ আদালতে হাজির হয়ে জামিনের আবেদন করেন। আদালত তাঁদের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠান।

তিন বছর আগে সড়ক ও জনপথ বিভাগ বাজারের পাশে একটি সচেতনতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন করে। সাইনবোর্ডে মিরারচর বাদ দিয়ে আকবরনগর বাজার লেখা হয়। সেই থেকে বিরোধের শুরু। গত ৩০ আগস্ট তোলা

এ খবর গ্রামে পৌঁছানোর পর আকবরনগরবাসীর মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। মিরারচরবাসীর মধ্যে উল্লাস দেখা যায় বলে স্থানীয় লোকজন জানান। এরপর দুই গ্রামের উত্তেজনা আরও বাড়ে। এর মধ্যে বাজারে মিরারচর গ্রামের দুই যুবককে মারধর করা হয়। এরপরই দুই গ্রামের মানুষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন।

গত ৩০ আগস্ট মিরারচর গ্রামের ছয়টি ঘর নতুন করে পুড়ে যায়। কয়েকটি আগের পোড়া ঘরেও আগুন দেওয়া হয়। একইভাবে আকবরনগর গ্রামের চারটি ঘরে নতুন করে আগুন দেওয়া হয়। আগের পোড়া কয়েকটি ঘরে আবার আগুন দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, দুই গ্রামের সংঘর্ষ হলেই প্রতিপক্ষের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া এখন একধরনের মানসিকতায় পরিণত হয়েছে। ঘর পুড়িয়ে মানুষকে গ্রামছাড়া করার চেষ্টা চলে। সংঘর্ষের সুযোগে কিছু মানুষ লুটপাটও করেন। এবার কয়েক দিন ধরে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। লুটপাট চলেছে প্রায় দুই সপ্তাহ।

মিরারচর ও আকবরনগরে সংঘর্ষ থেমে গেলেও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে সেখানে পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে।
মাহবুবুর রহমান, ওসি, ভৈরব থানা

বিরোধের সূত্রপাত্র কীভাবে শুরু

আকবরনগর ও মিরারচর গ্রামের মাঝ দিয়ে ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়ক গেছে। সড়ক নির্মাণের পর সেখানে একটি বাসস্ট্যান্ড গড়ে ওঠে। ১৯৯১ সালে বাসস্ট্যান্ডের দুই পাশে বাজার বসতে শুরু করে। দীর্ঘদিন বাজারটি ‘আকবরনগর-মিরারচর বাজার’ নামে পরিচিত ছিল।

২০২৩ সালের জুলাইয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগের একটি সচেতনতামূলক সাইনবোর্ডে শুধু ‘আকবরনগর বাজার’ লেখা হয়। এরপরই বিরোধ শুরু হয়। সাইনবোর্ড ভাঙচুর, সংঘর্ষ ও শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। তিন বছর পরও বাজারের নাম নিয়ে সেই বিরোধের স্থায়ী সমাধান হয়নি।

জানতে চাইলে ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে এম মামুনুর রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, বিরোধ মেটাতে আগেও নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখনো চেষ্টা চলছে। কিন্তু কোনোভাবেই দুই গ্রামের মানুষকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরানো যাচ্ছে না।

বর্তমান পরিস্থতি

গতকাল শনিবার খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আশ্রয়হীন হয়ে পড়া মানুষজন এখনো নিজেদের ঘরে ফিরতে পারেননি।

ভৈরব থানার ওসি মাহবুবুর রহমান গতকাল বিকেলে প্রথম আলোকে জানান, মিরারচর ও আকবরনগরে সংঘর্ষ থেমে গেলেও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে সেখানে পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে।