মাদ্রাসাছাত্রীর শরীরজুড়ে কালশিটে দাগ, বেত্রাঘাতের অভিযোগ মাদ্রাসার পরিচালকের বিরুদ্ধে

জয়পুরহাট জেলার মানচিত্র
জয়পুরহাট জেলার মানচিত্র

‘বাবা, আমাকে আর ওই মাদ্রাসায় পাঠিও না’—ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে কথাগুলো বলছিল ১১ বছরের এক শিশু। আজ বুধবার দুপুরে বাবার সঙ্গে জয়পুরহাট সদর থানায় আসে সে। শিশুটির শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারধরের কালশিটে দাগ দেখা যায়। এ ঘটনায় শিশুটির বাবা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

শিশুটি জয়পুরহাট শহরের নতুনহাট এলাকার একটি মহিলা কওমি মাদ্রাসার আবাসিক শিক্ষার্থী। পরিবারের অভিযোগ, গত সোমবার সকালে পড়া না পারার কারণে মাদ্রাসার শিক্ষক জালাল উদ্দিন তাকে বেধড়ক মারধর করেন। পরে অসুস্থ হয়ে পড়লে গতকাল মঙ্গলবার সকালে তাকে জয়পুরহাট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

অভিযুক্ত শিক্ষক জালাল উদ্দিন বলেন, ‘আমি মহিলা কওমি মাদ্রাসার পরিচালক, শিক্ষক নই। তবে মাঝেমধ্যে মাদ্রাসায় গিয়ে ক্লাস নিই। সেদিন মাদ্রাসায় গিয়ে ক্লাস নিচ্ছিলাম। ওই ছাত্রী বাদে সবাই পড়া দিতে পেরেছিল। পড়তে না পারার কারণে বেত্রাঘাত করেছি। এতে কালশিটে দাগ বা আহত হওয়ার কথা নয়।’

আজ দুপুর ১২টার দিকে জয়পুরহাট সদর থানায় গিয়ে দেখা যায়, শিশুটি, তার বাবা এবং সমাজসেবা কার্যালয়ের একজন প্রতিনিধি থানার নারী ও শিশু হেল্প ডেস্কে বসে আছেন। পুলিশের একজন এসআইকে শিশুটি তার শরীরের কালশিটে দাগ দেখাচ্ছিল।

শিশুটির বাবা প্রথম আলোকে বলেন, প্রায় দেড় বছর আগে তিনি মেয়েকে ওই মাদ্রাসায় ভর্তি করান। সে আবাসিক থেকে লেখাপড়া করত। সোমবার সকাল আটটার দিকে জালাল উদ্দিনের ক্লাসে সে পড়া বলতে পারেনি। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে শিক্ষক তাকে বেত দিয়ে মারধর করেন। মারধরের পর তার জ্বর আসে এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখা দেয়। শিশুটির বাবা আরও বলেন, ঘটনার পর মেয়েকে পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে দেওয়া হয়নি। সোমবার সন্ধ্যায় ফোনে কথা বলার সুযোগ পেয়ে তাঁর মেয়ে পুরো ঘটনা জানায়। এরপর পরিবারের সদস্যরা মাদ্রাসা থেকে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। পরদিন অবস্থার অবনতি হলে জয়পুরহাট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

জয়পুরহাট শহর সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তার কার্যালয়ের একজন প্রতিনিধি থানায় এসে শিশুটির খোঁজখবর নেন। তিনি শিশুটির বাবাকে থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে সহায়তা করেন।

জয়পুরহাট শহর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা শারমিন সুলতানা বলেন, ‘আমার একজন প্রতিনিধি থানায় গিয়েছিল। শিশুটির শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হয়েছে।’

জয়পুরহাট সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরে আলম সিদ্দিকী বলেন, বেত্রাঘাতের শিকার শিক্ষার্থীর বাবা একটি এজাহার দিয়েছেন। সেটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হবে।

বাংলাদেশের আইনে শিশুদের শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ। শিশু আইন ২০১৩-এর ৭০ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি তার হেফাজত বা দায়িত্বে থাকা শিশুকে আঘাত, উৎপীড়ন, অবহেলা, অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রাখা, ব্যক্তিগত পরিচর্যার কাজে ব্যবহার বা অশালীনভাবে প্রদর্শন করলে এবং এতে শিশুর শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি হলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান আছে।

এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি রহিত করা সংক্রান্ত নীতিমালা’ করে ২০১১ সালে।