
বিয়ের পর ১৩ বছর বয়সে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় তাঁর শিক্ষাজীবন থেমে গিয়েছিল। এরপর সংসার ও সন্তান প্রতিপালনে কেটে গেছে দীর্ঘ সময়। কিন্তু পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারাননি। দীর্ঘ ৩২ বছর পর আবার শিক্ষাজীবনে ফিরে ৫৩ বছর বয়সে এইচএসসি পাস করেছেন নীলফামারীর এক গৃহবধূ।
ওই গৃহবধূর নাম শেফালী বেগম। তিনি জেলার ডিমলা উপজেলার পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নের কালীগঞ্জ গ্রামের মকছেদুল আলমের স্ত্রী। শেফালী বেগমের এই সাফল্য এখন শুধু তাঁর পরিবারের আনন্দের বিষয় নয়; বরং নানা প্রতিকূলতায় যাঁরা শিক্ষার স্বপ্ন থেকে সরে দাঁড়ান, তাঁদের জন্যও এটি এক অনুসরণীয় উদাহরণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
শেফালী বেগম ডোমার উপজেলার গোমনাতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ–৪.২১ পেয়েছেন।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাত্র ১১ মাস বয়সে ১৯৭৫ সালে শেফালী বেগমের বাবা দবির উদ্দিন মারা যান। অল্প বয়সে শেফালী বেগমের বিয়ে হয়। এরপর পারিবারিক নানা সংকটে অষ্টম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় ১৯৮৮ সালে তাঁর পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেমে যায় তাঁর শিক্ষাজীবন। দীর্ঘ বিরতির পর ২০২০ সালে তিনি গোমনাতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজে নবম শ্রেণিত ভর্তি হন। ২০২৩ সালে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি জিপিএ–৪.২৯ পেয়ে এসএসসি পাস করেন। এরপর ওই কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হন।
বয়সের ব্যবধান, দীর্ঘ শিক্ষাবিরতি কিংবা সংসারের ব্যস্ততা—কিছুই শেফালীর ইচ্ছাশক্তির কাছে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। নিজের সাফল্যের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। শেফালী বেগম বলেন, ‘প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পরীক্ষাগুলোয় বরাবর ভালো ফল করেছি। কিন্তু বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারিনি। পরবর্তী সময়ে আমার ভাগনি ও ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া দেখে নিজের মধ্যেও আবার পড়াশোনার ইচ্ছা জাগে। পরে স্বামী ও সন্তানদের উৎসাহ ও সহযোগিতায় নতুন করে পড়াশোনা শুরু করি।’
শেফালী বেগম বলেন, ‘আমি আইন বিষয়ে অনার্সে ভর্তি হতে চাই। এটা আমার ছেলেমেয়েরাও চায়।’
শেফালী বেগমের দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে আবদুর রাজ্জাক বিএ পাস করে সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত। ছোট ছেলে আবদুর রাজ শাফি কোরিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নরত। মেয়ে মাকছুরা খানম রংপুর সরকারি কলেজে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।
ছেলে আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমি চাই, মা এখানেই থেমে না থেকে স্নাতকসহ আরও উচ্চশিক্ষা অর্জন করুক।’ তিনি জানান, তাঁর মা ২০১১ সালে ও ২০২১ সালে পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নে সংরক্ষিত নারী সদস্য ছিলেন। ২০১৫ সালে ডিমলা উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত সংরক্ষিত নারী সদস্য ছিলেন।
শেফালীর মেয়ে মাকছুরা খানম বলেন, ‘আমার মায়ের এই সাফল্য শুধু আমাদের পরিবারের আনন্দের বিষয় নয়, এটি সমাজের সব নারী ও শিক্ষাবঞ্চিত মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা। আমার মা প্রমাণ করেছেন, শিক্ষার পথে বয়স কখনো বাধা হতে পারে না।’
শেফালী বেগম পরিবারের জন্য নিজের অনেক স্বপ্ন ত্যাগ করেছেন বলে জানিয়েছেন স্বামী মকছেদুল আলম। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর নিজের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছে—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় আনন্দ। তার এই সাফল্যে আমরা গর্বিত। ভবিষ্যতেও তার পড়াশোনার পথে পাশে থাকব আমরা।’
গোমনাতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের প্রভাষক আবদুল মান্নান বলেন, শেফালী বেগমের এই সাফল্য সমাজের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা। নিয়মিত অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ় মনোবল থাকলে জীবনের যেকোনো বয়সেই সাফল্য অর্জন করা সম্ভব।