পবিত্র ঈদুল আজহার আর মাত্র তিন দিন বাকি। ঈদকে কেন্দ্র করে গাজীপুরের ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে আজ সোমবার থেকে ধাপে ধাপে পোশাক কারখানার ছুটি শুরু হয়েছে। ফলে মহাসড়কে ঘরমুখী মানুষের উপস্থিতিতে গাড়ির চাপ বেড়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে তেমন যানজট না থাকলেও ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যানজট তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে বৃষ্টির কারণে মানুষ পড়েছেন সীমাহীন দুর্ভোগে।
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ঘুরে খবর পাঠিয়েছেন প্রথম আলোর প্রতিনিধিরা।
গাজীপুর
জেলার ৪৫ শতাংশ কারখানা আজ ছুটি হওয়ায় ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ঘরমুখী মানুষের চাপ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এর মধ্যে দুপুর ১২টা থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টিতে সড়কের বিভিন্ন স্থানে পানি জমে যানবাহন চলাচল ধীরগতির হয়ে পড়ায় যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গী স্টেশন রোড থেকে কলেজ গেট পর্যন্ত যানবাহন থেমে থেমে চলাচল করছে। বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড ও সড়কের পাশে দীর্ঘ সময় ধরে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় ঘরমুখী যাত্রীদের। বৃষ্টি উপেক্ষা করেই পরিবার-পরিজন ও প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন হাজারো শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গী, বোর্ডবাজার, ভোগরা, চৌরাস্তা, রাজেন্দ্রপুর ও মাওনা এলাকায় যাত্রীদের চাপ সবচেয়ে বেশি।
এদিকে ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়কের কোনাবাড়ী, সফিপুর, পল্লী বিদ্যুৎ, চন্দ্রা, খাড়াজোড়া, বাইমাইল এলাকায় যাত্রীদের চাপ বেশি। অতিরিক্ত যাত্রীদের চাপে ১০ কিলোমিটার এলাকায় থেমে থেমে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।
টঙ্গীর হোসেন মার্কেট এলাকায় ঢাকা ইম্পেরিয়াল হাসপাতালের সামনে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ময়মনসিংহ যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন মরিয়ম বেগম (৪৫)। সঙ্গে ছিল কয়েকটি বস্তাভর্তি মালামাল। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও বাস না পাওয়ায় তিনি চরম ভোগান্তির কথা জানান। সেখানে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক মো. সফিক হোসেন বলেন, সকালে টঙ্গী থেকে কলেজ গেট পর্যন্ত যানবাহন ধীরগতিতে চলেছে। টানা বৃষ্টির কারণে ভোগরা এলাকায় হাঁটুপানি জমে গেছে। একই সঙ্গে কারখানার ছুটি শুরু হওয়ায় সড়কে যানবাহনের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কোনাবাড়ী-নাওজোর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সওগাতুল আলম বলেন, চন্দ্রা অংশ দিয়ে দেশের ২৩ জেলার মানুষ যাতায়াত করেন। সাধারণ সময়ে প্রতিদিন প্রায় দুই লাখ মানুষ এ সড়ক ব্যবহার করলেও ঈদের সময় তা ১৫ থেকে ২০ লাখে পৌঁছে যায়। ফলে অতিরিক্ত চাপের কারণে পুরোপুরি যানজট এড়ানো সম্ভব হয় না।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসেন জানান, সোমবার ৪৫ শতাংশ কারখানায় ছুটি শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার আরও ৪৫ শতাংশ কারখানা ছুটি হবে। ২৭ মে ৭ শতাংশ কারখানা ছুটি পাবে এবং মাত্র ৩ শতাংশ কারখানা খোলা থাকবে।
সাভার
শিল্পাঞ্চল সাভার-আশুলিয়ার বিভিন্ন শিল্পকারখানা ছুটি হওয়ায় পর আজ দুপুরের পর সাভার উপজেলার বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ডে ঘরমুখী যাত্রীদের ভিড় কয়েক গুণ বেড়েছে।
আজ বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত সাভার উপজেলার আওতাধীন ঢাকা-আরিচা এবং নবীনগর থেকে চন্দ্রা মহাসড়কে যানজট দেখা যায়নি। তবে কয়েকটি স্থানে কিছু সময় পরিবহনগুলোকে ধীরগতিতে চলতে দেখা গেছে। তবে সন্ধ্যার পর বাইপাইল থেকে চন্দ্রা অভিমুখী সড়কে দীর্ঘ যানজট দেখা গেছে।
আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১–এর তথ্যমতে, সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাই এলাকায় তৈরি পোশাকশিল্প এবং অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে ১ হাজার ৭০৫টি। এর মধ্যে আজ বেলা একটা পর্যন্ত ছুটি হয়েছে ৫৩৫টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ ৩১ শতাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছুটি হয়েছে।
সাভার হাইওয়ে থানার ওসি শাহজাহান মিয়া বলেন, ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা চন্দ্রামুখী গাড়িগুলো নবীনগর এসে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক থেকে এরপর চন্দ্রা মহাসড়কে যায়। আরিচাগামী গাড়িগুলো সোজা চলে যায়। এতে নবীনগর বাসস্ট্যান্ডে এ দুই মহাসড়কের অংশে গাড়িগুলোকে কিছুটা ধীরগতিতে চলতে হচ্ছে। এ ছাড়া বাইপাইলেও গাড়ির ধীরগতি রয়েছে।
এদিকে ঘরমুখী যাত্রীদের স্থানীয় বিভিন্ন পরিবহনে অধিক ভাড়া গুনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে। এ ছাড়া টিকিট কেটে নির্ধারিত সময়ে বাস না পাওয়া এবং গন্তব্যে যেতে দূরপাল্লার বাসে অতিরিক্ত ভাড়াসহ নানা ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে তাঁদের।
পোশাকশ্রমিক মো. শহিদুল ইসলাম যাবেন বগুড়ায়। বেলা দুইটার দিকে আশুলিয়ার বাইপাইল বাস কাউন্টারে এসে টিকিট পাননি তিনি। তিনি বলেন, কাউন্টারে টিকিট নেই, গাড়ি নেই। এখন লোকাল বাসে যেতে হবে। ৫০০ টাকার ভাড়া চাচ্ছে এক হাজার টাকা।
টাঙ্গাইল
ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কে যানবাহনের চাপ আগের দিনের তুলনায় বেড়েছে। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি যানবাহন চলাচল করছে। তবে কোথাও যানজট হয়নি।
যমুনা সেতুর ওপর দিয়ে শনিবার রাত ১২টা থেকে রোববার রাত ১২টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৩৯ হাজার ৯১২টি যানবাহন পারাপার হয়েছে। যা আগের ২৪ ঘণ্টা (শুক্রবার রাত ১২টা থেকে শনিবার রাত ১২টা) পারাপার হওয়া যানবাহনের তুলনায় ৭ হাজার ২৫৩টি বেশি। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় টোল আদায় হয়েছে ৩ কোটি ২৫ লাখ ১৫ হাজার ৬৫০ টাকা। যমুনা সেতু সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ রিয়াজ উদ্দিন এ তথ্য জানিয়েছেন।
সোমবার বিকেলে সরেজমিন দেখা যায়, যানবাহনের চাপ বেশি থাকলেও মহাসড়কের কোথাও যানজট নেই।
টাঙ্গাইল শহর বাইপাসের রাবনা মোড়ে ফিলিং স্টেশনে বিকেল চারটার দিকে কথা হয় গাইবান্ধাগামী মাইক্রোবাসের চালক রিপন মিয়ার সঙ্গে। তিনি জানান, ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল পর্যন্ত আসতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কিছু বেশি সময় লেগেছে তবে যানজটে পড়তে হয়নি।
নারায়ণগঞ্জ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাইনবোর্ড, কাঁচপুর, মদনপুর, মেঘনা সেতুর টোল প্লাজা এলাকাসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে আজ সকাল থেকেই যানবাহনের চাপ বেড়েছে কয়েক গুণ। পরিবহন কাউন্টারগুলোতে ঘরমুখী মানুষের ভিড় দেখা গেছে। তবে এই মহাসড়কে তেমন যানজট দেখা যায়নি।
যাত্রীদের অভিযোগ, পরিবহন কাউন্টারগুলোতে টিকিটপ্রতি ৫০ টাকা থেকে ১০০ টাকা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়েও অনেক কাউন্টারে বাস এসে পৌঁছাচ্ছে না।
চট্টগ্রামগামী যাত্রী আবদুল কাইয়ুম পরিবারসহ সাইনবোর্ডে সৌদিয়া পরিবহনের গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছেন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে। কিন্তু বেলা একটা বাজলেও গাড়ি কাউন্টারে আসেনি। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নির্ধারিত ভাড়ায় অনলাইনে তিনি টিকিট কেটেছিলেন। কিন্তু আড়াই ঘণ্টায় গাড়ি না আসায় ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তাঁকে জানানো হয়েছে, গাড়ি বাড্ডায় আছে। আধা ঘণ্টার মধ্যে চলে আসবে।
আরেক যাত্রী জানান, মহাসড়কে যানজট না থাকলেও কাউন্টারে বিশৃঙ্খলার কারণে যাত্রীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে পরিবার নিয়ে যাত্রা করা মানুষদের বেশি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
কাঁচপুর হাইওয়ে থানার ওসি শামীম শেখ বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বাড়ছে। তবে এখন পর্যন্ত কোথাও বড় ধরনের যানজট নেই। তিনি বলেন, অতিরিক্ত পুলিশের পাশাপাশি টহল টিম, মোটরসাইকেল পেট্রল ও স্বেচ্ছাসেবক দলও কাজ করছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, চুরি-ছিনতাই ও যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
দাউদকান্দি
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার মেঘনা-গোমতী সেতুর টোল প্লাজা থেকে ইলিয়টগঞ্জ পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার অংশে কোথাও যানজট নেই।
কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামের বাসিন্দা এবং ঢাকার চাকরিজীবী মো. এরশাদ মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, আজ ঢাকা থেকে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিয়ে কোথাও যানজট পাননি। ৫০ কিলোমিটার মহাসড়ক ৫০ মিনিটে অতিক্রম করেছেন।
চট্টগ্রামগামী শ্যামলী পরিবহনের একটি বাসের চালক মাসুম মিয়া বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দাউদকান্দি অংশের চিরচেনা যানজট এবার নেই।
সরাইল
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ৩৪ কিলোমিটার অংশে যানবাহনের চাপ কিছুটা বেড়েছে। তবে আজ সোমবার সন্ধ্যা পৌনে সাতটা পর্যন্ত এই অংশে কোথাও বড় ধরনের যানজট সৃষ্টি হয়নি।
মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ টোল প্লাজা থেকে সরাইল বিশ্বরোড মোড় পর্যন্ত সাড়ে ১১ কিলোমিটার অংশে আছে বড় দুটি গোল চত্বর। মহাসড়কে চলমান উন্নয়নকাজের জন্য গোলচত্বর দুটি একদিকে সংকীর্ণ অন্যদিকে খানাখন্দে ভরা। এরপরও পুলিশ প্রশাসন ও জনপথ বিভাগের তৎপরতায় বিশ্বরোড মোড় গোলচত্বর বাদে অন্য এলাকায় যানবাহন ধীরগতিতে তবে যানজটহীনভাবে চলাচল করছে।
আজ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের আশুগঞ্জ টোল প্লাজা অতিক্রম করে সিলেটের পথে দূরপাল্লাসহ ছোট–বড় সব ধরনের যানবাহনকে চলতে হচ্ছে ধীরগতিতে। যানবাহনের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখা অংশে আছে খানাখন্দ আর ছোট–বড় গর্ত। আশুগঞ্জ গোলচত্বর এলাকা অতিক্রম করে সরাইল বিশ্বরোড মোড়ে পর্যন্ত কোথাও যানজট দেখা যায়নি।
তবে সিলেট থেকে ঢাকামুখী যানবাহনগুলোকে ২০০ থেকে ৩০০ মিটার গর্তযুক্ত পথ অতিক্রম করতে হচ্ছে ধীরগতিতে। এসব গর্তে বেশ কয়েক দিন ধরে পানি জমে আছে। ফলে এই অংশে অত্যন্ত ধীরগতিতে যানবাহন চলছে। এ ছাড়া কিছুক্ষণ পরপর যানবাহনগুলোকে আটকে যেতে দেখা গেছে। এ জন্য যানজট লেগেই আছে।
হাইওয়ে পুলিশের সিলেট অঞ্চলের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. রেজাউল করীম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঈদ উপলক্ষে সরাইল বিশ্বরোড মোড় গোলচত্বরের যানজট নিরসনের জন্য আমরা এখানে ৪-৫ দিন ধরে অবস্থান করে কাজ করছি। এখানে সিলেটমুখী যান চলাচল স্বাভাবিক আছে। ঢাকামুখী যানবাহনগুলোকে খানাখন্দের কারণে ধীরগতিতে চলছে, তবে বড় ধরনের যানজট হচ্ছে না।’