
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি মহিষের গাড়ি থেকে নামলেন। তাঁর হাতে মানকচু তুলে দিয়ে বরণ করলেন একজন কৃষক। ফিতা কেটে নয়, কলাগাছের একটি শুকনো ডাগুর ধান কাটা কাঁচি দিয়ে কেটে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করলেন প্রধান অতিথি। অনুষ্ঠানের নাম কৃষকদের সঙ্গে মতবিনিময়।
এরপর অতিথিরা একটি তোরণের মধ্য দিয়ে হেঁটে যান। ফুলের বদলে তোরণটি সাজানো হয়েছে নানা রকম কৃষিপণ্য দিয়ে। যেন সেটি একটি শস্য মিউজিয়াম। এর ডান পাশে সারি সারি কলাগাছে ঝুলছে কাঁদি, ঝুলছে আম, ভুট্টা, বেগুন, লাউসহ আরও কত কী। আর দুই পাশ দিয়ে থরে থরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে বিভিন্ন কৃষিপণ্য। সেই সঙ্গে আছে বিভিন্ন ফসলের বীজ।
আজ সোমবার এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার পতিরাজপুর এলাকায়। আয়োজক বাংলাদেশ কৃষক সমিতি। অনুষ্ঠানে প্রায় ৮০০ কিষান-কিষানি উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা কৃষিপণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ নিয়ে স্থানীয়ভাবে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হন, তা অতিথিদের সামনে তুলে ধরেন এবং সমাধানের প্রতিশ্রুতি আদায় করেন।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পতিরাজপুর রেলগেট থেকে তালেব জোয়ারদারের মৎস্য খামার পর্যন্ত মহিষের গাড়িতে করে প্রধান অতিথি পাবনা জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম অনুষ্ঠান স্থলে আসেন। অন্য অতিথিদের মধ্যে ছিলেন পাবনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম পাটোয়ারী, সহকারী পুলিশ সুপার প্রণব কুমার, ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান মোহাম্মদ শোয়াইব প্রমুখ।
বাংলাদেশ কৃষক সমিতির সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান ওরফে কুল ময়েজ ঈশ্বরদীর চাষিদের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আর এক মাসের মধ্যে লিচু বাজারে উঠবে। লিচু পরিবহনের জন্য তিন চাকার যানবাহনই তাদের একমাত্র ভরসা যা হাইওয়েতে নিষিদ্ধ। লিচু পরিবহনের জন্য অন্তত ১৫ দিনের জন্য হলেও এই যানবাহন চলাচলের ব্যাপারে ছাড় দেওয়ার দাবি জানান তিনি। পাশাপাশি তিনি কীটনাশকের মান যাচাই করে বাজারে ছাড়ার দাবি জানান।
কৃষি খাতে সরকারি প্রণোদনার বিষয়ে সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ১ কেজি শর্ষেবীজ আর সারের জন্য ৫০০ টাকা দেওয়া হয়। তার জন্য কৃষককে তিন দিন উপজেলায় ঘুরতে হয়। এরপর শর্ষে হলো কি না, কেউ আর খোঁজ নেন না। সরকারকে তিনি এই জন্য প্রণোদনার পদ্ধতি পরিবর্তন করতে হবে। কৃষকদের জন্য ফসলভিত্তিক বিশেষ ঋণের ব্যবস্থার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, এক কেজি পেঁয়াজের বীজের দাম পাঁচ হাজার টাকা। চাষ করতে আরও ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়। তখনই কৃষককে বিভিন্ন এনজিওর কাছে ঋণের জন্য ধরনা দিতে হয়। পরের সপ্তাহ থেকেই এনজিওর লোকজন বাড়িতে কিস্তির জন্য আসে। এরপর পেঁয়াজের দাম পায় না কৃষক। ঋণ ও আর পরিশোধ করতে পারে না।
কৃষকের জন্য ঝুঁকি ভাতা দাবি করেন সিদ্দিকুর রহমান। তিনি বলেন, কৃষককে সাপে কামড় দেয়, স্থানীয়ভাবে কোনো ভ্যাকসিন পাওয়া যায় না। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে যেতে পথের মধ্যেই কৃষক মারা যায়। এটা হতে পারে না। সব জায়গায় এই ভ্যাকসিনের সরবরাহে থাকতে হবে।’ কৃষকদের ডেটাবেজ তৈরির গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ২৩০ জন এমপি তাঁদের পেশা কৃষি লিখেছিলেন। এখন চিত্রনায়ক, নায়িকা থেকে শুরু করে অনেকেই পেশা লেখেন কৃষি। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে কতজন কৃষিকাজ করেন, এর পরিসংখ্যান জানা দরকার। কারা সত্যিকারের কৃষক, সেটি জাতিকে জানাতে হবে।
অনুষ্ঠানে এসেছিলেন নাটোরের গোপালপুর ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ বাবুল আক্তার। এই আয়োজন দেখে তিনি মুগ্ধ কণ্ঠে বলেন, এরা যে সত্যিকারের কৃষক, তার পরিচয় দিয়েছেন।
কৃষিপণ্য দিয়ে তৈরি তোরণ দেখে কৃষকদের সৃজনশীলতার প্রশংসা করেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, ঈশ্বরদীর কৃষকেরাই দেশের কৃষিতে বিপ্লব ঘটাবেন। তিনি কৃষকদের বিভিন্ন সমস্যা শুনে সমাধানের আশ্বাস দেন।