
মিয়ানমারের রাখাইন সীমান্তে গোলাগুলিতে বাংলাদেশের নাগরিকদের গুলিবিদ্ধ ও আহত হওয়ার প্রতিবাদে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের হোয়াইক্যংয়ে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। আজ সোমবার বেলা ১১টায় হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল তেচ্ছিব্রিজ এলাকায় শুরু হওয়া প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা সীমান্তবর্তী মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতের আহ্বান জানান। প্রতিবাদ সমাবেশে এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জনপ্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
সমাবেশে মাথায় গুলিবিদ্ধ স্কুলছাত্রী হুজাইফা সুলতানার (৯) বাবা জসিম উদ্দিন বলেন, ‘মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলি আমার মেয়ের মাথায় বিদ্ধ হয়েছে। মেয়ের চিকিৎসার খরচ চালানো আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। আমার মেয়ের মতো আর কেউ যেন গুলিবিদ্ধ না হয়, ওপারের গুলিতে আর কোনো বাংলাদেশি যেন আহত না হয়, এ ব্যবস্থা করা দরকার।’
টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল তেচ্ছিব্রিজ অংশে কয়েক দিন ধরে রাজ্যের দখলদার সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) অবস্থানে হামলা ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটছে। ওপার থেকে ছোড়া গুলি, ড্রোন, মর্টারের শেল এপারের টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্তে লোকজনের ঘরবাড়ি, মৎস্যখামার ও মাঠে এসে পড়ছে। গতকাল রোববার সকাল ৯টার দিকে ওপার থেকে ছোড়া গুলিতে স্কুলছাত্রী হুজাইফা মাথায় বিদ্ধ হয়। বর্তমানে সে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে আছে। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে চিকিৎসকেরা জানান। ওপারে হঠাৎ সংঘাত বেড়ে যাওয়ায় টেকনাফ সীমান্তের হোয়াইক্যং ও পাশের উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের অন্তত ১১টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ আতঙ্কে আছেন। এমন পরিস্থিতিতে তেচ্ছিব্রিজ এলাকার মানুষেরা প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করছেন। প্রতিবাদ সমাবেশে অংশ নেওয়া কয়েক শ নিরাপদ সীমান্তের দাবিতে স্লোগান দেন।
মানববন্ধনে বক্তারা ৬ দফা দাবিও তুলে ধরেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে স্কুলছাত্রী গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায় জনগণের জানমালের নিরাপত্তা, সীমান্তে গোলাগুলি ও সহিংসতা বন্ধে কার্যকর ও স্থায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ।
মানববন্ধনে বক্তব্য দেন উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিব জুনাইদ আলী চৌধুরী, হোয়াইক্যং ইউনিয়ন উত্তর শাখা বিএনপি নেতা ফেরদৌস আহমদ, টেকনাফ উপজেলা মৎস্য দলের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম সিকদার, হোয়াইক্যং ইউনিয়ন উত্তর শাখা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ফরিদ আলম, হোয়াইক্যং ইউনিয়ন উত্তর শাখা সাংগঠনিক ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মুহাম্মদ আলম, হোয়াইক্যং ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি মুহাম্মদ ইব্রাহিম ও গুলিবিদ্ধ শিশুর বাবা জসিম উদ্দিন।
যুবদলের সদস্যসচিব জুনাইদ আলী বলেন, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পরের কয়েক মাসে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে অন্তত ৮ লাখ রোহিঙ্গা। বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে অবস্থান করছেন ১৪ লাখের বেশি। গত আট বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। উল্টো গত এক–দেড় বছরে আরও দেড় লাখ রোহিঙ্গা রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে এসে টেকনাফ ও উখিয়ার বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিয়েছে। বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার কারণে স্থানীয় বাংলাদেশিরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এখন রাখাইন রাজ্যের দখলকার আরাকান আর্মির অবস্থানে হামলা চালাচ্ছে রোহিঙ্গাদের কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী।
কয়েক দিন ধরে ওপারে গোলাগুলি-সংঘাত চলছে। ওপারের গুলি এসে এপারের লোকজনের ঘরবাড়িতে এসে পড়ছে। ওপারের গুলিতে স্কুলছাত্রীসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। এপারের মানুষ দিন দিন নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়ছে।
হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শাহজালাল প্রথম আলোকে বলেন, রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি হঠাৎ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। গতকাল সন্ধ্যা থেকে আজ বেলা দুইটা পর্যন্ত ওপারের গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়নি। তবে সীমান্তে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। গত কয়েক দিন ওপারে রাখাইন রাজ্যে বিমানহামলা, মর্টার শেল ও বোমার বিকট শব্দের বিস্ফোরণে হোয়াইক্যং সীমান্তের লোকজনের ঘরবাড়ি কেঁপেছিল। আতঙ্কে লোকজনের নির্ঘুম রাত কাটছে। নাফ নদী ও সীমান্তের বিজিবি, কোস্টগার্ডের টহল জোরদার আছে।