মৃত্যুর আগের রাতে যখন সাবিদুল ইসলাম (৩৪) বাড়িতে ফেরেন, তখনো তাঁর মুখে কাদা লেগে ছিল। পরিবারের দাবি, আগের রাতে কেউ তাঁকে মারধর করেছিল। পরদিন ২৪ জুলাই সকালে সাবিদুল মাকে বলেছিলেন, ‘কেহু আমাকে মাইর্যা ফেললে লাশটা আইন্যা কবর দিস, মা।’ সেদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর ফেরেননি সাবিদুল। ২৬ জুলাই তাঁর লাশ পাওয়া যায়। তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে মা আবেদা বেগম আজ শনিবার এ বর্ণনা দেন। তাঁর দাবি, তাঁর ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে।
সাবিদুল রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বিজয়নগর কলোনির মো. কামালের ছেলে। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি মেজ। বাড়িতে তাঁর স্ত্রী ও সাড়ে চার বছর বয়সী এক মেয়ে আছে। নির্মাণশ্রমিক হিসেবে ঢাকায় কাজ করতেন সাবিদুল। গত ২৪ জুলাই মধ্যরাত থেকে তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। ২৬ জুলাই সকালে গ্রামের একটি পুকুরে ভাসমান অবস্থায় তাঁর লাশ পাওয়া যায়।
সাবিদুলের মাথায় রক্ত, চোখে-জিহ্বায় ক্ষত। শরীরের বিভিন্ন স্থানে পুড়ে যাওয়া ফোসকা। পুলিশ বলছে, অতিরিক্ত নেশা করে পুকুরে ডুবে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু পরিবার ও এলাকার লোকজন বলছেন ভিন্ন কথা। তাঁদের মতে, নির্মম নির্যাতনের পর সাবিদুলকে হত্যা করা হয়েছে।
আজ সকালে আবেদা বেগমের বাড়িতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তাঁর দাবি, ধারের সামান্য কিছু টাকা ফেরত দিতে না পারায় নেওয়া হয়েছে তাঁর ছেলের প্রাণ। আবেদা অবশ্য অভিযুক্ত কারও নাম বলছেন না। অভিযুক্তরা কি প্রভাবশালী, নাম বলতে ভয় পাচ্ছেন? এমন প্রশ্নে আবেদা বললেন, ‘তাঁরা কোটিপতি’। আবেদা এত কিছু জানলেও পুলিশ রয়েছে অন্ধকারে।
প্রেমতলী তদন্ত কেন্দ্রের পুলিশ লাশটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠায়। এ বিষয়ে হত্যা মামলা হয়নি। তবে একটি অপমৃত্যুর মামলা করা হয়েছে। মামলাটি তদন্ত করছেন তদন্ত কেন্দ্রের উপপরিদর্শক (এসআই) মাসুদ রানা।
আবেদা বেগম রাজাবাড়ীহাটে মানুষের কাছে হাত পেতে চলেন। রাজাবাড়ীহাটে গিয়ে তিনি জেনেছেন, ২৪ জুলাই গভীর রাতে তাঁর ছেলে রাজাবাড়ীহাট চেকপোস্টের পাশে আরিফের চায়ের দোকানে চা পান করেছেন। তারপর কয়েকজন তাঁকে মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে যায়। ওই রাতে তাঁকে নির্যাতন করা হয় বলে আবেদার অভিযোগ।
ছেলের লাশের বর্ণনা দেন বাবা কামাল হোসেন। তাঁর ভাষ্য, ‘আমরা লাশ ভালো করে দেখেছি। চোখে পিন ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মাথায়-কপালে রক্ত ছিল। জিহ্বা কেটে দেওয়া হয়েছিল। সারা শরীরে ফোসকাও ছিল। হয়তো মারার আগে গরম পানি ঢালা হয়েছিল।’ পাশ থেকে আবেদা বেগম বলেন, ‘আমরা শুন্যাছি যে প্রথমে একদিন বাথরুমে লাশ লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। একদিন পর পুকুরে ফেলা হয়। গরম পানি না ঢাললে এক দিনেই পানিতে থাকা লাশে ফোসকা পড়বে না। তারা দুই-তিন হাজার টাকা পাইত, অ্যার লাইগা খুন।’
সাবিদুলের ময়নাতদন্তে কী পাওয়া গেছে, তা জানতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান কফিল উদ্দিনকে ফোন করা হয়। তবে কাগজপত্র না দেখে তিনি কিছু বলতে পারবেন না বলে জানান।
পুকুরটির পানির গভীরতা বিবেচনায় ডুবে মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন সাবিদুলের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মাসুদ রানা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘শরীরে ফোসকা আমরাও দেখেছি। সুরতহাল প্রতিবেদনে এটা লেখা হয়েছে। কিন্তু কীভাবে মৃত্যু হয়েছে, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ছাড়া বলতে পারছি না।’
তবে পানিতে ডুবেই সাবিদুলের মৃত্যু হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক মাকসুদুর রহমান। তাঁর ভাষ্য, ‘ছেলেটা অতিরিক্ত নেশা করত। যারা নেশা করে, তারা নেশা কাটাতে অনেক সময় পুকুরে নামে। হয়তো পুকুরে নেমে নেশার ঘোরে আর উঠতে পারেনি।’ তিনি জানান, সাবিদুল নিখোঁজ হওয়ার আগে মধ্যরাতে জনিসহ কয়েকটি ছেলের সঙ্গে আরিফের দোকানে চা পান করেছিলেন। তার পর থেকে তাঁকে আর কোথাও দেখা যায়নি।
জনি দেওপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবদুল হাই টুনুর ছেলে। যোগাযোগ করা হলে তিনি সাবিদুলের সঙ্গে চা পানের কথা অস্বীকার করেন। তিনি তাঁকে চেনেন না বলেও দাবি করেন। পরে আরিফের দোকানের কথা বললে জনি বলেন, ‘সাবিদুল আমার সঙ্গে চা খায়নি। সে দূরে ছিল, আমি দেখেছি। আমার সঙ্গে পুলিশের এসআই জুয়েল আবেদীন ছিল। আমিসহ কয়েকজন এসআই জুয়েলের সঙ্গে চা খাই। তারপর চলে আসি।’
প্রেমতলী তদন্ত কেন্দ্রের এসআই জুয়েল আবেদীন জনির সঙ্গে চা পানের বিষয়টি প্রথমে অস্বীকার করে বলেন, ‘চা খেয়েছি সত্য, কিন্তু আমি কাউকে চিনি না।’ পরে বলেন, ‘শুধু জনিকেই চিনি।’
এদিকে সাবিদুলের মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড দাবি করে বিচারের দাবিতে এলাকাবাসী আগামীকাল রোববার এলাকায় মানবন্ধন কর্মসূচির ডাক দিয়েছেন।