‘আমার কুমিল্লা’ অ্যাপের উদ্বোধন অনুষ্ঠানের পর জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান। সোমবার দুপুরে কুমিল্লা জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে
‘আমার কুমিল্লা’ অ্যাপের উদ্বোধন অনুষ্ঠানের পর জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান। সোমবার দুপুরে কুমিল্লা জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে

কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান

কেউ চাপ দিলে নাম প্রকাশ করে দেব: কুমিল্লার পুলিশ সুপার

কিশোর গ্যাংবিরোধী চলমান অভিযানে কোনো ধরনের চাপ নেই বলে জানিয়েছেন কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান। তিনি বলেছেন, ‘কোনো ধরনের কেউ চাপ নাই। আজ পর্যন্ত আমাকে কেউই ফোন দেয় নাই। সবাই সাধুবাদ জানিয়েছে। কেউ চাপ দিলে আমি আপনাদের সামনে নাম প্রকাশ করে দেব।’

কুমিল্লা জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে আজ সোমবার দুপুরে ‘আমার কুমিল্লা’ অ্যাপের উদ্বোধন অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার এ কথা বলেন। নাগরিক সেবা সহজ করা, অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি এবং সেবায় জবাবদিহি বাড়ানোর লক্ষ্যে অ্যাপটি চালু করেছে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন।

কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে পুলিশের পক্ষ থেকে কাউকে হয়রানি বা পুলিশের কোনো কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে আটকের পর টাকা নেওয়ার অভিযোগ তোলেন এক সাংবাদিক। জবাবে পুলিশ সুপার বলেন, ‘যদি কেউ নিয়ে থাকে, কোনো প্রমাণ একটা দিতে পারেন, ওই পুলিশ অফিসারকে তাৎক্ষণিক সাসপেন্ড করে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ব্যাপারে এক ফোঁটাও ছাড় নাই।’

কুমিল্লা নগরে আবার কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। গত শনিবার রাতে তোলা

যেসব শিক্ষার্থী বা কিশোর অপরাধের সঙ্গে জড়িত নয়, তাদের যাচাই-বাছাই করে অভিভাবকের জিম্মায় দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন পুলিশ সুপার। তিনি জানান, অভিভাবকদের বলা হচ্ছে, সন্ধ্যার পর সন্তানদের বাইরে না রাখতে।  মো. আনিসুজ্জামান বলেন, ‘কিশোর গ্যাংয়ের ব্যাপারে আমরা ছাড় দেব না। কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। এ ব্যাপারে কোনো ছাড় নাই।’
অপ্রতিম হত্যার পর তালিকা করে অভিযান

কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয় সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর। ১৮ সেপ্টেম্বর কোটবাড়ীর গন্ধমতী এলাকার বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় ১৩ বছর বয়সী অপ্রতিম। পরদিন সদর দক্ষিণ উপজেলার সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের মধ্যে দুজন অপ্রাপ্তবয়স্ক। পুলিশ বলেছে, ১৯ বছর বয়সী সাইফুল ইসলাম তুহিনসহ তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

সাংবাদিকদের পুলিশ সুপার বলেন, ‘অপ্রতিম হত্যা মামলার পরে আমরা টোটাল কিশোর গ্যাংয়ের একটি তালিকা করার কাজ করছি। তালিকা করার পর আমরা গত ২৩ সেপ্টেম্বর অভিযান করেছি পুরো কুমিল্লা জেলার ১৮টি থানায়।’

ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম

পুলিশ সুপারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৩ সেপ্টেম্বরের ওই অভিযানে ৬২৪ জনকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে ৪৫১ জনকে মুচলেকায় পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। অপর ১৭৩ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এরপর ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে ১৮ থানায় আরেক দফা অভিযান চালানো হয়। ওই অভিযানে ২৫৪ জনকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে ১৪৬ জন কিশোরকে মুচলেকায় পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হয়। অপর ১০৮ জনের বিরুদ্ধে কিশোর গ্যাং-সংক্রান্ত অপরাধ, মাদক, নিয়মিত মামলা, ভ্রাম্যমাণ আদালত, নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানাসহ বিভিন্ন অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

গতকাল রোববার রাতেও ১৮ থানায় অভিযান চালানো হয়েছে উল্লেখ করে পুলিশ সুপার জানান, রাত শেষে ৪৭৮ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের ২৭৭ জনকে মুচলেকায় পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘কিশোর গ্যাংয়ের যারা অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়েছে, তাদেরকেও গ্রেপ্তার আছে এবং তাদেরকে আমরা মামলা দিয়ে চালান দিচ্ছি।’

মুচলেকায় পরিবারের জিম্মায় দেওয়া কিশোরদের বিষয়ে নজরদারি করা হচ্ছে বলেও জানান পুলিশ সুপার।

কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে আটক কয়েকজনকে পুলিশের গাড়িতে তোলা হচ্ছে। গতকাল রোববার মধ্যরাতে সদর দক্ষিণ মডেল থানার কালির বাজার এলাকায়

‘কিশোর গ্যাং নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত অভিযান’

কুমিল্লায় কিশোর গ্যাং নিয়ে পুলিশ গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করছে বলে জানান পুলিশ সুপার। তিনি বলেন, যেসব এলাকায় গ্যাংয়ের সদস্যরা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে, সেসব জায়গা চিহ্নিত করে অভিযান চালানো হচ্ছে।

কিশোর গ্যাংয়ের কারণে ছিনতাই, ডাকাতি ও অন্যান্য অপরাধ হচ্ছে উল্লেখ করে পুলিশ সুপার জানান, বিভিন্ন মামলার এজাহার ও অপরাধের ধরন পর্যালোচনা করে তাঁরা এসব অপরাধে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের সম্পৃক্ততা পেয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বন্ধ করা গেলে কুমিল্লা শহরসহ পুরো জেলার মানুষের নিরাপত্তা বাড়বে। তিনি বলেন, ‘এ জন্য আমরা এই কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে, এদের নির্মূল না করা পর্যন্ত এই অভিযান কন্টিনিউয়াস থাকবে এবং আমরা এই অভিযানের কোনোভাবেই বিরতি দেব না।’

কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক বা অন্য কোনো চাপ আসেনি বলে জানান পুলিশ সুপার।  কিশোর অপরাধের পেছনে বড় ভাই বা কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার বলেন, ‘যদি কোনো বড় ভাই বা অভিভাবক থেকে থাকেন, তাঁকেও আমরা আইনের আওতায় নিয়ে আসব, আপনি নিশ্চিত থাকেন। এ ধরনের কোনো ছাড় হবে না।’