
মেয়েটাকে বাঁচাতে যা আছে, সব দিচ্ছি। কিন্তু আর কত পারব জানি না, কথাগুলো বলতে বলতে থেমে যান মোহাম্মদ আলম। চোখে–মুখে ক্লান্তি, কণ্ঠে অসহায়ত্ব। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (পিআইসিইউ) সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন তিনি। হঠাৎ খেয়াল হলো, চার মাস বয়সী মেয়ে সুরাইয়া আলমের পরীক্ষার রিপোর্ট আনতে হবে। তখনই ছুটলেন বেসরকারি একটি ল্যাবে।
আজ রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। হাতে শিশুর নানা পরীক্ষার তালিকা নিয়ে দিশাহারা মোহাম্মদ আলম। তিনি জানান, তিন দিন আগে অসুস্থ শিশুকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করেন। চিকিৎসকেরা নানা পরীক্ষা দিয়েছেন; বেশির ভাগ পরীক্ষাই করাতে হচ্ছে বেসরকারি ল্যাবে। প্রায় ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে।
মোহাম্মদ আলম জানান, কক্সবাজার সৈকতে পর্যটকদের ছবি তুলে সংসার চালান তিনি। অল্প আয়ের সংসারে এখন মেয়ের চিকিৎসার খরচ জোগাতে ধার-দেনায় জর্জর। শিশুসন্তানের হামের উপসর্গজনিত নিউমোনিয়া রয়েছে বলে জানান তিনি। আর ১১ বছর বয়সী ছেলেকে বাড়িতে একা রেখেই স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতালে দিন কাটছে তাঁর। মেয়ের খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন বলেন জানান তিনি।
সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে মোহাম্মদ আলম বলেন, ‘চিকিৎসার খরচ পোষাতে নিজের আয়ের একমাত্র উৎস ক্যামেরাটিও বিক্রি করেছি। একদিকে মেয়ের অবস্থা খারাপ, অন্যদিকে ছেলেটা বাসায় একা। কী করব, বুঝতে পারছি না। শুধু চাই, আমার মেয়েটা সুস্থ হয়ে উঠুক। এখানে শুধু একটা পরীক্ষা করিয়েছে। সরকারি হাসপাতালে যদি এটুকু সেবা না পাই, আমরা গরিব মানুষগুলো কোথায় যাব?’
মোহাম্মদ আলম কক্সবাজার সদর উপজেলার বাসিন্দা। তাঁর স্ত্রী ছেনোয়ারা বেগম বলেন, এর আগে এ মাসের শুরুতে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে কক্সবাজারে আইসিইউতে ছিল সুরাইয়া। সেখানে সুস্থ হয়েও উঠেছিল। এরপর তিন দিন আগে জ্বর এলে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন তাঁরা।
চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৭৫ শতাংশ শিশুর নিউমোনিয়াজনিত জটিলতা ছিল বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিত্রও প্রায় একই। উপসর্গ নিয়ে শিশু আইসিইউতে ভর্তি থাকা সব শিশুরই নিউমোনিয়াজনিত জটিলতা রয়েছে বলে জানা গেছে। তাদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আজ বেলা ৩টা পর্যন্ত শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ, হাম ব্লক ও পিআইসিইউ মিলিয়ে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ১২৪টি শিশু ভর্তি ছিল। এর মধ্যে আইসিইউতে ভর্তি ছিল ১৭ শিশু। ২৪ ঘণ্টায় এই হাসপাতালে হামের উপসর্গজনিত নিউমোনিয়ায় ৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ সময় নতুন করে শিশুস্বাস্থ্য বিভাগে ভর্তি হয়েছে ১৯ শিশু।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশু আইসিইউর সামনে বিমর্ষ দাঁড়িয়ে ছিলেন চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ সুমন। তিনি বলেন, ‘৯ মাসের সন্তান ফারহানকে নিয়ে ৮ দিন ধরে হাসপাতালে। আমরা অনেক কষ্ট করে এই ওষুধ চালিয়ে যাচ্ছি।। বাচ্চার শারীরিক অবস্থা ভালো নয়। আমি আগে দোকান করতাম। চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে আমার অনেক টাকা দেনা হয়ে গেছে। তবুও চাই বাচ্চা সুস্থ হোক।’
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ ও হাম ব্লকজুড়ে এখন একই চিত্র। কারও কোলে জ্বরাক্রান্ত শিশু, কেউ অক্সিজেনের অপেক্ষায়, কেউ আবার পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট হাতে ছোটাছুটি করছেন এক ওয়ার্ড থেকে আরেক ওয়ার্ডে। শিশুদের কষ্টের সঙ্গে বাড়ছে স্বজনদের উৎকণ্ঠা। অসহায় হয়ে তাকিয়ে থাকা অভিভাবকদের চোখে জমছে দীর্ঘশ্বাস।
হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ফারহানা জেরিন প্রথম আলোকে বলেন, মারা যাওয়া শিশুদের হাম হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত নয়। তাঁদের হামের উপসর্গজনিত নিউমোনিয়া ছিল। অধিকাংশ শিশুকে সিরিয়াস অবস্থায় হাসপাতালে আনা হচ্ছে। ফলে তৎক্ষণাৎ আইসিইউ সাপোর্ট লাগছে। আইসিইউতে থাকা শিশুদের শারীরিক অবস্থাও আশঙ্কাজনক।