ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড ও রিসাইক্লিং কারখানা
ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড ও রিসাইক্লিং কারখানা

জাহাজভাঙা কারখানায় ১০ জনের মৃত্যু

যেকোনো মুহূর্তে ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে জাহাজের ব্যালাস্ট ট্যাংক

জাহাজ কাটার কাজ চলার সময় নিয়মিত বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হলে সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে ১০ জনের প্রাণহানির দুর্ঘটনা এড়ানো যেত। কিন্তু জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে ব্যালাস্ট ট্যাংকের জমে থাকা পানি থেকে বিষাক্ত গ্যাস বের হওয়ার ঝুঁকি এত দিন যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এখন থেকে ব্যালাস্ট ট্যাংকের পানি সরানোর আগে পানি ও তলানি পরীক্ষা এবং কাজ চলাকালে বারবার গ্যাসের উপস্থিতি পরীক্ষা করতে হবে। কারণ, ব্যালাস্ট ট্যাংক যেকোনো মুহূর্তে ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে।

আজ শনিবার দুপুরে চট্টগ্রামের হোটেল আগ্রাবাদে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের নিরাপত্তা নিয়ে আয়োজিত এক কর্মশালায় এসব কথা বলেন দুর্ঘটনার তদন্তে গঠিত বিশেষজ্ঞ দলের সদস্য ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. ইয়াসির আরাফাত খান।

অধ্যাপক ইয়াসির আরাফাত খান বলেন, দুর্ঘটনাটি প্রতিরোধের উপায় ছিল। কাজ চলার সময় গ্যাস শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেই এটি ঠেকানো সম্ভব হতো। ব্যালাস্ট ট্যাংকের জমে থাকা পানিতে এ ধরনের বিষাক্ত গ্যাস তৈরির ঝুঁকি আগে যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এটি ছিল জ্ঞানের একটি ঘাটতি।

‘জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নিরাপত্তা সচেতনতামূলক কর্মসূচি’ শীর্ষক এ আয়োজন করা হয় শিল্প মন্ত্রণালয় ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ প্রকল্পের সহযোগিতায়। ফেরদৌস স্টিলের দুর্ঘটনা থেকে পাওয়া শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল কর্মসূচির উদ্দেশ্য।

কাজের মধ্যে বদলে যেতে পারে পরিস্থিতি

অধ্যাপক ইয়াসির আরাফাত খান ঘটনার দিনে কী কী ঘটে থাকতে পারে, তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কর্মশালায় উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, কাজ শুরুর আগে পরীক্ষা করে বিষাক্ত গ্যাস না পাওয়ার অর্থ এই নয় যে কিছুক্ষণ পরও জায়গাটি নিরাপদ থাকবে। ব্যালাস্ট ট্যাংকের পানি বের করা, তলানি নাড়াচাড়া করা কিংবা লোহার পাত কাটার পর পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। পানিতে দ্রবীভূত বিষাক্ত গ্যাস তখন বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ব্যালাস্ট ট্যাংক হলো জাহাজের ভারসাম্য ঠিক রাখতে তৈরি বিশেষ পানির ট্যাংক। প্রয়োজন অনুযায়ী এসব ট্যাংকে সমুদ্রের পানি নেওয়া হয়, আবার বের করে দেওয়া হয়। এই পানিকে ব্যালাস্ট পানি বলা হয়।

ফেরদৌস স্টিলের ইয়ার্ডে ভাঙার জন্য আনা ‘এমটি রাসি’ জাহাজটির ব্যালাস্ট ট্যাংকে দীর্ঘদিন পানি জমে ছিল। বিশেষজ্ঞ দলের তদন্তে দেখা গেছে, স্থির পানির নিচের অংশে অক্সিজেন কমে এমন পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, যেখানে অণুজীবের ক্রিয়ায় সালফাইড তৈরি ও জমা হতে পারে। পানি বের করা বা তলানি নাড়াচাড়া করলে সেখান থেকে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস দ্রুত বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

গত ১৪ আগস্ট সকালে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারিতে ফেরদৌস স্টিলের ইয়ার্ডে দুর্ঘটনাটি ঘটে। পুরোনো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী জাহাজ ‘এমটি রাসি’র ৩ নম্বর ব্যালাস্ট ট্যাংকের নিচের অংশে ছিদ্র করে জমে থাকা পানি বের করছিলেন শ্রমিকেরা। এ সময় বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শে এসে একের পর এক শ্রমিক অসুস্থ ও অচেতন হয়ে পড়েন। ওই দিন ৯ জন মারা যান। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজনের মৃত্যু হলে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১০ হয়।

দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড ফেরদৌস স্টিলের সব কার্যক্রম স্থগিত করে। কারণ অনুসন্ধানে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। বিশেষজ্ঞ দলের প্রাথমিক অনুসন্ধানে ব্যালাস্ট ট্যাংকের পানিতে দ্রবীভূত হাইড্রোজেন সালফাইডকে দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

কর্মশালায় অধ্যাপক ইয়াসির আরাফাত খান জানান, ১৭ ও ১৮ আগস্ট বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। আক্রান্ত শ্রমিক, অগ্নিনির্বাপণকর্মী ও উদ্ধারকারীদের কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হয়। বিভিন্ন স্থানে গ্যাসের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়। পানি ও তলানির নমুনা সংগ্রহ করে বুয়েটের পরীক্ষাগারেও পরীক্ষা করা হয়েছে।

উদ্ধার করতে গিয়ে বাড়ে হতাহত

অধ্যাপক ইয়াসির আরাফাত খান বলেন, দুর্ঘটনাটির আরেকটি বড় শিক্ষা উদ্ধার ব্যবস্থা নিয়ে। বিষাক্ত গ্যাসে কেউ অচেতন হলে তাঁকে বাঁচাতে সুরক্ষা ছাড়া একই জায়গায় প্রবেশ করলে উদ্ধারকারী নিজেও আক্রান্ত হতে পারেন। ফেরদৌস স্টিলের দুর্ঘটনায়ও এমনটি ঘটেছে।

প্রথমে দুজন শ্রমিক অচেতন হয়ে পড়ে ছিলেন। তাঁদের উদ্ধার করতে অন্যরা এগিয়ে যান। যথাযথ শ্বাসপ্রশ্বাসের সুরক্ষাব্যবস্থা না থাকায় তাঁরাও বিষাক্ত পরিবেশের সংস্পর্শে আসেন। ফলে একটি ঘটনা একাধিক মানুষের প্রাণহানিতে রূপ নেয়।

অধ্যাপক ইয়াসির আরাফাত খান বলেন, শুধু উদ্ধার সরঞ্জাম থাকলেই হবে না। সেগুলো ব্যবহার করতে জানেন, এমন প্রশিক্ষিত লোকও থাকতে হবে। দুর্ঘটনা ঘটার পর উদ্ধার পরিকল্পনা করলে চলবে না; ঝুঁকিপূর্ণ কাজ শুরুর আগেই সেই পরিকল্পনা থাকতে হবে।

তদন্ত কমিটির সুপারিশেও বদ্ধ বা বিষাক্ত জায়গায় কাজের সময় বাইরে প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দল প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। প্রতিটি কারখানায় নিয়মিত উদ্ধার মহড়া এবং সার্বক্ষণিক জরুরি উদ্ধারকারী দল রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতি এক-দুই ঘণ্টায় গ্যাস পরীক্ষার সুপারিশ

একই ধরনের দুর্ঘটনা ঠেকাতে তদন্ত কমিটি ৩৫টি সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে কাজ চলার সময় প্রতি এক থেকে দুই ঘণ্টা পরপর গ্যাস পরীক্ষা এবং ফল লিখিতভাবে সংরক্ষণের কথা রয়েছে। কাজ শুরুর আগে অক্সিজেনের পরিমাণ এবং বিষাক্ত ও দাহ্য গ্যাস আছে কি না, তা পরীক্ষা করার সুপারিশও করা হয়েছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশে ভাঙার জন্য আসা জাহাজের প্রতিটি ব্যালাস্ট ট্যাংকের পানি ও তলানি পরীক্ষা, ট্যাংকের জন্য আলাদা বায়ু চলাচল পরিকল্পনা, মাসে অন্তত দুইবার জরুরি মহড়া এবং নজরদারি ক্যামেরার ধারণ করা দৃশ্য সংরক্ষণের সুপারিশ করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজের জন্য লিখিত অনুমতি, প্রশিক্ষিত নিরাপত্তা তত্ত্বাবধায়ক এবং শ্রমিকদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের কথাও বলা হয়েছে।

তদন্তে উঠে এসেছে, ফেরদৌস স্টিলের দুর্ঘটনার খবর ফায়ার সার্ভিসকে দেরিতে দেওয়া হয়েছিল। ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসকে জানাতে বলা হয়েছে। নিরাপত্তায় অবহেলার জন্য ফেরদৌস স্টিলের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করেছে তদন্ত কমিটি।

কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. রাশেদুল ইসলাম। আজ হোটেল আগ্রবাদে

অনুষ্ঠানে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. রাশিদুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতা নিরাপত্তাবিধির বিকল্প হতে পারে না। একজন শ্রমিক বহু বছর একই কাজ নিরাপদে করেছেন বলে পরেরবারও দুর্ঘটনা ঘটবে না—এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই প্রতিবারই নির্ধারিত নিরাপত্তাবিধি অনুসরণ করতে হবে।

তিনি বলেন, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে মালিকেরা দূর থেকেও শ্রমিকেরা নিরাপত্তাবিধি মানছেন কি না, তা পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। দুর্ঘটনার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে আগেই তা প্রতিরোধ করা জরুরি। কারণ, একটি মানুষের মৃত্যু হলে তাঁকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

জাইকার জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ–বিষয়ক প্রতিনিধি আকিরা ওকামোতো বলেন, হংকং কনভেনশন অনুযায়ী কোনো কারখানা সনদ পেলেই সেখানে আর দুর্ঘটনা ঘটবে না, এমন নিশ্চয়তা নেই। নিরাপত্তাব্যবস্থার ক্রমাগত উন্নতি করতে হবে। এর জন্য মালিকপক্ষ থেকে শুরু করে ব্যবস্থাপক ও শ্রমিক—সবার অঙ্গীকার প্রয়োজন। তিনি বলেন, কর্মশালার উদ্দেশ্য কাউকে দোষী করা নয়; দুর্ঘটনা থেকে পাওয়া শিক্ষা পুরো শিল্পে ছড়িয়ে দেওয়া। প্রতিটি কর্মস্থলে নিরাপত্তার ঘাটতি চিহ্নিত করে তা দূর করতে হবে।

অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন, বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ মহসিনসহ সরকারি কর্মকর্তা, জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার মালিক ও প্রতিনিধি এবং নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের মহাপরিচালক গাজী মো. আসাদুজ্জামান কবির এ খাতে নিরাপত্তা সংস্কৃতির উন্নয়নে শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিএসআরবির প্রস্তাবিত সুপারিশ তুলে ধরেন।