
সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে আজ বুধবার দেশের বিভিন্ন এলাকায় পবিত্র ঈদুল আজহা উদ্যাপিত হচ্ছে। চাঁদপুর, সাতক্ষীরা, সুনামগঞ্জসহ দেশের অন্তত ১১ জেলার বিভিন্ন গ্রামে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পরে তাঁরা পশু কোরবানির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
দীর্ঘদিন ধরে সৌদিসহ বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে কয়েকটি জেলার মুসল্লিরা পবিত্র ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা পালন করে আসছেন। আজ ঈদের নামাজ শেষে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি এবং দেশের সার্বিক কল্যাণ কামনা করে দোয়া করা হয়।
চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ, ফরিদগঞ্জ, শাহরাস্তি ও মতলব উত্তর উপজেলার প্রায় অর্ধশত গ্রামে আজ ঈদুল আজহা উদ্যাপিত হচ্ছে। জেলার হাজীগঞ্জের সাদ্রা দরবার শরিফের প্রয়াত পীর মাওলানা ইছহাক চৌধুরীর প্রচলিত রীতি মেনে প্রায় ৯৮ বছর ধরে এসব গ্রামে ঈদ উদ্যাপন করা হচ্ছে।
আজ সকাল সাড়ে আটটায় সাদ্রা হামিদিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসা মাঠে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইমামতি করেন সাদ্রা দরবার শরিফের পীর মুফতি আরিফুল্লাহ চৌধুরী। তিনি বলেন, পৃথিবীর যেকোনো স্থানে চাঁদ দেখার ভিত্তিতেই শরিয়তের বিধান মেনে ঈদের নামাজ পড়া হয়েছে। তিনি সরকারের প্রতি বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একই দিনে ঈদ উদ্যাপনের আহ্বান জানান।
এদিকে মতলব উত্তরের পাঁচানি, আইটাদি পাঁচানি, দেওয়ানকান্দি, মাথাভাঙা, আইটাদি মাথাভাঙা ও বাহেরচরসহ মোট ১০টি গ্রামের প্রায় ৩০ হাজার মুসলমান আজ পবিত্র ঈদুল উদ্যাপন করেছেন। আজ সকাল আটটা থেকে ১০টার মধ্যে পৃথক জামাতে তাঁরা ঈদের নামাজ আদায় করেন। স্থানীয় মসজিদের ইমামরা ঈদের নামাজে ইমামতি করেন।
পাঁচানি গ্রামের মো. জুয়েল বলেন, ৯৮ বছর ধরে এই রীতিতে তাঁরা ঈদ উদ্যাপন করে আসছেন। এক দিন আগে ঈদ পালন করতে পেরে তাঁরা খুবই খুশি ও উচ্ছ্বসিত।
এদিকে পঞ্চগড়ের একটি গ্রামে ১১ জন মুসল্লির অংশগ্রহণে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। সদর উপজেলার হাফিজাবাদ ইউনিয়নের উত্তর কামারপাড়া গ্রামের মোহাম্মদ আবদুল্লাহর বাড়ির ছাদে এ জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইমামতি করেন আবদুল্লাহর ছেলে স্থানীয় একটি মাদ্রাসার হেফজ শাখার ছাত্র তাহমিদ ইব্রাহীম। পরে একটি খাসি কোরবানি করা হয়।
২০১৭ সাল থেকে সৌদির সঙ্গে মিল রেখে উত্তর কামারপাড়াসহ কয়েকটি গ্রামের প্রায় ২৫টি পরিবারের ৪০ থেকে ৪৫ জন পুরুষ ও নারী একত্রে উত্তর কামারপাড়া জামে মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করতেন। ২০২১ সালে স্থানীয় লোকজনের বাধার মুখে পড়ে তাঁরা পুলিশি পাহারায় ঈদের নামাজ পড়েন। এরপর মুসল্লির সংখ্যা কমে যায়। তখন থেকে তাঁরা উত্তর কামারপাড়া জামে মসজিদের সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আবদুল্লাহর বাড়ির ছাদে ঈদের নামাজ আদায় করে আসছেন। এরই ধারাবাহিকতায় আজ সকালে পাঁচটি পরিবারের শিশুসহ ১১ জন ঈদের জামাতে অংশ নেন।
মোহাম্মদ আবদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, প্রতি শুক্রবার বাংলাদেশের তিন ঘণ্টা পর সৌদি আরবে জুমার নামাজ আদায় হয়। সেই ক্ষেত্রে তো বারের কোনো পার্থক্য নেই, শুধু সময়টা কমবেশি। এ জন্য তাঁরা আজ ঈদুল আজহার নামাজ আদায়ের পর কোরবানি করেছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে মিল রেখে ফরিদপুরের বোয়ালমারী ও আলফাডাঙ্গা উপজেলার ১০টি গ্রামের বাসিন্দারা আজ ঈদ উদ্যাপন করছেন। আজ সকাল ৮টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে বোয়ালমারী উপজেলার শেখর ও রুপাপাত ইউনিয়নের সহস্রাইল দায়রা শরিফ, রাখালতলি ও মাইটকুমরা মসজিদে পর্যায়ক্রমে চারটি ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, বোয়ালমারীর কাটাগড়, সহস্রাইল, দরিসহস্রাইল, মাইটকুমরা, রাখালতলি, গঙ্গানন্দপুরসহ অন্তত ১০টি গ্রামের বাসিন্দাদের একটি অংশ চট্টগ্রামের মির্জাখিল দরবার শরিফের অনুসারী। তাঁরা মূলত চন্দ্র মাস ও সৌদির সঙ্গে মিল রেখে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করে থাকেন। প্রতিবছরের মতো এবারও তাঁরা এক দিন আগে ঈদের নামাজ আদায় করেন।
আলফাডাঙ্গা উপজেলার ধলেরচর গ্রামের আবু বক্কার সিদ্দিক বলেন, আগে ধলেরচর মাদ্রাসা ঈদগাহ মাঠে তাঁদের আলাদা জামাত হতো। কিন্তু ইমাম অধ্যক্ষ আবদুর রহমানের মৃত্যুর পর সেখানে আর জামাত হচ্ছে না। এখন ধলের চরের মুসল্লিরা সহস্রাইল দায়রা শরিফে গিয়ে ঈদের নামাজ পড়েন।
এদিকে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার পবিত্র ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ সকাল সাড়ে ৯টার দিকে উপজেলার মনোহরপুর ইউনিয়নের তালুক ঘোড়াবান্দা গ্রামের মধ্যপাড়ার একটি ভবনের ছাদে এ ঈদের নামাজ আদায় করেন সহিহ্ হাদিস সম্প্রদায়ের মুসল্লিরা। এতে কয়েকটি গ্রামের ২১ জন মুসল্লি অংশ নেন। প্রায় ১৬ বছর ধরে তাঁরা এভাবে ঈদ উদ্যাপন করে আসছেন।
সকালের বৃষ্টি উপেক্ষা করে গাইবান্ধা সদর, পলাশবাড়ী ও সাদুল্যাপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে হেঁটে, বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল নিয়ে তালুক ঘোড়াবান্ধা মধ্যপাড়ায় তাঁরা জড়ো হন। পরে তাঁরা ভবনের ছাদে ঈদের নামাজ পড়েন। নামাজ শেষে মুসল্লিরা একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করেন।
পলাশবাড়ীর তালুক ঘোড়াবান্ধা গ্রামের ইউনুস সরকার (৬৫) বলেন, ‘আমাদের গ্রামের পাঁচ-ছয়টি পরিবার মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে মিল রেখে ঈদের নামাজ পড়ে আসছে। নামাজ শেষে দুটি পশু কোরবানি করা হয়েছে।’
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় ঈদুল আজহা উদ্যাপন করছেন আটটি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার বাসিন্দা। আজ সকাল আটটায় উপজেলার ধানখালী ইউনিয়নের উত্তর নিশানবাড়িয়া জাহাগিরিয়া শাহসুফি মমতাজিয়া দরবার শরিফ মসজিদে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া উপজেলার ইটবাড়িয়া, কলাপাড়া পৌর শহরের নাইয়াপট্টি, টিয়াখালী, তেগাছিয়া, লালুয়া, ফুলতলী ও দক্ষিণ দেবপুর গ্রামে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে।
স্থানীয়ভাবে এসব মুসল্লি ‘চানটুপির’ অনুসারী হিসেবে পরিচিত। তাঁরা মূলত চট্টগ্রামের এলাহাবাদ শাহ সুফি জাহাগিরিয়া দরবার শরিফের অনুসারী। প্রায় ১৫০ বছর ধরে সৌদির সঙ্গে মিল রেখে তারা ঈদ পালন করে আসছেন।
নিশানবাড়িয়া জাহাগিরিয়া শাহ সুফি মমতাজিয়া দরবার শরিফের পরিচালক নিজাম উদ্দিন বিশ্বাস বলেন, আজ ঈদুল আজহা উদ্যাপন ভুল নয়; বরং সঠিক নিয়মেই পালন করা হচ্ছে। অনেকে বলে থাকেন, একদিন আগে তাঁরা কীভাবে ঈদ পালন করেন। আসলে হজের শেষে কোরবানি করাটাই হচ্ছে নিয়ম। তাঁরা সেই নিয়ম পালন করেছেন।
কুড়িগ্রামের রৌমারী ও ফুলবাড়ী উপজেলার অন্তত ছয়টি গ্রামের আহলে হাদিস অনুসারীরা আজ ঈদুল আজহা উদ্যাপন করেছেন। রৌমারীর শৌলমারী ইউনিয়নের গয়টাপাড়া গ্রামের মো. ছমির ব্যাপারীর বাড়ির মসজিদে সকাল সাড়ে আটটা থেকে সোয়া নয়টা পর্যন্ত ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইমামতি করেন হাফেজ আবু সাঈদ। প্রায় ১০০ জন নারী-পুরুষ জামাতে অংশ নেন। অন্যদিকে ফুলবাড়ী উপজেলার জেলেপাড়া আহলে হাদিস মসজিদ প্রাঙ্গণে আরেকটি জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রায় ৬০ জন মুসল্লি অংশ নেন।
এদিকে বিরামপুর উপজেলার দুটি স্থানে প্রায় ১৬টি গ্রামের নারী-পুরুষ পবিত্র ঈদের নামাজ আদায় করেছেন। আজ সকাল আটটা থেকে সোয়া নয়টার মধ্যে উপজেলার বিনাইল ইউনিয়নের আয়ড়া জামে মসজিদে ও জোতবানী ইউনিয়নের খয়েরবাড়ি পশ্চিমপাড়া জামে মসজিদে এসব জামাত অনুষ্ঠিত হয়। আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে পায়ে হেঁটে, ব্যাটারিচালিত ভ্যান, বাইসাইকেল ও মোটরসাইকেলে করে মুসল্লিরা জামাতে অংশ নেন। নামাজ শেষে পশু কোরবানি দেওয়া হয়।
খয়েরবাড়িতে ঈদের জামাতে ইমামতি করা দেলোয়ার হোসেন কাজি বলেন, ইসলামি রীতি অনুযায়ী চাঁদ ওঠার নির্দিষ্ট সময় পরই ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে। সেই অনুযায়ী এক যুগের বেশি সময় ধরে সৌদির সঙ্গে মিল রেখে তাঁরা ঈদের নামাজ আদায় করে আসছেন। নামাজে মুসলিম উম্মাহর জন্য মোনাজাত করা হয়েছে।
এদিকে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার ধর্মপাশা উত্তরপাড়া, দশধরী, রাধানগর, কান্দাপাড়া, সৈয়দপুর, গাছতলা, জামালপুর, রাজনগর, মেউহারী, বাহুটিয়াকান্দা, মগুয়ারচর, মহদীপুরসহ ১২টি গ্রামের মুসল্লিদের একাংশ আজ ঈদের নামাজ আদায় করেছেন। তাঁরা শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার সুরেশ্বরী দরবার শরিফের অনুসারী।
সকাল সাড়ে আটটায় উপজেলা সদর ইউনিয়নের দশধরী গ্রামের খানকায়ে সুরেশ্বরী দরবার শরিফে ও সকাল সাড়ে নয়টায় ধর্মপাশা উত্তরপাড়া গ্রামের খানকায়ে সুরেশ্বরী দরবার শরিফে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। উত্তরপাড়ায় ইমামতি করেন খানকার খতিব মাওলানা রিফাত নূরী আল মুজাদ্দেদী। আর দশধরী খানকায় নামাজ পড়ান খতিব মো. পলাশ মিয়া। পলাশ মিয়া বলেন, সৌদির সঙ্গে মিল রেখে ৩০ বছর ধরে দশধরী খানকা শরিফে ঈদুল আজহার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
সাতক্ষীরার ২৫টি গ্রামের মুসল্লিরা আজ ঈদুল আজহা উদ্যাপন করছেন। আজ সকাল সাড়ে সাতটায় সদর উপজেলার বাওখোলা পূর্বপাড়া জামে মসজিদে এ জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপজেলার ইসলামকাটি, গোয়ালচত্বর, ভাদড়া, ঘোনা, ভাড়ুখালী, মিরগিডাঙ্গাসহ বিভিন্ন গ্রামের মানুষ অংশ নেন। পরে তাঁরা কোরবানির কাজ সম্পন্ন করেন।
মুসল্লিরা জানান, এক যুগ ধরে তাঁরা সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করে আসছেন। সেই ধারাবাহিকতায় আজ তাঁরা ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করেছেন এবং কোরবানি করেছেন।
সৌদির সঙ্গে মিল রেখে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় পবিত্র ঈদুল আজহা উদ্যাপন করেছেন ‘জাহাগিরিয়া তরিকার’ অনুসারীরা। বুধবার সকাল ৯টায় সদর উপজেলার লামাপাড়া এলাকার হজরত শাহ সুফি মমতাজিয়া এতিমখানা ও হেফজখানা মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। সকাল নয়টায় শুরু হওয়া জামাতে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা কয়েক শ মুসল্লি অংশ নেন।
ঈদের নামাজ পড়তে গাজীপুরের টঙ্গী, ঢাকার কেরানীগঞ্জ, পুরান ঢাকা, ডেমরা ও সাভার ছাড়াও নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ, রূপগঞ্জ, বন্দর, আড়াইহাজার ও সোনারগাঁ উপজেলা থেকে অনুসারীরা আসেন। আয়োজকেরা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই তাঁরা এভাবে ধর্মীয় উৎসব পালন করে আসছেন। এবারও এক দিন আগে ঈদুল আজহা উদ্যাপন করা হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিনটি উপজেলার কয়েকটি গ্রামের নির্দিষ্ট কিছু পরিবার ও মুসল্লিরা ঈদুল আজহা উদ্যাপন করেছেন। আজ সকালে আটটায় শিবগঞ্জ উপজেলার ৭৬ বিঘি এলাকার একটি মসজিদে প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এতে শিবগঞ্জসহ আশপাশের এলাকার প্রায় ২০০ নারী-পুরুষ অংশ নেন।
অন্যদিকে সদর উপজেলার দেবীনগর ইউনিয়নের মোমিনটোলা ও বাগানপাড়া এবং গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুর পৌর এলাকার দিঘিপাড়া স্টার পার্ক মাঠেও পৃথকভাবে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই সব গ্রামের নির্দিষ্ট কিছু পরিবার এই ঈদের জামাতে অংশ নেয়।
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা]