
বরিশালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্বাচনী জনসভার মাঠে দুই পক্ষের মধ্যে মারামারিতে মারা যাওয়া কৃষক লীগ নেতা সিরাজ সিকদারের (৫৮) লাশ শনিবার বিকেলে বরিশাল থেকে হিজলায় পৌঁছায়। এ সময় স্বজন ও প্রতিবেশীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরিবারের সদস্যরা এ সময় সিরাজের মৃত্যুর ঘটনার বিচার দাবি করেন। সন্ধ্যায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
এদিকে সিরাজকে নিজেদের সমর্থক দাবি করে শাম্মী ও পংকজ নাথের অনুসারীরা শুক্রবার রাতে এবং শনিবার সন্ধ্যায় মেহেন্দীগঞ্জে বিক্ষোভ করে বিচার দাবি করেছেন। মেহেন্দীগঞ্জ ও হিজলায় দুই পক্ষের মধ্যে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। তবে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
শুক্রবার দুপুরে বরিশালের বঙ্গবন্ধু উদ্যানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভায় বরিশাল-৪ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ও স্বতন্ত্র প্রার্থী পংকজ নাথ ও আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী (প্রার্থিতা বাতিল) শাম্মী আহম্মেদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষ চলার সময় সিরাজ সিকদার অসুস্থ হয়ে পড়লে বরিশাল শের-ই-বাংলা হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক কবির উদ্দিন শুক্রবার রাতে বলেছিলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি, হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে ওই ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। তবু সন্দেহের কারণে আমরা মরদেহ মর্গে পাঠিয়েছি। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেলে প্রকৃত কারণ জানা যাবে।’
সিরাজ সিকদারের বাড়ি হিজলার গুয়াবাড়িয়া ইউনিয়নের কোড়ালিয়া মাষকাটা গ্রামে। তিনি ওই ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড কৃষক লীগের সভাপতি ছিলেন। তাঁর ৫ ছেলে ও ২ মেয়ে রয়েছে।
সিরাজ সিকদারের ভাই বাকিবুল্লা সিকদার শনিবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার ভাই শাম্মী আহম্মেদের সমর্থক। তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুলতান মাহমুদ সিকদার ও গুয়াবাড়িয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইসহাক আমিনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর জনসভায় যোগ দিতে বরিশালে গিয়েছিলেন। জনসভায় মারামারিতে আমার ভাই অসুস্থ হয়ে পড়লে খবর পেয়ে আমি বরিশাল ছুটে যাই এবং গিয়ে দেখি আমার ভাই মারা গেছেন। এর সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের আমি বিচার চাই।’
সিরাজ সিকদারের জানাজায় উপস্থিত ছিলেন শাম্মী আহম্মেদের ছোট ভাই মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাহাব আহমেদ, হিজলা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুলতান মাহমুদ, সহসভাপতি ইসমাইল হোসেন মাস্টার, গুয়াবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শাজাহান তালুকদার, হিজলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলতাব মাহমুদ প্রমুখ।
সুলতান মাহমুদ বলেন, ‘সিরাজ সিকদারের মৃত্যু একটি দুঃখজনক ঘটনা। সিরাজ সিকদার দলের একজন নিবেদিত নেতা ছিলেন। আমরা এ ঘটনার তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।’ আলতাব মাহমুদ বলেন, ‘দলীয়ভাবে এ ঘটনায় মামলার সিদ্ধান্ত হলে আমি বাদী হয়ে সিরাজ সিকদারের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা করব। বিষয়টি নিয়ে আমরা দলীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছি।’
বরিশাল-৪ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য পংকজ নাথ এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাননি। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। এ আসনে এবার দলের মনোনয়ন পেয়েছিলেন দলের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক–বিষয়ক সম্পাদক শাম্মী আহম্মেদ। দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকায় তাঁর প্রার্থিতা নির্বাচন কমিশন বাতিল করেছে।
এদিকে শুক্রবার রাতে শাম্মীর সমর্থকেরা সিরাজের মৃত্যুর ঘটনায় বিচার দাবি করে মেহেন্দীগঞ্জ শহরে বিক্ষোভ করেন। পংকজ নাথের সমর্থকেরা শনিবার সন্ধ্যায় সিরাজ হত্যার বিচার চেয়ে পাল্টা মিছিল করেন।
শাম্মীর অনুসারী হিজলা উপজেলা কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মঞ্জুর মোর্শেদ বলেন, ‘আমরা আগে থেকে জনসভাস্থলে ছিলাম। পংকজ নাথের অনুসারীরা জনসভাস্থলে আসার পর আমাদের দিকে বোতল ছুড়ে মারতে থাকে। এরপর দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি হয়। তখন নিচে পড়ে গিয়ে সিরাজ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।’
পংকজের অনুসারী মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ভুট্টো মোল্লা শুক্রবার সিরাজ সিকদারকে তাঁদের পক্ষের লোক বলে দাবি করে অভিযোগ করেছিলেন, ‘মিছিল নিয়ে জনসভাস্থলে ঢুকছিলাম। আগে থেকে অবস্থান নেওয়া শাম্মীর অনুসারীরা আমাদের ওপর বোতল নিক্ষেপ শুরু করে। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি হয়। তখন লাঠি দিয়ে পিটিয়ে সিরাজসহ ১৫ জনকে আহত করা হয়। এর মধ্যে সিরাজ নিহত হয়েছেন।’