রেজাউল করিম খন্দকারের বাড়ির বাগানে আম গাছগুলোতে ঝুলছে বিভিন্ন জাতের আম। গত শুক্রবার মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের সরিয়া গ্রামে
রেজাউল করিম খন্দকারের বাড়ির বাগানে আম গাছগুলোতে ঝুলছে বিভিন্ন জাতের আম। গত শুক্রবার মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের সরিয়া গ্রামে

চাকরির ফাঁকে রেজাউলের গড়ে তোলা বাগানে অর্ধশতাধিক জাতের আমগাছ

শখ থেকেই দেশ-বিদেশ থেকে আমের চারা সংগ্রহ করে বাড়িটির সীমানার মধ্যে রোপণ করা হয়। ৫০–এর অধিক আমের জাত এখন ওই বাড়ির বাগানে। কয়েক বছর ধরেই বিভিন্ন গাছে, বিভিন্ন জাতের আম আসছে। এতে ওই বাড়ির লোকজনের আমের চাহিদাই শুধু পূরণ হচ্ছে না, আমের বৈচিত্র্যপূর্ণ স্বাদের সঙ্গেও তাঁদের পরিচিত করছে। এবার টানা খরার কবলে পড়ে বাগানটি, তারপরও গাছে গাছে ধরেছে প্রায় ৩৭ জাতের আম। নানা আকার, রং ও স্বাদের আম এখন গাছের ডালে ডালে ঝুলছে। এতেই ‘শৌখিন চাষি’ রেজাউল করিম খন্দকারের মন ভরে উঠেছে।

শুধু আমই নয়, অন্য সব ফলও আছে রেজাউলের বাগানে। তবে এখন আমের মৌসুম, তাই আমটাই বেশি চোখে পড়ে। ধীরে ধীরে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের আম পাকছে। এভাবেই আরও একটা মাস নানা বৈচিত্র্য ও স্বাদের আম রেজাউল করিমের শ্রম ও আকাঙ্ক্ষার পূর্ণতা দিতে থাকবে। রেজাউলের বাড়ি মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের সরিয়া গ্রামে।

বাগানে বিভিন্ন জাতের আম দেখাচ্ছেন রেজাউল করিম খন্দকার

সরিয়া গ্রামের টিলামতো বাড়িটি এখন অনেক রকমের ফল-ফুলে অনেকটা বুনো চেহারা নিতে শুরু করেছে। বৃষ্টি পেয়ে সবুজ হয়ে উঠছে পুরো বাড়ি। প্রায় দুই একরের বাড়ির যেদিকে তাকানো যায়, নানারকম ফল গাছেরই সমারোহ চোখে পড়ে। এরমধ্যে আমই বেশি। কোনো গাছে আম এখনো কাঁচা-সবুজ, কোনোটিতে পাক ধরেছে। কোনোটি পেকে গেছে। আম পাকার এই ধারা পর্যায়ক্রমে এক মাস ধরে চলবে।

রেজাউল করিম বাড়ির বাগানে ফল চাষের শুরুটাও করেছিলেন আমের চারা রোপণের মাধ্যমে। ২০১৭ সালে শখ থেকে বাড়ি লাগোয়া একটি টিলায় আমের চারা রোপণ করেন। সেই থেকে ফল রোপণের শুরু, ধীরে ধীরে আমের জাত ও গাছের সংখ্যা বেড়েছে। যত দিন গেছে—নানা স্বাদ ও রঙের বৈচিত্র্য তাঁকে আমের প্রতি আরও আগ্রহী করে তুলেছে। দেশ-বিদেশের নানা প্রান্ত থেকে আমের চারা সংগ্রহ করেছেন। আমের জাত ছাড়িয়েছে ৫০–এর অধিক।

রেজাউল করিম গত শুক্রবার প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, তিনি একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। এই চাকরির বাইরে যেটুকু অবসর পান, তার বেশির ভাগ সময় ওই বাগানেই ব্যয় করে থাকেন। এটি কোনো বাণিজ্যিক উদ্যোগ নয়, এটি তাঁর শখের, ভালো লাগার, ভালোবাসার একটি উদ্যান। যখনই গাছে আমের এমন সমারোহ দেখেন, গাছের দিকে তাকান—তাঁর মন ভরে যায়। এখন আমের মৌসুম। গাছের শাখা-প্রশাখায় কাঁচা–পাকা আম ঝুলছে।

এসব আমের মধ্যে আছে আলফানসো, আমেরিকান কেন্ট, হিমসাগর, চেং মাই, পাকিস্তানি চোষা, আমেরিকান পালমা, সামার বেহেস্ত, সূর্যডিম, নাচ ১, নাচ ২, নাচ ৩, বৈশাখী, বান্দি নুড়ি, গৌর মতি, কাটিমন, থাই কাঁচা মিঠা, কুনাই, বাউ ৩, বারি ১১, নাম ডাক মাই, হাঁড়িভাঙা, ব্লাকস্টোন, মহাচনক, কিউজাই, ব্রুনাই কিং, ব্যানানা, আম্রপালি, হানিডিউ, বারি ৪, ঝাই সাই, ন্যাম ডকমাই ইয়েলো, ন্যাম ডকমাই মুন, সীতাভোগ, অম্বিকা, ভ্যালেন্সিয়া প্রাইড, অস্টিন, সাদা পুনাই, সি-মুয়াং, সারেংগা ইত্যাদি।

রেজাউল করিম জানিয়েছেন, এবার ফলন মোটামুটি ভালো হয়েছে। লম্বা খরার কবলে না পড়লে গাছে প্রচুর আম থাকত। খরায় অনেক আম ঝরে পড়েছে। খরার সময় তাঁর সেচের মোটরটি নষ্ট হয়ে যায়। এটি ঠিক করাতে দুই দিন সময় যায়। এতে অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। এবার নাচ ১ ও নাচ ৩, সামার বেহেস্ত, আমেরিকান কেস্ট ও আমেরিকান পালমা জাতের আম বেশি এসেছে। খরার সময় ব্যানানা জাতের এক গাছে ২০০ আম গুনে দেখেছেন। ব্রুনাই কিং জাতের একটি আম এখনই গাছে দুই কেজি ওজন হয়েছে। এখনো কাঁচা রয়েছে। গত বছর একই জাতের একটি আম সাড়ে তিন কেজি ওজন হয়েছিল। এবার দুই কেজির আমটি পাঁচ কেজির মতো হতে পারে বলে আশা করছেন।

নিজের বাগানের আম নিয়ে শৌখিন এই চাষির ভাষ্য, বাগানে যে আম আছে, সব গাছের সেই আম পাকতে এক মাসের মতো সময় লাগবে। এতে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন স্বাদের আম খেতে পারবেন তিনি। তাঁর বাগানের আম বিক্রি করার ইচ্ছা নেই। এই বাগান তৈরি করায় নিজের পরিবারের আমের চাহিদা পূরণ হচ্ছে। সেই সঙ্গে বৈচিত্র্যপূর্ণ আম খেতে পারছেন পরিবারের সদস্যরা। আত্মীয়স্বজনকে দিতে পারছেন নতুন ধরনের, নতুন স্বাদের আম। তাঁর আমবাগান দেখতে প্রায়ই পরিচিত লোকজন এসে থাকেন।

রেজাউল করিম খন্দকারের বাড়ির বাগানে এবার ৩৭ জাতের আম ধরেছে

রেজাউল করিম জানান, এই আম চাষে চারা রোপণ শেষে তাঁর তেমন কোনো বাড়তি খরচ নেই। গাছে কোনো ধরনের রাসায়নিক সার ব্যবহার করেন না। নিজে প্রয়োজনীয় জৈব সার তৈরি করেন—এই সারই ব্যবহার করেন। তিনি আরও বলেন, ‘আমি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আমের চারা সংগ্রহ করা ছাড়াও ভারত থেকেও চারা এনেছি। আমের জাত আরও বাড়ানোর ইচ্ছা আছে। এবার বিভিন্ন স্থান থেকে আরও চারা আনাব। বাড়ির মধ্যে বাগান তৈরি ও আম চাষে আমার তেমন কোনো সমস্যা হয় না। তবে প্রায়ই তিন-চারটা বানর আসে, এ ছাড়া বেশি সমস্যা করে কাঠবিড়ালি ও বাঁদুড়। নানা কায়দায় তাদের তাড়ানোর ব্যবস্থা করি। সমস্যা বলতে এটুকুই।’

রেজাউলের বাড়িতে নানা জাতের আমের সমাহারে মুগ্ধ স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারাও। বড়লেখা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত সপ্তাহেও আমি ওই বাড়িতে গিয়েছিলাম। এবার মোটামুটি ফলন ভালো হয়েছে। আমের অনেক ধরনের ভেরাইটি আছে। কোনো জাতের ভালো হয়েছে, কোনো জাতের কিছুটা কম। ফলন খুব ভালো না, আবার একেবারে খারাপ না। উনি তো শুধু বাংলাদেশ না বাইরের অনেক দেশ থেকে আমের জাত, চারা এনেছেন।’