
শুক্রবার সকাল ছয়টা। ২৬ হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কেটে মাছ ধরা প্রতিযোগিতায় অংশ নেন শৌখিন মৎস্যশিকারি মজিবুর রহমান। সাড়ে তিন ঘণ্টা বড়শি পেতে রাখার পর সাড়ে সকাল ৯টার দিকে ৮ কেজি ৩৬০ গ্রাম ওজনের একটি কাতলা মাছ ধরেন তিনি। এর আগে-পরে আর কোনো মাছ ধরতে পারেননি। কিন্তু এক কাতলায় বাজিমাত করেছেন মজিবুর। প্রথম পুরস্কার হিসেবে পেয়েছেন আড়াই লাখ টাকা।
মজিবুর রহমানের (৫৪) বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার নাটাই (দক্ষিণ) ইউনিয়নের কালিসীমা এলাকায়। শুক্রবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাশের সরাইল উপজেলার কালীকচ্ছ ইউনিয়নের দত্তপাড়ার (কলেজপাড়া) বিরেশ দিঘিতে এ মাছ ধরা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ২৬ হাজার টাকা টিকিট কেটে মোট ৩৬ জন প্রতিযোগী অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ৬ লাখ ২০ হাজার টাকার সাতটি পুরস্কার ছিল। বাকি টাকা আয়োজকেরা নিয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিরেশ দিঘিতে বড়শি দিয়ে মাছ ধরছেন শৌখিন মৎস্যশিকারিরা। দিঘির চারপাশে ৩৬টি আসনে বসে তাঁরা মাছ ধরছেন। লটারির মাধ্যমে তাঁদের আসন নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। কেউ মাছের খাবার প্রস্তুত করছেন, কেউ বড়শি ফেলছেন। হঠাৎ হঠাৎ মাচা থেকে জোরেশোরে আওয়াজ উঠছে। ‘বড় মাছ, বড় মাছ’ বলে হইহুল্লোড় করছেন কেউ কেউ।
প্রতিযোগিতায় একজন শিকারিকে মাছ ধরতে গিয়ে টিকিট ছাড়া আনুষঙ্গিক আরও ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ করতে হয়। আসনের মালিকদের অনেকে ভাড়া করে শিকারি নিয়ে আসেন। ভাড়াটিয়া শিকারিকে দিতে হয় দুই থেকে তিন হাজার টাকা। আবার পুরস্কার পেলে ভাড়াটিয়াকে ১০ শতাংশ টাকা দেওয়া লাগে। এসব শিকারি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ ও হবিগঞ্জ থেকে এসেছেন।
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার মনতলা এলাকার তোফাজ্জল হোসেন ৭ কেজি ৯৭০ গ্রাম ওজনের কাতলা মাছ ধরে দ্বিতীয় হয়েছেন। পুরস্কার হিসেবে তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। সময় শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে তিনি মাছটি ধরে সারা দিনের হিসাব বদলে দেন। অন্যদিকে সরাইলের সৈয়দটুলা গ্রামের সুজন মিয়া ৬ কেজি ৫৫৫ গ্রাম ওজনের কাতলা ধরে তৃতীয় হয়েছেন। পুরস্কার পেয়েছেন ৭৫ হাজার টাকা।
কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার ইলিয়াস হোসেন ৬ কেজি ৪০০ গ্রাম ওজনের কাতলা মাছ শিকার করে চতুর্থ হয়েছেন। তিনি ৫০ হাজার টাকা পেয়েছেন। এ ছাড়া পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম পুরস্কার দেওয়া হয়েছে যথাক্রমে ৪৫, ৪০ ও ৩৫ হাজার টাকা করে। দিনভর প্রচণ্ড গরম আর রোদবৃষ্টি উপেক্ষা করে শিকারিরা মাছ ধরেন।
পৌনে তিন একর দিঘিটির মালিক সরাইলের কালীকচ্ছ ইউনিয়নের দত্তপাড়া (কলেজপাড়া) গ্রামের প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলীর পরিবার। ওই পরিবারের কাছ থেকে দিঘিটি সরাইল মৎস্য চাষ প্রকল্প নামের একটি সমিতি ৮০ লাখ টাকায় বন্ধক নিয়েছে। তারা প্রতিবছর এখানে কয়েকবার মাছ ধরা প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। প্রতিযোগিতা দেখতে দিঘির চারপাশে অনেক মানুষের সমাগম ঘটে।
সরাইল মৎস্য চাষ প্রকল্পের সভাপতি আলী হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিবছর এ ধরনের আয়োজন করা হয়। এটি চলতি বছরের প্রথম আয়োজন। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শৌখিন মৎস্যশিকারিরা এখানে অংশ নেন।
প্রথম পুরস্কার পাওয়া মজিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আজ একটি কাতলা ধরে প্রথম পুরস্কার পেয়েছি। ভালোই লাগছে। তবে আমি ১৫ বছর ধরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে আসছি। কোনো কোনো স্থানে ১০ থেকে ১২টি কাতলা ধরেও কোনো পুরস্কার পাইনি। আজ এক কাতলায় বাজিমাত করেছি।’