ভোরের আলো তখনো ভালো করে ফোটেনি। শহরের সড়কে হালকা অন্ধকার। দু-একটি যানবাহন আলো জ্বেলে ছুটে যাচ্ছে। এর মধ্যেই শহরের বিভিন্ন দিক থেকে ছুটে আসছেন নানা বয়সী নারী-পুরুষ। কেউ তরুণ, কেউ বয়স্ক, সঙ্গে শিশু-কিশোরও। সবার গন্তব্য মৌলভীবাজার শহরের এম সাইফুর রহমান মিলনায়তন। তবে সেটিই তাঁদের শেষ গন্তব্য নয়—সেখান থেকেই শুরু হবে দৌড়।
আজ শুক্রবার ভোর পাঁচটার দিকে মিলনায়তন প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, আলোকসজ্জা আর মানুষের কোলাহলে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগের রাতেই অনেকে এসে পৌঁছেছেন। স্থানীয় অংশগ্রহণকারীরাও ভোরের অন্ধকার কাটার আগেই জড়ো হয়েছেন।
মৌলভীবাজার পাওয়ার পালস এরিনা ও মৌলভীবাজার অ্যাথলেটিকস অ্যান্ড কাবাডি একাডেমির আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় ‘কেন্ট এলিট স্পোর্টিং সোসাইটি মৌলভীবাজার ১৫ কিলোমিটার রান-২০২৬’। এতে ১৫ ও ১০ কিলোমিটার দূরত্বের দুটি বিভাগ রাখা হয়। দুই বিভাগে চার শতাধিক মানুষ নিবন্ধন করেন।
ভোর সাড়ে পাঁচটায় জাতীয় সংগীতের পর মাইকে দৌড় শুরুর ঘোষণা আসে। দল বেঁধে দৌড়াতে শুরু করেন অংশগ্রহণকারীরা। শহরের কোর্ট রোড ও বেজবাড়ি সড়ক পেরিয়ে তাঁরা এগিয়ে যান বর্ষিজোড়ার পাহাড়ি টিলার পথে।
সড়কে তখনো সকালবেলার ঘুম ঘুম ছায়া। দুই পাশে গাছপালা, টিলায় টিলায় সবুজ। কালেঙ্গা সড়ক ধরে দৌড়বিদদের সারি চলে যায় কালেঙ্গা বাজার পেরিয়ে দেওরাছড়া চা-বাগানের কাছাকাছি নির্ধারিত ঘুরে আসার স্থানের দিকে। শুরুতে সবাই একসঙ্গে দৌড়ালেও পথ যত এগোয়, দলটি তত ছড়িয়ে পড়ে। কেউ একা, কেউ দু-তিনজনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দৌড়াতে থাকেন। অনেকের কাছে এই সমবেত দৌড়ে অংশ নেওয়াই আনন্দের।
দৌড়ে অংশ নেওয়া আবু সাঈদ মো. রাহী বলেন, ‘আমি প্রতিদিন রান করি নিজেকে সুস্থ রাখার জন্য। প্রকৃতির মধ্যে দৌড়ালে মনটা ভালো থাকে।’
মাজহারুল ইসলামের কাছে এই আয়োজন ছিল প্রকৃতির মাঝে দৌড়ানোর সুযোগ। তিনি বলেন, ‘স্নিগ্ধ সকাল। প্রকৃতির মধ্যে দৌড়ালাম। আমার অনেক ভালো লাগছে। এ রকম ইভেন্ট তরুণদের মাদকাসক্তি থেকে দূরে রাখবে।’
দৌড়ের পথে বিভিন্ন স্থানে স্বেচ্ছাসেবকেরা পানি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ক্লান্ত ও ঘামঝরানো দৌড়বিদদের হাতে তাঁরা তুলে দেন পানির কাপ। কেউ আবার পথ দেখিয়ে দেন। তখনো সড়কে যানবাহনের চাপ তেমন বাড়েনি। দৌড়বিদদের দেখে দু-একজন পথচারী থেমে দাঁড়ান, তাঁদের পথ ছেড়ে দেন।
কুমিল্লা থেকে আসা কামাল হোসেনের ভাষ্য, ‘আমি বিভিন্ন জায়গায় দৌড়াতে যাই। এখানে পাহাড়-টিলা, মনোমুগ্ধকর পরিবেশে দৌড়ালাম। খুবই ভালো লেগেছে।’
এমন আয়োজন প্রশংসনীয় উল্লেখ করে ঢাকা থেকে আসা প্রিয়াংকা রায় বলেন, ‘আমাদের প্রশান্তির জায়গা কমে গেছে। এসব আয়োজন মনের প্রশান্তি বাড়াবে।’
দৌড় শেষে অংশগ্রহণকারীরা আবার সাইফুর রহমান মিলনায়তন প্রাঙ্গণে ফিরতে থাকেন। কেউ চেয়ারে, কেউ ঘাসে বসে বিশ্রাম নেন। কেউ পানি ও চা পান করেন। কেউ আবার নির্ধারিত স্থানে সেলফি তোলেন। পরে আয়োজকেরা তাঁদের হাতে সকালের নাশতা তুলে দেন। অংশগ্রহণকারীদের গলায় পরিয়ে দেওয়া হয় মেডেল।
এমন আয়োজনের উদ্দেশ্য জানিয়ে দৌড়ের অন্যতম আয়োজক ছায়েম রহমান প্রথম আলোকে বলেন, শরীর ভালো থাকলে মনও ভালো থাকে। এ ধরনের আয়োজন হলে মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়বে, নিয়মিত দৌড়ানোর অভ্যাস তৈরি হবে। এই লক্ষ্য থেকেই ১৫ কিলোমিটার দৌড়ের আয়োজন করা হয়েছে।
দৌড় আয়োজনের অন্যতম সংগঠক মো. ফয়জুল হক বলেন, ‘আমাদের আয়োজন সফল হয়েছে। রানাররা সুন্দরভাবে দৌড় সম্পন্ন করেছেন। সবাই ব্যবস্থাপনা ও দৌড়ের পথের প্রশংসা করেছেন।’
শেষ অংশগ্রহণকারী ফিরে আসার পর পুরস্কার বিতরণ করা হয়। বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন আয়োজকেরা। সকালের রোদ তখন আরও উজ্জ্বল। পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দৌড়ের আসর। যে যার গন্তব্যে ফিরতে শুরু করেন। পেছনে পড়ে থাকে টিলার সবুজ পথে কয়েক শ মানুষের সেই সকালের ছুটে চলার স্মৃতি।