লাইনে মোটরসাইকেল রাখার বিনিময়ে ৫০ টাকা করে আদায় করছিলেন ঈসা নামের এই ব্যক্তি। শুক্রবার রাতে রাজশাহী নগরের সাগরপাড়া এলাকার আফরিন ফিলিং স্টেশনে
লাইনে মোটরসাইকেল রাখার বিনিময়ে ৫০ টাকা করে আদায় করছিলেন ঈসা নামের এই ব্যক্তি। শুক্রবার রাতে রাজশাহী নগরের সাগরপাড়া এলাকার আফরিন ফিলিং স্টেশনে

রাজশাহীতে তেলের লাইনে ‘সিরিয়াল–বাণিজ্যের’ অভিযোগ, মোটরসাইকেলপ্রতি নেওয়া হচ্ছে ৫০ টাকা

রাজশাহী নগরের সাগরপাড়া এলাকায় একটি পেট্রলপাম্পে তেলের লাইনে তদারকের বিনিময়ে গ্রাহকপ্রতি ৫০ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী মিলে এই লাইনের তদারক করছেন। তাঁরা বলছেন, রাত জেগে গাড়ি পাহারা দেওয়ায় এই টাকা নেওয়া হচ্ছে। তবে এ জন্য দেওয়া হচ্ছে না কোনো টোকেন।

গতকাল শুক্রবার রাত থেকে সরেজমিনে দেখা যায়, আফরিন ফিলিং স্টেশনের সামনে দীর্ঘ সারিতে মোটরসাইকেল রাখা হয়েছে। অনেকেই রাতে ৫০ টাকার বিনিময়ে গাড়ি লাইনে রেখে সকালে এসে আবার দাঁড়াচ্ছেন।

অভিযোগ আছে, পাঁচজনের একটি দল এই লাইনের সমন্বয় করছেন। তাঁদের একজন ঈসা নামে পরিচিত। তিনি খাতায় মোটরসাইকেলের মালিকের নাম ও ফোন নম্বর লিখে রাখছেন। বিনিময়ে নেওয়া হচ্ছে ৫০ টাকা। তবে এর জন্য কোনো টোকেন দেওয়া হচ্ছে না। রাতে ৫০ টাকা ছাড়া কাউকে এই লাইনে দাঁড়াতে দেওয়া হয়নি।

ঈসার দাবি, মোটরসাইকেলের ঘাড়ে তালা দিয়ে তাঁর হাতে ৫০ টাকা দেন চালকেরা। যাতে কারও মোটরসাইকেলের কোনো ক্ষতি না হয়, তাই সারা রাত তাঁরা পাহারায় থাকবেন। তাঁরা এমনভাবে ছড়িয়ে থাকেন, কেউ এখান থেকে কোনো মোটরসাইকেলে বের করে নিতে পারবেন না। তিনি গ্রাহকদের সকাল ৭টার মধ্যে মোটরসাইকেলের কাছে এসে লাইনে দাঁড়াতে বলে দেন।

এভাবেই দড়ি দিয়ে পেঁচিয়ে রাখা হয়েছিল মোটরসাইকেলগুলো। প্রতিটির তদারকের জন্য নেওয়া হয় ৫০ টাকা

এদিকে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা সাধারণ মানুষ তেল না পেয়ে খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে চড়া দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। এক লিটার তেল ২৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

জেলা প্রশাসন আগে জোড়-বিজোড় নম্বর অনুযায়ী তেল দেওয়ার নিয়ম চালু করলেও তা মানা হচ্ছে না। উল্টো লাইনে অপেক্ষমাণদের পাশ কাটিয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অন্য দিক দিয়ে এসে তেল নিয়ে যাচ্ছেন—এমন অভিযোগও আছে।

আজ শুক্রবার রাত ১০টার দিকে দেখা যায়, পাম্পটির সামনে বাঁশ দিয়ে তৈরি করা অস্থায়ী ঘেরের ভেতরে সারি করে মোটরসাইকেল রাখা হয়েছে। কিছু মোটরসাইকেল কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে, কিছু খোলা। বিভিন্ন অংশে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে মোটরসাইকেলগুলো। প্রতিটি অংশ আলাদা ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে আছে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লাইনের দৈর্ঘ্যও বাড়তে থাকে, যা সাগরপাড়া বিদ্যুৎ অফিস পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

লাইন ছাড়া তেল নিতে আসা গাড়িগুলোর তদারক করছেন বিএনপির স্থানীয় নেতা। আজ শনিবার সকালে

রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী রেজওয়ান আহমেদ বলেন, গতকাল রাত ৯টায় মোটরসাইকেল রেখে যান তিনি। সকালে এসে দেখেন, ১২ ঘণ্টায় তাঁর মোটরসাইকেল মাত্র দুই হাত এগিয়েছে। একই অভিজ্ঞতার কথা জানান ঢাকায় পড়াশোনা করা ইমতিয়াজ হাফিজ।

ধীর গতির কারণ দেখতে পাম্পটির সামনে গিয়ে দেখা যায়, লাইন বাদ দিয়ে উল্টো দিক গাড়ি ঢুকিয়ে ইচ্ছামতো তেল নেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি তদারক করছিলেন বোয়ালিয়া থানা (পশ্চিম) বিএনপির সভাপতি শামসুল আলম। কেউ আপত্তি তুললে তিনি নিজের সাংগঠনিক পরিচয় জানিয়ে কথা বলছেন। ছবি তুলতে গেলে ছবি না তোলার জন্য অনুরোধ করছেন। তিনি দাবি করেন, তেল বিক্রিতে অনিয়ম ঠেকাতে কাজ করছেন।

পদ্মা নদীর ওপার থেকে আসা মোটরসাইকেলের কয়েকজন চালক জানান, নৌকায় মোটরসাইকেল পারাপারে প্রায় ৬০০ টাকা খরচ হয়। তাই অনেকে মোটরসাইকেলের ট্যাংক খুলে নিয়ে এসেছেন তেল নিতে। তবে পাম্প কর্তৃপক্ষ তাঁদের তেল দিচ্ছে না।

পেট্রলপাম্পটির ব্যবস্থাপক সোলাইমান কবির বলেন, লাইনে মোটরসাইকেল রাখতে টাকা নেওয়ার বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

পদ্মার চরের চালকেরা তেল নেওয়ার জন্য মোটরসাইকেলের ট্যাংক খুলে এনেছেন

সোলাইমান কবির আরও বলেন, আগে জোড়-বিজোড় নম্বর অনুযায়ী তেল দেওয়ার নিয়ম ছিল, এখন তা কার্যকর নেই। সম্প্রতি একটি অ্যাপস চালুর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যেখানে গাড়ির নম্বর নিবন্ধন করে তেল দিতে হবে এবং ৭২ ঘণ্টার মধ্যে একই গাড়ি আর তেল নিতে পারবে না। তবে অন্য পাম্পগুলোতে এই ব্যবস্থা কার্যকর না হওয়ায় তাঁরা বিড়ম্বনায় পড়ছেন।

আফরিন ফিলিং স্টেশনের তদারক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী আজমল হুদাকে। যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, অফিসে তিনি ছাড়া তার সেকশনে আর দ্বিতীয় কোনো লোক নেই। এ জন্য তিনি পাম্পে যাননি। পাম্পে কী হচ্ছে, তা জানেন না। বিষয়টি তিনি কর্তৃপক্ষকে ইতিমধ্যে জানিয়েছেন।