
‘কৈলাসে ভোলা কাঁদে একেলা, ছিঁড়ে গেছে গাঁথা মালা...।’ সড়কের পাশে বসে বাঁশের চিকন শলা দিয়ে ঝুড়ি বুনতে বুনতে গুনগুন করে এমন গান গাইছিলেন বিশ্বনাথ দাস। কাছে যেতেই গান থামিয়ে কৌতূহলী চোখে তাকালেন। একগাল হেসে তিনি বললেন, ‘বাপ-দাদার আমল থেইক্যা এই কাম কইরা আসতেছি। বয়সও তো পঁয়ষট্টির ওপর গেছে। আমাগের ব্যবসা এইটাই।’
২ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার কোড়া পাকড়াতলা গ্রামের সড়কের পাশে দেখা যায়, বিশ্বনাথের মতো আরও কয়েকজনকে। কেউ দা-ছুরি দিয়ে বাঁশ চিরছেন, কেউ পণ্যের ধরন অনুযায়ী চিকন শলা তৈরি করছেন। কেউ আবার সেই শলা দিয়ে বানাচ্ছেন ঝুড়ি, ডালা, কুলা কিংবা অন্য কোনো পণ্য।
বিশ্বনাথ যে ঝুড়িটি বানাচ্ছিলেন, সেটি বিক্রি হবে ১৫০ টাকায়। এতে খরচ পড়ে ৭০ থেকে ৮০ টাকা। সকাল থেকে বেলা একটা পর্যন্ত তিনি দুটি ঝুড়ি বানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, লাভ খুব বেশি না। কাজ না করলে সংসার চলবে না, তাই করে যাচ্ছেন।
চিরানো বাঁশের অংশ মাটিতে সাজিয়ে তার ওপর বসে ঝুড়ির নিচের অংশ বুনছিলেন ললিতা দাস। তিনি বলেন, ‘আমি ঝুড়ির নিচের দিকের জো (শুরুর অংশ) তুলে দিই। এরপর শলা দিয়ে ওপরের অংশ আমার স্বামী বোনেন।’
বাঁশ-বেতের কুটির–শিল্পের সঙ্গে জেলার বহু মানুষ জড়িত। কারিগরদের প্রশিক্ষণের সুযোগ ও ঋণের ব্যবস্থা রয়েছে।পীযূষ ঘোষ, প্রমোশন কর্মকর্তা, বিসিক, সাতক্ষীরা জেলা
বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে এসে বাঁশের কাজ শিখেছেন ললিতা। প্রতিদিন দুটি ঝুড়ি বা ডালির জো তুলে দেওয়ার পর তাঁকে রান্নাবান্না ও ঘরের কাজ করতে হয়। তাঁর স্বামী পঞ্চানন দাস সারা দিন বাঁশের কাজ করেন। তৈরি পণ্য বিক্রির আয়েই চলে তাঁদের সংসার।
কোড়া পাকড়াতলা সর্বজনীন কালীমন্দিরের সামনে বাঁশের কাজ করছিলেন অরবিন্দ দাস। বাঁশ দিয়ে কাঁকড়ার আটন, ঢাকনা, চিংড়ি ধরার খলুই, মাটি কাটার ঝুড়ি, কাবরা, কুলাসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি করেন। এই গ্রামে তাঁর মতো কাজ করেন এমন ৫০ জন আছেন। পাশে বসা স্বপন দাস ছোটবেলা থেকেই বাঁশের কাজ করেন। তাঁর ভাষ্য, একটি বাঁশ কিনতেই ১৫০ থেকে ২০০ টাকা লাগে। বিনা সুদে ঋণ ও সরকারি সহায়তা পেলে কাজটি ধরে রাখা সহজ হতো।
দেবহাটা উপজেলা পরিষদের সামনের সড়কে বাঁশের তৈরি পণ্য বিক্রি করছিলেন ষাটোর্ধ্ব রবিন দাস। ভ্যানগাড়িতে সাজানো ঝুড়ি, টাবরা, কুলা, ডালা, টোকা, ধামা-পালিসহ নানা পণ্যের নাম বললেন তিনি। প্রায় ২৫ বছর ধরে এ ব্যবসা করছেন তিনি। কিছু পণ্য নিজে তৈরি করেন, বাকিগুলো আশপাশের গ্রামের কারিগরদের কাছ থেকে কিনে আনেন। রবিন দাস বলেন, প্রতিটি টাবরা ২০০ টাকায় বিক্রি করেন, কিনতে হয় ১৮০ টাকায়। এই পণ্য বিক্রি করেই তাঁর সংসার চলে।
দেবহাটার পাশাপাশি জেলার কালীগঞ্জ ও তালা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামেও এখনো বাঁশের তৈরি পণ্য বানানো হয়। চাটাই, কুলা, ডালা, চাঙারি, টুকরি, চালুনি, মাছ রাখার খলুই, ঝুড়ি, হাঁস-মুরগির খাঁচাসহ নানা পণ্য তৈরির কথা জানালেন কারিগরেরা। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও এ কাজে যুক্ত। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি বাড়ি বাড়ি ফেরি করেও বিক্রি হয় এসব পণ্য।
কারিগরেরা জানান, তাঁরা পূর্বপুরুষের পেশা ধরে রেখেছেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে বাঁশ সংগ্রহ করে দা-ছুরি দিয়ে চিরে পণ্যের ধরন অনুযায়ী চিকন শলা তৈরি করেন। পরে রোদে শুকিয়ে সেই শলা দিয়ে তৈরি করা হয় নানা পণ্য।
একসময় গ্রামগঞ্জে বাঁশের তৈরি পণ্যের ব্যাপক কদর ছিল। গৃহস্থালির নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা কাজে এসব পণ্য ব্যবহার করা হতো। এখন প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের পণ্যের দাপটে বাঁশের পণ্যের চাহিদা কমেছে। একই সঙ্গে বাঁশও আগের মতো সহজলভ্য নয়। ফলে কাঁচামালের দাম বেড়েছে, কিন্তু পণ্যের দাম সে অনুযায়ী বাড়েনি। কালীগঞ্জের কারিগর মো. হোসেন আলী বলেন, বাপ-দাদার পেশা, তাই আঁকড়ে ধরে আছেন। ছেলেমেয়েরা এখন আর এই পেশায় কাজ করতে চায় না। পরিশ্রম বেশি, লাভ কম। আগের মতো চাহিদাও নেই।
সাতক্ষীরা জেলার বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) প্রমোশন কর্মকর্তা পীযূষ ঘোষ প্রথম আলোকে বলেন, বাঁশ-বেতের কুটির–শিল্পের সঙ্গে জেলার বহু মানুষ জড়িত। কারিগরদের প্রশিক্ষণের সুযোগ ও ঋণের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে ঋণ পেতে সরকারি চাকরিজীবীকে গ্যারান্টর (জিম্মিদার) দেওয়ার শর্ত থাকায় অনেক কারিগর তা নিতে পারেন না। ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প টিকিয়ে রাখতে ‘একটি পণ্য, একটি গ্রাম’ প্রকল্পের আওতায় কাজ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।