
কুষ্টিয়ার ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল হঠাৎ পরিদর্শন করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। এ সময় হাসপাতালে কিছু অব্যবস্থাপনা ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এ ছাড়া তিনি কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও পরিদর্শনে যান।
আজ বুধবার সকাল ১০টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত জেলার দুটি বড় হাসপাতালে তিন ঘণ্টা অবস্থান করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। জেনারেল হাসপাতালে দুই ঘণ্টা থেকে সেখানে বিভিন্ন ওয়ার্ড, রান্নাঘর ও রোগীর সেবা বিষয়ে খোঁজখবর নেন। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি এক ঘণ্টা অবস্থান করেন।
সড়কপথে সকাল ছয়টার দিকে ঢাকা থেকে সরাসরি কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে ঢোকেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। দুপুর ১২টা পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করার পর কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান। সেখানে এক ঘণ্টা অবস্থানের পর বেলা ১টার দিকে সড়কপথে ঢাকায় ফেরার উদ্দেশে তিনি রওনা দেন। দুটি হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পরিদর্শনের বিষয়ে প্রশাসন থেকে চিকিৎসা কর্মকর্তারা কেউ-ই অবগত ছিলেন না।
সরেজমিন দেখা যায়, ঠিক সকাল ১০টায় মন্ত্রী গাড়ি থেকে নেমে সরাসরি জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের কক্ষে যান। তিনি হাসপাতালে উপস্থিত চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তাদের ডিজিটাল হাজিরা ও রেজিস্ট্রার খাতার হাজিরার তথ্য জানতে চান। এসব তথ্য থেকে কয়েকজন চিকিৎসক ও নার্সদের অনুপস্থিতি দেখতে পেয়ে সে বিষয়ে জানতে চান। কেউ কেউ মৌখিক ছুটি নিয়েছেন জানালে মন্ত্রী তত্ত্বাবধায়ককে বলেন, ‘মৌখিক ছুটি নেওয়ার কোনো বিধান নাই।’
পরিদর্শনকালে মন্ত্রী মেডিসিন (পুরুষ) ওয়ার্ডে রোগীদের সঙ্গে কথা বলে চিকিৎসাসেবার মান সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। রোগীদের বিছানার কাভার উঁচু করে সেখানে ছারপোকা আছে কি না, তা নিজে দেখেন। পাশে মেডিসিন (নারী) ওয়ার্ডে গিয়ে সরাসরি রোগীদের ব্যবহৃত ওয়াশরুম পরিদর্শন করতে গিয়ে দেখতে পান, সেখানে এক নারী পরিচ্ছন্নতাকর্মী পরিষ্কারের কাজ করছেন। এ সময় মন্ত্রী তাঁকে বলতে থাকেন, ‘এই রাখো আমারে দেইখা শুরু করলা পরিষ্কার, রাখো।’
এ ছাড়া রান্নাঘরে গিয়ে রোগীদের জন্য প্রস্তুত হতে থাকা খাবারের বিষয়ে খোঁজখবর নেন মন্ত্রী। রান্নাঘর অপরিচ্ছন্ন দেখে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
কুকুর–বিড়ালে কামড় দেওয়া রোগীদের টিকা দেওয়ার স্থানে গিয়ে রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। পর্যাপ্ত পরিমাণ টিকা আছে এবং বিনা মূল্যে এসব টিকা দেওয়া হয় জানিয়ে উপস্থিত রোগীদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘কেউ টাকা চাইলে জানাবেন।’
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, এখানে আসা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সারা দেশের জেলা হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো পর্যায়ক্রমে পরিদর্শন করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘গত ১৭ বছরে হাসপাতালের উন্নয়নে কোনো কাজ হয়নি। কাজ করলে জবাবদিহি আছে, এটা মানুষ ভুলে গিয়েছিল। জনগণের কাছে দায়বদ্ধতার অভাব ছিল বলেই স্বাস্থ্য খাতে নানা সমস্যা তৈরি হয়েছে। যারা ক্ষমতায় ছিল, তারা রাতের অন্ধকারে ভোট নিয়েছে। তাদের ভোটের দরকার পড়ে নাই, জনগণের কাছে যাওয়ার দরকার পড়ে নাই। এ জন্য তারা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ ছিল না।’
জেনারেল হাসপাতালের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘বিচ্ছিন্নভাবে ময়লা পেয়েছি, বাথরুম আমি আসার পর পরিষ্কার করেছে। তাও তো করেছে। বিছানাগুলো দেখলাম, ছারপোকা পাইনি। আগে কী ছিল জানি না। জনগণের চাপ ও চিকিৎসকের সংখ্যা হিসাবে ভালো পেয়েছি। চিকিৎসক ও নার্স উপস্থিতি ভালো। কয়েকজন দেরিতে ছিল, তাদের সতর্ক করা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টার ভেতর হাসপাতালের নালা পরিষ্কারের কথা বলা হয়েছে।’
কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘দৃঢ়তার সঙ্গে বলছি, প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে এসে আগামী তিন মাসের ভেতর কুষ্টিয়া মেডিকেল (মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল) চালু করব। যত যন্ত্রপাতি আছে চালু করব, ফার্নিচার কেনা হচ্ছে, দরপত্র হয়ে গেছে। লোকবল দেওয়া হবে। এটা চালু হলে জেনারেল হাসপাতালের ওপর চাপ কমবে।’
মন্ত্রী জানান, প্রতি হাসপাতালে আধুনিক মানের তিন থেকে পাঁচটা অ্যাম্বুলেন্স থাকবে। চারটা হেলিকপ্টার আনা হচ্ছে, মুমূর্ষু রোগীদের ঢাকাসহ কাছের হাসপাতালে যাতে দ্রুত নেওয়া যায়। চিকিৎসকের সংখ্যা জনগণের চেয়ে কম। বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে ৫ হাজার নতুন চিকিৎসক নিয়োগ হবে। জুলাই থেকে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দিতে যাচ্ছি, যার মধ্যে ৮০ শতাংশ থাকবেন নারী।
আর্থিক লুটপাটের জন্য বিগত সরকারের সময় অনেক হাসপাতালে যেখানে যন্ত্রপাতি দরকার নেই, সেখানে কিনে ফেলে রেখেছে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সেগুলোতে জং ধরেছে, ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়েছে। টাকা খেয়েছে। জনবল নাই, কিনে ফেলে রেখেছে। আমাদের আমলে এটা হবে না। আমরা ভালো যন্ত্র দিব, জনবল দিব, রক্ষণাবেক্ষণ করব।’
এ সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন-হাসান, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন, সিভিল সার্জন শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন প্রমুখ।