স্ত্রী–সন্তানদের সঙ্গে পানিতে ডুবে মারা যাওয়া বাছির উদ্দিন। পরিবারের সঙ্গে তাঁর এই ছবি এখন শুধুই স্মৃতি
স্ত্রী–সন্তানদের সঙ্গে পানিতে ডুবে মারা যাওয়া বাছির উদ্দিন। পরিবারের সঙ্গে তাঁর এই ছবি এখন শুধুই স্মৃতি

পানিতে ঝাঁপ দিয়ে মেয়েকে বাঁচাতে পারলেও মারা গেলেন বাবা

চোখের সামনে হাওরের পানিতে তলিয়ে যাচ্ছিল আদরের সন্তান। সঙ্গে সঙ্গেই পানিতে ঝাঁপ দিলেন বাবা। প্রাণপণ চেষ্টায় মেয়েকে বাঁচাতে সক্ষম হলেও নিজে বেঁচে ফেরেননি। গতকাল শুক্রবার এমনই এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে। মেয়েকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন মো. বাছির উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি। এদিন জেলায় পানিতে ডুবে মারা যাওয়া আরও চার শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

প্রতিবেশী ও স্বজনদের বরাতে জানা যায়, গতকাল বিকেলে করিমগঞ্জের বালিখলা হাওরের পাশে মিঠামইন উপজেলার হাসানপুর সেতু–সংলগ্ন এলাকায় পরিবার নিয়ে সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়েছিলেন বাছির উদ্দিন। একপর্যায়ে করিমগঞ্জ উপজেলার শেষ সীমান্তে মিঠামইন উপজেলা হাসানপুর সেতু এলাকায় একটি ডুবুডুবু সড়কে নৌকা থেকে তাঁরা নামেন গোসল করতে। এ সময় হঠাৎ পা পিছলে গভীর পানিতে পড়ে যায় তাঁর আট বছর বয়সী মেজ মেয়ে শেমন্ত্রী আক্তার। কোনো দ্বিধা না করে মেয়েকে বাঁচতে পানিতে ঝাঁপ দেন বাবা বাছির।

পানিতে ডুবে মারা যাওয়া বাছির উদ্দিন

প্রাণপণ চেষ্টায় মেয়েকে সড়কে অন্যের হাতে নিরাপদে তুলে দিতে সক্ষম হলেও তীব্র স্রোতের কারণে উঠতে পারেননি বাছির। মুহূর্তের মধ্যে তিনি পানির নিচে তলিয়ে যান। পরে স্থানীয় বাসিন্দাদের চেষ্টায় কিছুক্ষণ পর তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

মারা যাওয়া বাছির উদ্দিন কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার গাইটাল পেট্রোলপাম্প এলাকার আবু বাক্কার মাস্টারের ছেলে। তিনি পেশায় ফিজিওথেরাপিস্ট ছিলেন। করিমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোহেব খান বলেন, মেয়েকে উদ্ধার করতে গিয়ে বাছির উদ্দিন পানিতে তলিয়ে মারা গেছেন। পরে স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এ ছাড়া গতকাল এক দিনেই কিশোরগঞ্জের নিকলী, মিঠামইন, কটিয়াদী এবং ভৈরবের আরও চারটি স্থানে পানিতে ডুবে মারা যাওয়া আরও চার শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

মারা যাওয়া শিশুরা হলো নিকলী উপজেলার কারপাশা ইউনিয়নের নানশ্রী গ্রামের নজরুল ইসলামের ছেলে মোহাম্মদ হাকিম (৫); গাজীপুরের টঙ্গী এলাকার এরশাদ নগরের বাসিন্দা আলমগীর হোসেনের ছেলে মাদ্রাসাছাত্র আরিফ হোসেন (১২), কটিয়াদী উপজেলার লোহাজুরি ইউনিয়নের দক্ষিণ লোহাজুরি গ্রামের মজনু মিয়ার ছেলে নাঈম মিয়া (১১) ও ভৈরব উপজেলার জগন্নাথপুর মধ্যপাড়া এলাকার মো. সোহেল মিয়ার ছেলে শুভ ইসলাম (১২)।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সকাল আটটার দিকে নিকলী উপজেলার নানশ্রী গ্রামে বাড়ির পাশে বড় ভাই ও আরও কয়েকজন শিশুর সঙ্গে খেলছিল হাকিম। খেলার সময় অসাবধানতাবশত বাড়ির পাশের পুকুরে পড়ে যায় সে। কিছুক্ষণ পর বড় ভাই বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের জানালে তারা দ্রুত পুকুর থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করে নিকলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নিকলী থানার ওসি মো. মাহবুবুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

একই দিন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গাজীপুরের টঙ্গী এরশাদ নগরের বাইতুল কোরআন কওমি মাদ্রাসার এক শিক্ষক প্রায় ৪০ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে মিঠামইনের হাওর এলাকায় ঘুরতে আসেন। হাওর ভ্রমণ শেষে ইসলামপুর ঘাট এলাকায় সবাই একসঙ্গে গোসল করতে নামলে পানির তীব্র স্রোতে ভেসে যায় মাদ্রাসাছাত্র আরিফ হোসেন। দুপুরের দিকে ঘটনাস্থলের কাছ থেকেই তার মরদেহ উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছেন মিঠামইন থানার উপপরিদর্শক (এসআই) তাইজুল ইসলাম।

গতকাল বেলা দুইটার দিকে কটিয়াদী উপজেলার দক্ষিণ লোহাজুরি গ্রামের নাঈম মিয়া কয়েকজন সহপাঠীর সঙ্গে গ্রামে বিলের পানিতে গোসল করতে যায়। সাঁতার না জানায় সে একটি প্লাস্টিকের বোতল ধরে সাঁতার কাটছিল। গোসল শেষে অন্যদের সঙ্গে বাড়ির পথে রওনা দিলেও কিছু দূর গিয়ে তার মনে পড়ে, বোতলটি বিলে ফেলে এসেছে। পরে একাই বোতলটি আনতে ফিরে যায়। এ সময় পা পিছলে গভীর পানিতে পড়ে ডুবে যায় সে। পরে স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতায় তাকে উদ্ধার করে কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন কটিয়াদী মডেল থানার ওসি মো. রফিকুল ইসলাম।

ভৈরব উপজেলার জগন্নাথপুর মধ্যপাড়া এলাকার বাসিন্দা শুভ ইসলাম গত বৃহস্পতিবার বাড়ি থেকে গোসল করতে বের হয়ে নিখোঁজ হয়। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পাননি। গতকাল সকালে তার বাবা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরে বিকেলের দিকে জগন্নাথপুর এলাকার নদীতে তার মরদেহ ভেসে উঠতে দেখে স্থানীয় বাসিন্দারা পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। ভৈরব থানার তদন্ত কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত ওসি) লিমন বোস জানান, এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।