
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রাম। লালমাই পাহাড়ঘেরা নিরিবিলি এই গ্রামের বাসিন্দাদের আলোচনার কেন্দ্রে এখন ১৯ বছর বয়সী এক তরুণ—সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন। দ্রুতগতিতে মোটরসাইকেল চালানো, রাত-বিরাতে বাইরে থাকা ও বেপরোয়া চলাফেরার কারণে স্থানীয় লোকজনের কাছে তুহিনের পরিচিতি ছিল ‘উচ্ছৃঙ্খল’ তরুণ হিসেবে। ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে হত্যার ঘটনায় এই তুহিনকে মূলহোতা হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সানন্দা গ্রামের মৈশান বাড়ির নুরে আলমের চার ছেলের মধ্যে তুহিন সবার বড়। তাঁর বাবা মুরগির খামারের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। বিভিন্ন স্থানে মুরগি সরবরাহ করেন তিনি। তুহিন কুমিল্লা সিটি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় ২০২৫ সালে পড়াশোনা ছেড়ে দেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার আগ থেকেই তাঁর চলাফেরা নিয়ে পরিবার ও এলাকার মানুষের মধ্যে আলোচনা ছিল। পরে বাবা তাঁকে একটি মোটরসাইকেল কিনে দিলে তাঁর চলাফেরা আরও বেপরোয়া হয়ে যায়।
নাম না প্রকাশ করার শর্তে তুহিনদের বাড়ির পাশের এক গৃহবধূ বলেন, ‘তুহিন জোরে জোরে হোন্ডা (মোটরসাইকেল) চালাইত। রাত-বিরেতে বাইরে থাকত। পড়ালেখা ছাইড়া দিয়া ঘুইরা বেড়াইতো। আমরা ভাবছি ছোট মানুষ, হয়তো ঠিক হয়ে যাইব। কিন্তু এই পোলা খুন করতে পারে—এইডা আমরার চিন্তার বাইরে।’
ওই নারী বলেন, তুহিনের বাবা ছেলেদের খুব আদর করতেন। তাই তুহিনের চলাফেরা নিয়ে তাঁরা খুব বেশি কিছু ভাবেননি। অপ্রতিম হত্যার পর পুরো গ্রাম আতঙ্কের মধ্যে আছে বলেও জানান তিনি।
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা (নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে নাম প্রকাশ করা হয়নি) বলেন, ‘নুরের বড় পোলা তুহিন। উঠতি বয়সের পোলাপান। দুই-তিন বছর ধইরা হোন্ডা চালাইত। এই পোলা খুন করব, আমরা কখনো ভাবি নাই। তার বাপে লোক হিসেবে ভালা। পোলাডারে বেশি আদর করত। এর লাইগ্যা হোন্ডা কিনে দিছে। এখন সেই পোলায় যে খুনি হইব—এইডা কে জানত?’
গত শনিবার বেলা একটার দিকে সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁর মাথায় আঘাতের চিহ্ন ছিল। পুলিশের ভাষ্য, এ হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া তিনজনের একজন তুহিন। বাকি দুজনের বয়স ১৫ ও ১৬ বছর। এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডের পর তুহিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে চলাফেরা করা ১৯ বছর বয়সী মো. সিয়ামকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সোমবার দুপুর ১২টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত সানন্দা গ্রামে ঘুরে তুহিন সম্পর্কে বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণি-পেশার ১০ জনের বেশি মানুষের সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর। তাঁদের প্রায় সবার বক্তব্যে তুহিনের বেপরোয়া চলাফেরা ও দ্রুতগতিতে মোটরসাইকেল চালানোর কথা এসেছে।
‘বুঝার বাকি নাই এই ঘটনার লগে আমার পোলা জড়িত’
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুহিনদের বাড়ির দূরত্ব প্রায় আড়াই কিলোমিটার। বাড়ির সামনে গ্রামীণ পাকা সড়ক। টিনশেড ঘরের সামনে বারান্দা। সোমবার দুপুরে সেখানে গিয়ে দরজা ভেতর থেকে তালাবদ্ধ দেখা যায়। ভেতর থেকে মানুষের কথাবার্তার শব্দ পাওয়া গেলেও দীর্ঘক্ষণ ডাকাডাকি করেও কেউ বাইরে আসেননি।
মরদেহ উদ্ধারের দিন রাত আটটার দিকে তুহিনের বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ। তুহিনের মায়ের দেখানো জায়গা থেকে তাঁর খাটের তোশকের নিচে অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোনটি উদ্ধার করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
তুহিনের মা শিরিনা আক্তার রোববার গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, শুক্রবার সন্ধ্যায় তুহিন একটি ব্যাগে করে আইফোনটি এনে তাঁর ছোট ভাইকে লুকিয়ে রাখতে বলেছিল। পরে ফোনটি তুহিনের বিছানার তোশকের নিচে রাখা হয়।
শিরিনা আক্তার বলেন, ‘আমি যেই রকম মা—যে পোলাটা মারা গেছে, তারও তো মা আছে। সন্তান মারা গেলে কষ্টটা কিতা হয়, আমি বুঝি। যেহেতু আমার ঘর থ্যাইকাই ফোনটাও পাওয়া গেছে আর তুহিন ফোনটা আইন্যা তার ছোট ভাইয়ের কাছে দিছে, তাইলে আর বুঝার বাকি নাই এই ঘটনার লগে আমার পোলা জড়িত। এখন আইনে যদি আমার ছেলে অপরাধী হয়, তাইলে আমিও তার বিচার চাই।’
অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে চাকরি করত এক কিশোর
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া দ্বিতীয় ব্যক্তি ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর। তাঁর বাড়ি কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের সালমানপুর এলাকায়। স্থানীয় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী সে। তার বাবা অটোরিকশাচালক। দুই ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে সে সবার বড়।
এই কিশোরের বাবা তাকে ২ সেপ্টেম্বর অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের কাছে নিয়ে যান। কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় ফিরোজ শাহরিয়ারের মোবাইল ফোন যন্ত্রাংশ সরবরাহের প্রতিষ্ঠান ‘ইয়েসটেক’-এ মাসিক ১৪ হাজার টাকা বেতনে কাজ শুরু করে সে।
অপ্রতিমকে চিনত তার বাবার দোকানে চাকরি নেওয়া এই কিশোর। অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর ওই কিশোরকে ফোন করেছিলেন ফিরোজ শাহরিয়ার। তাঁর ভাষ্য, কিশোরটি তখন জানিয়েছিল, অপ্রতিমের ওই দিন তুহিনের সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল, কিন্তু তাঁদের দেখা হয়নি।
অভিযুক্ত এই কিশোরের বাবা বলেন, ‘অপ্রতিমের বাপের মতো মানুষ হয় না। যে স্যার আমার পোলারে চাকরি দিছে, সেই স্যারের পোলারে আবার পোলা কেমনে খুন করবে? আমার ছেলে যদি খুনি হয়ে থাকে, আমিও তার বিচার চাই। আর যদি নিরপরাধ হয়, তাইলে তার মুক্তি চাই।’
স্থানীয় অন্তত ১০ জনের সঙ্গে কথা বলে সাতজনের কাছ থেকে কিশোরটির সম্পর্কে ভালো ধারণার কথা জানা যায়। তবে কয়েকজন তরুণ জানান, প্রায় এক বছর আগে তুহিনের সঙ্গে এই কিশোরের পরিচয় হয়। এরপর তাঁদের একসঙ্গে চলাফেরা ছিল।
চক্রে জড়িয়ে যায় আদরের সন্তান
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া তৃতীয় ব্যক্তি ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর। তাঁর বাড়ি কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার কালীরবাজার ইউনিয়নের হাতিগাড়া এলাকায়। সে স্থানীয় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সালমানপুরের ১৫ বছর বয়সী কিশোরের সঙ্গে এই কিশোরের বন্ধুত্ব ছিল। সেই বন্ধুত্বের সূত্রেই তুহিনের সঙ্গে তার পরিচয় হয় বলে স্থানীয় কয়েকজন জানিয়েছেন। কিশোরটির বাবা সৌদিপ্রবাসী। তারা দুই বোন ও এক ভাই। প্রায় তিন বছর আগে হাতিগাড়া এলাকায় জায়গা কিনে বাড়ি করেন তাঁর বাবা। এর আগে তাঁরা কোটবাড়ি চাঙ্গিনী এলাকায় থাকতেন।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, কিশোরটি পরিবারের সবার আদরের ছিল। তাঁকে একটি পুরোনো আইফোনও কিনে দেওয়া হয়েছিল। ওই ফোন দিয়ে সে নিয়মিত টিকটক ভিডিও করত।
মঙ্গলবার বেলা তিনটার দিকে হাতিগাড়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, কিশোরটির নানি দুই ছোট বোনকে নিয়ে বসে আছেন। বাড়িতে মা থাকলেও তিনি সামনে আসেননি। ওই কিশোর কখনো কারও ক্ষতি করেনি দাবি করে নানি বলেন, ‘সে কেমনে খুন করল জানি না। প্রথমে তার কাছ থেকে ফোন নিছে। এরপরে তারে জিজ্ঞাসা করে দিয়ে যাবে বলে নিয়ে গেছে। এরপরে শুনি তারে গ্রেপ্তার করছে।’
পাশের বাড়ির এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পরিবার ছেলেটিকে বেশি আদর করত। তাঁর ভাষ্য, তুহিনের সঙ্গে ওঠাবসার কারণেই ছেলেটি ধীরে ধীরে ওই চক্রে জড়িয়ে পড়ে থাকতে পারে।
‘আমি হত্যা করিনি, হত্যা করেছে আমার বন্ধুরা’
অপ্রতিম হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১৯ বছর বয়সী মো. সিয়ামকে। তাঁর বাড়ি সদর দক্ষিণ মডেল থানার সুধন্যপুর (নোয়াবাড়ি) এলাকায়। সিয়াম আফজাল খান টেকনিক্যাল অ্যান্ড কমার্স কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী। তাঁর বাবা সেলিম মিয়া প্রায় তিন বছর আগে মারা গেছেন। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সিয়াম মেজ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, প্রায় এক বছর আগে সিয়াম একটি মোটরসাইকেল কেনেন। মোটরসাইকেল চালানোর সূত্রে তুহিনের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। পরে তাঁরা নিয়মিত একসঙ্গে চলাফেরা করতেন এবং রাতে আড্ডা দিতেন।
জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাসহ অন্তত তিনজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের দিন শনিবার রাতে সিয়ামকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়। তাঁদের ভাষ্য, অপ্রতিমকে হত্যার পর শুক্রবার রাত নয়টার দিকে তুহিন প্রায় দেড় ঘণ্টা সিয়ামের সঙ্গে আড্ডা দেন। তুহিন তাঁকে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত জানিয়েছিলেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দাবি করেছেন। কিন্তু সিয়াম বিষয়টি গোপন রাখেন।
তদন্তের সময় প্রযুক্তির সহায়তায় একটি কথোপকথন পুলিশের নজরে আসে বলে কর্মকর্তারা জানান। ওই কথোপকথনে একজন তুহিনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে জানিয়ে সিয়ামকে এলাকা থেকে পালিয়ে যেতে বলেন। জবাবে সিয়াম বলেন, ‘আমি হত্যা করিনি, হত্যা করেছে আমার বন্ধুরা।’
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে জানার পরও বিষয়টি গোপন রাখার অভিযোগে সিয়ামকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চার আসামির মধ্যে বন্ধুত্ব হয়েছে মোটরসাইকেল চালানো, টিকটক ভিডিও করা এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও কোটবাড়ি এলাকার বিভিন্ন স্থানে একসঙ্গে চলাফেরার সূত্রে। নিহত অপ্রতিমের সঙ্গেও তুহিনের যোগাযোগ ছিল কয়েক মাস ধরে। বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজে তাঁদের একসঙ্গে চলাফেরা দেখা গেছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তবে এসব সম্পর্কের কোনটি, কীভাবে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত গড়িয়েছে, সেটি তদন্ত করে দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।