জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচনে প্যানেল ঘোষণায় বেশ কিছু কৌশল নিয়েছে ছাত্রদল। নারী শিক্ষার্থীদের ভোট টানতে জিএস পদে নারী প্রার্থী রাখা হয়েছে। এ ছাড়া হত্যা মামলা থাকায় বিতর্ক এড়াতে গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয় ও ক্যাম্পাসে ‘জনপ্রিয়’ ছাত্রদল নেতা হামিদুল্লাহ সালমানকে শীর্ষ পদে রাখা হয়নি।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অদম্য-২৪ স্মৃতিস্তম্ভ চত্বরে এ প্যানেল ঘোষণা করেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহসভাপতি আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহিয়া।
ছাত্রদল সমর্থিত এই প্যানেল থেকে সহসভাপতি (ভিপি) পদে নির্বাচন করবেন মীর মশাররফ হোসেন হল ছাত্রদলের সভাপতি শেখ সাদী হাসান এবং সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে নির্বাচন করবেন ১৩ নম্বর হল ছাত্রদলের সভাপতি তানজিলা হোসাইন বৈশাখী।
ছাত্রদলের সমর্থিত প্যানেল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্যানেলে নারীদের জন্য নির্ধারিত ছয়টি পদের বাইরে জিএস পদে নারী প্রার্থী দিয়েছে সংগঠনটি। এ ছাড়া প্যানেলটিতে একজন সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীকেও রাখা হয়েছে। তবে তাদের প্যানেলে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর কোনো শিক্ষার্থীকে রাখা হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এবারের জাকসু নির্বাচনে মোট ভোটার রয়েছেন ১১ হাজার ৯১৯ জন। এর মধ্যে প্রায় ৪৯ শতাংশ ভোটার ছাত্রী। ইতিমধ্যে ইসলামী ছাত্রশিবির, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ প্যানেল ঘোষণা করেছে। তাদের ঘোষিত প্যানেলে শীর্ষ দুটি পদে (ভিপি, জিএস) কোনো নারী প্রার্থী রাখা হয়নি। এ ছাড়া বামপন্থী সংগঠনগুলোর সমর্থিত ‘সম্প্রীতির ঐক্য’ নামে একটি প্যানেল এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক আবদুর রশিদের নেতৃত্বে আরেকটি প্যানেল হতে পারে। তবে তাদের সমর্থিত এসব প্যানেলেও শীর্ষ পদ দুটিতে নারী প্রার্থী থাকছে না বলে জানা গেছে।
শাখা ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা বলছেন, যেহেতু নারী ভোটার অর্ধেক এবং অন্যান্য প্যানেলে শীর্ষ পদে নারী প্রার্থী নেই, সেহেতু নারীদের ভোট টানতে তাঁরা কৌশলের অংশ হিসেবে সাধারণ সম্পাদক পদে নারী প্রার্থীকে রেখেছেন। এ ছাড়া শাখা ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে ভিপি পদে সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিলেন হামিদুল্লাহ সালমান। জুলাই আন্দোলনে সামনের সারিতে নেতৃত্ব দেওয়া ও ছাত্রলীগের হাতে নির্যাতনের শিকার ছাত্রদলের এই নেতার ক্যাম্পাসে জনপ্রিয়তাও রয়েছে অনেক বেশি। তবে গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাম্পাসে গণপিটুনিতে নিহত সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শামীম মোল্লা হত্যার ঘটনার মামলায় আসামি হওয়ায় বিতর্ক এড়াতে তাঁকে শীর্ষ পদে প্রার্থী করেনি ছাত্রদল। তাঁকে কার্যকরী সদস্য পদে প্রার্থী করা হয়েছে।
দুর্ভাগ্যবশত ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ভালোর জন্য যে মানুষগুলো প্রতিনিধিত্ব করতে পারতেন, এই প্যানেলে সেই উপযোগী মানুষগুলো স্থান পায়নি।সৈয়দা অনন্যা ফারিয়া, আহ্বায়ক কমিটির সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল
তবে ছাত্রদলের এই কৌশল কতটা ফলপ্রসূ হবে, সেটা জানতে অপেক্ষা করতে হবে আগামী ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। ওই দিন জাকসু এবং ২১টি আবাসিক হলে হল সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
ছাত্রদলের সমর্থিত প্যানেল থেকে প্রার্থী হতে সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে সাধারণ সম্পাদক, সহসাধারণ সম্পাদক (নারী), পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক পদসহ তিনটি পদে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সৈয়দা অনন্যা ফারিয়া। তবে ছাত্রদলের ঘোষিত প্যানেলে তাঁকে কোনো পদেই রাখা হয়নি। ছাত্রদলের প্যানেল ঘোষণার পর ছাত্রদলের ওই নেত্রী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জিএস পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দেন।
এ বিষয়ে সৈয়দা অনন্যা ফারিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ভালোর জন্য যে মানুষগুলো প্রতিনিধিত্ব করতে পারতেন, এই প্যানেলে সেই উপযোগী মানুষগুলো স্থান পায়নি।’
শাখা ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে ছয়টি পক্ষ রয়েছে। আহ্বায়ক জহিরুদ্দিন বাবর, সদস্যসচিব ওয়াসিম আহমেদ, যুগ্ম আহ্বায়ক শাহ মো. ফয়সাল, যুগ্ম আহ্বায়ক হুমায়ুন হাবিব হিরণ, যুগ্ম আহ্বায়ক আফফান আলী একেকটি পক্ষের নেতৃত্ব দেন। এ ছাড়া কিছুদিন আগে ঘোষিত হল কমিটিকে কেন্দ্র করে একদল নেতা-কর্মী বিদ্রোহ করেছিলেন। তাঁদেরও একটি পক্ষ রয়েছে। এসব গ্রুপ থেকে ভিপি, জিএস ও এজিএস পদে অন্তত ২৩ জন সম্ভাব্য প্রার্থী ছিলেন। তবে তাঁদের মধ্যে প্যানেলে ৬ জন জায়গা পেলেও বাকি ১৭ জনজকে কোনো পদে রাখা হয়নি।
জাকসুর বিষয়ে সব সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় ছাত্রদল থেকে নেওয়া হয়েছে। যাঁরা শিক্ষার্থীদের মধ্যে এগিয়ে রয়েছেন, তাঁদেরই প্যানেলে নেওয়া হয়েছে। দলীয়ভাবে কে ত্যাগী, সেটা দেখা হয়নি।ওয়াসিম আহমেদ, সদস্যসচিব, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল
শাখা ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা জানান, জাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ২০ আগস্ট বুধবার ক্যাম্পাসে আসেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহসভাপতি আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহিয়াসহ কয়েকজন নেতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়াতে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের নিয়ে জাকসুর প্রার্থী কারা হবেন, সেসব নিয়ে আলোচনা করে প্রাথমিক তালিকা তৈরি করেন তাঁরা। পরে আগ্রহী প্রার্থীদের সবাইকে একাধিক পদে মনোনয়নপত্র জমা দিতে বলেন সংগঠনের শীর্ষ নেতারা। প্রাথমিক ওই তালিকায় ভিপি পদে ৬ জন, জিএস পদে ৯ জন, এজিএস (ছেলে) পদে ৮ জন মনোনয়নপত্র জমা দেন। তবে ওই তালিকা থেকে শীর্ষ পদে কাদের চূড়ান্ত প্রার্থী করে প্যানেল ঘোষণা হবে, সেটা নিয়ে শাখা ছাত্রদলের নেতাদের পক্ষগুলোর মতানৈক্য হয়নি। পরে প্রার্থী নির্ধারণের কাজটি গড়ায় কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের ওপর। পরে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের বিএনপিপন্থী এক শিক্ষক মিলে এই প্যানেল ঠিক করেছেন বলে জানা গেছে।
ছাত্রদল যে প্যানেল ঘোষণা করেছে তাতে ভিপি প্রার্থী শেখ সাদী হাসান শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক শাহ মো. ফয়সালের অনুসারী, জিএস প্রার্থী তানজিলা হোসাইন বৈশাখী শাখা ছাত্রদলের সদস্যসচিব ওয়াসিম আহমেদের অনুসারী বলে জানা গেছে।
সার্বিক বিষয়ে ছাত্রদলের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্যসচিব ওয়াসিম আহমেদ বলেন, জাকসুর বিষয়ে সব সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় ছাত্রদল থেকে নেওয়া হয়েছে। যাঁরা শিক্ষার্থীদের মধ্যে এগিয়ে রয়েছেন, তাঁদেরই প্যানেলে নেওয়া হয়েছে। দলীয়ভাবে কে ত্যাগী, সেটা দেখা হয়নি।