বাজনার তালে তালে বইঠা বেয়ে চলছেন মাঝিরা। গত শনিবার কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার ধনপুর বাজারসংলগ্ন ‘সুরমা’ নদীতে
বাজনার তালে তালে বইঠা বেয়ে চলছেন মাঝিরা। গত শনিবার কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার ধনপুর বাজারসংলগ্ন ‘সুরমা’ নদীতে

হাওরে জাঁকজমকপূর্ণ নৌকাবাইচ

৩০ জনের সঙ্গী হয়ে ইটনার আড়ালিয়া এলাকা থেকে নৌকায় করে সুরমা নদীতে নৌকাবাইচ দেখতে এসেছেন আরাফাত ইসলাম। বয়স ২৫ বছর হলেও এর আগে কখনো নৌকাবাইচ দেখা হয়নি তাঁর। এবারই প্রথম। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বাইচ চলবে, তাই নৌকার মধ্যেই দুপুরের খাবারের আয়োজন করেছেন তাঁরা। রান্নাও হয়েছে নৌকাতেই।

গত শনিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার ধনপুর বাজারসংলগ্ন সুরমা নদীতে অনুষ্ঠিত হয় গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ। ঢাকঢোলের বাদ্য, মাঝিদের হইহুল্লোড় আর ছন্দ মিলিয়ে বইঠা চালানোর শব্দে মুখর হয়ে ওঠে নদীর বুক। বাইচ দেখতে সকাল থেকেই নদীর দুই পাড়ে জড়ো হন হাজারো মানুষ। সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় কিশোরগঞ্জের পাশাপাশি হবিগঞ্জ ও নেত্রকোনা থেকেও আসেন অনেকে। ধনপুর বাজার ও আশপাশের এলাকা হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।

যুবসমাজকে মাদক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রেখে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী করা এবং হাওরাঞ্চলের হারিয়ে যেতে বসা লোকজ ঐতিহ্য ধরে রাখার লক্ষ্যেই ধনপুর ইউনিয়নবাসীর উদ্যোগে এ আয়োজন করা হয়।

বাইচ শুরু হতেই বদলে যায় নদীর পরিবেশ

বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ১২টি নৌকা প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। সকাল থেকেই নদীর দুই পাড়ে বাড়তে থাকে দর্শনার্থীদের ভিড়। পরিবার-পরিজন নিয়ে এসেছেন, কেউ কেউ আবার বন্ধুদের সঙ্গে। আবার অনেকে নৌকা ভাড়া করে নদীর মাঝখান থেকে উপভোগ করেছেন বাইচ। ধনপুর বাজারের আশপাশের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ছিল অতিথিদের আনাগোনা।

বাইচ শুরু হতেই বদলে যায় নদীর পরিবেশ। ঢাকঢোলের তালে মাঝিদের হাঁকডাক, একসঙ্গে বইঠা চালানোর ছন্দ—সব মিলিয়ে জমে ওঠে প্রতিযোগিতা। জয়ের জন্য সর্বশক্তি দিয়ে বইঠা চালাতে থাকেন মাঝিরা। কখনো একটি নৌকা এগিয়ে যায়, পরক্ষণেই অন্যটি তাকে পেছনে ফেলে সামনে চলে আসে। নদীর দুই পাড় থেকে দর্শকেরা পছন্দের নৌকাকে উৎসাহ দিতে হর্ষধ্বনি ও করতালিতে মুখর করে তোলেন চারপাশ। অনেকে মুঠোফোনে ধারণ করেন বাইচের দৃশ্য।

হাওর–অধ্যুষিত ইটনা উপজেলার মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে নৌকার সম্পর্ক বহু পুরোনো। বর্ষায় বিস্তীর্ণ হাওর পানিতে তলিয়ে গেলে নৌকাই হয়ে ওঠে মানুষের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। সেই নৌকাকে ঘিরেই যুগের পর যুগ ধরে চলে আসছে নৌকাবাইচের ঐতিহ্য। তবে আধুনিকতার প্রভাবে আগের মতো নিয়মিত এ ধরনের আয়োজন হয় না। ফলে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামবাংলার এই লোকজ সংস্কৃতিও।

প্রথম পুরস্কার ‘সোনার হরিণ’

তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর প্রথম স্থান অর্জন করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসা শাপলা বয়েজ ক্লাবের নৌকা। তারা ইটনার ধনপুর ঘোষপাড়ার হয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। বিজয়ী দলের হাতে প্রথম পুরস্কার হিসেবে তুলে দেওয়া হয় ‘সোনার হরিণ’। দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী দল পায় ‘রুপার ময়ূর’ এবং তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দলের হাতে তুলে দেওয়া হয় এলইডি টেলিভিশন। পুরস্কার পাওয়ার পর বিজয়ী দল ও তাদের সমর্থকদের মধ্যে দেখা যায় উচ্ছ্বাস।

স্থানীয় বাসিন্দা সুভাষ চন্দ্র দাস বলেন, একসময় গ্রামবাংলার প্রায় প্রতিটি উৎসব-আয়োজনে লোকজ সংস্কৃতির ছোঁয়া থাকত। জারি, সারি ও ভাটিয়ালি গান, লাঠিখেলা, কাবাডি ও নৌকাবাইচ ছিল গ্রামীণ মানুষের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম। সময়ের সঙ্গে এসব আয়োজন অনেকটাই কমে গেছে। দীর্ঘদিন পর নৌকাবাইচের এমন আয়োজন নতুন প্রজন্মকে নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

নৌকাবাইচ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন, জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী উম্মে কুলসুম রেখা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাখন চন্দ্র সূত্রধর।

হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে নৌকার সম্পর্ক গভীর। তাই সুরমা নদীর এই নৌকাবাইচ শুধু বিনোদনের আয়োজন নয়, লোকজ ঐতিহ্যকে ধরে রাখারও একটি প্রয়াস।