চঞ্চল ভৌমিক
চঞ্চল ভৌমিক

গ্যারেজে তরুণের দগ্ধ মরদেহ

‘আমার ছেলেরে কেউ আগুন লাগাইয়া মাইরা ফেলছে’

নরসিংদীতে গ্যারেজে ঘুমন্ত অবস্থায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে চঞ্চল ভৌমিকের নির্মম মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড বলছেন স্বজন ও সহকর্মীরা। যদি পরিকল্পিত না–ও হয়, তবু এটি হত্যাকাণ্ড মনে করেন ওই গ্যারেজের মালিক। তাঁদের দাবি, পুলিশকেই তদন্ত শেষে বের করতে হবে, চঞ্চলের সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল।

গত শনিবার ভোরে নরসিংদী সদর উপজেলা চিনিশপুর ইউনিয়নের দগরিয়া এলাকা থেকে ওই গ্যারেজকর্মীর পুড়ে যাওয়া মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘পেট্রল ঢেলে পুড়িয়ে হত্যার’ ঘটনা হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে। তবে ঘটনাটি হত্যাকাণ্ড নাকি দুর্ঘটনা, তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ।

চঞ্চল ভৌমিক (২৫) কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের খোকন ভৌমিকের ছেলে। তিনি সাত বছর ধরে ওই গ্যারেজের একজন কর্মচারী ছিলেন। তাঁর বাবা মারা গেছেন ছয় মাস আগে। কুমিল্লার গ্রামের বাড়িতে মা আর বড় ভাই আছেন। বড় ভাই উজ্জ্বল ভৌমিক শারীরিক প্রতিবন্ধী। চঞ্চল ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম।

গতকাল রোববার দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দগরিয়ায় পাশাপাশি তিনটি টিনশেড দোকান, মাঝেরটি রুবেলের গ্যারেজ। দুই পাশের দুই দোকানের একটিতে গাড়ি রং করা হয়, অন্যটিতে পার্টস বিক্রি করা হয়। গত শুক্রবার ভোরের আগমুহূর্তে গ্যারেজে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও দুই পাশের দুই দোকানে আগুন লাগার কোনো চিহ্ন নেই। গ্যারেজে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছিল। স্থানীয় ব্যক্তিরা বলছেন, ‘এটি কোনো দুর্ঘটনা হতে পারে না, অবশ্যই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।’

চঞ্চল ভৌমিক (২৫) কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের খোকন ভৌমিকের ছেলে। তিনি সাত বছর ধরে নরসিংদী সদর উপজেলা চিনিশপুর ইউনিয়নের দগরিয়া এলাকার একটি গ্যারেজের কর্মচারী ছিলেন।

তিন বছর ধরে নিহত চঞ্চলের সহকর্মী ছিলেন শান্ত দেবনাথ (২২)। তিনি বলেন, ‘চঞ্চল সব সময় রাতে গ্যারেজেই ঘুমাতো। শুক্রবার সকালে আগুন লাগার খবর পেয়ে গ্যারেজে গিয়ে তাঁর পুড়ে যাওয়া মরদেহ দেখি। আমি কখনোই শুনি নাই, তাঁর কারও সঙ্গে শত্রুতা আছে। কখনো বলেও নাই, কখনো দেখিও নাই। কাজ ছাড়া খুব একটা বাইরেও যেত না। সিসিটিভি ক্যামেরা ফুটেজে যাকে দেখা গেছে, তাঁকে এর আগে কখনো এলাকায় দেখা যায়নি। ওই লোক ময়লা মবিলমাখা কাপড় কুড়িয়ে জড়ো করে আগুন ধরান। পুরো গ্যারেজই মবিলে মাখামাখি ছিল। ওই আগুন শাটারের ভেতরে ঢুকে ঘুমন্ত চঞ্চলের গায়ে লাগে।’

গ্যারেজের মালিক রুবেল মিয়ার ভাষ্য, ‘তাঁর (চঞ্চল) মৃত্যুকে আমি দুর্ঘটনা মনে করতে পারছি না, এটি অবশ্যই হত্যাকাণ্ড। ওই পরিবারে উপার্জন করার আর একজনও রইল না।’ তিনি জানান, শনিবার সন্ধ্যায় চঞ্চলের মরদেহ নিয়ে কুমিল্লার বাড়িতে যান। রোববার দুপুরে স্থানীয় শ্মশানে চঞ্চলের শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়েছে।

চঞ্চলের মা ববিতা ভৌমিক মুঠোফোনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার ছেলেরে কেউ আগুন লাগাইয়া মাইরা ফেলছে। তার তো কোনো শত্রু আছিল না। ছয় মাস আগে তার বাবা মারা গেছে, ছোট ছেলেডাও এহন মারা গেল। বড় ছেলে প্রতিবন্ধী, কোনো কাম করতে পারে না। এহন কে সংসার চালাইব?’

নরসিংদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ আর আল মামুন বলেন, ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাঁকে আটক করতে থানা-পুলিশের পাশাপাশি র‍্যাব ও ডিবি চেষ্টা চালাচ্ছে। এই ঘটনায় পুলিশি তদন্তও চলছে।

শুক্রবার রাতে চঞ্চল গ্যারেজে ঘুমিয়েছিলেন। রাতে গ্যারেজে আগুন লাগে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। এ সময় তাঁর আগুনে পোড়া মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরদিন সকালে পুলিশ তাঁর পুড়ে যাওয়া মরদেহ উদ্ধার করে। পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তি আশপাশ থেকে মবিলমাখা কাগজ-কাপড় কুড়িয়ে এনে গ্যারেজের শাটারের সামনে আগুন ধরান। সেখানে তিনি প্রায় দুই ঘণ্টা অবস্থান করেন।