নরসিংদী প্রেসক্লাব মিলনায়তনে গতকাল শনিবার লেখক-গবেষক মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান স্মরণে নাগরিক শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে
নরসিংদী প্রেসক্লাব মিলনায়তনে গতকাল শনিবার লেখক-গবেষক মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান স্মরণে নাগরিক শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে

নাগরিক শোকসভা

হাবিবুল্লা পাঠানকে স্মরণ, গঙ্গাঋদ্ধি প্রত্নজাদুঘর নির্মাণকাজ শেষ করার দাবি

উয়ারী-বটেশ্বরখ্যাত প্রত্নসম্পদ ও লোকসাহিত্য সংগ্রাহক এবং বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক-গবেষক মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান স্মরণে নাগরিক শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল শনিবার বিকেলে নরসিংদী প্রেসক্লাব মিলনায়তনে বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ এ নাগরিক শোকসভার আয়োজন করে।

শোকসভায় মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠানের জীবন ও কর্মকে স্মরণের পাশাপাশি উয়ারী-বটেশ্বরের প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ ও গঙ্গাঋদ্ধি প্রত্ন জাদুঘর নির্মাণকাজ সমাপ্ত করার দাবি জানানো হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে তাঁর সর্বশেষ দেওয়া সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত কিছু অংশ প্রজেক্টরে প্রদর্শন করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন নরসিংদীর শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনসহ নানা শ্রেণি–পেশার শতাধিক বিশিষ্টজন।

নাগরিক শোকসভায় মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠানের নানা স্মৃতিচারণা করে বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান ও বাংলা একাডেমির উপপরিচালক লোক–গবেষক সাইমন জাকারিয়া।

আরও বক্তব্য দেন নরসিংদী সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আলী, গোলাম মোস্তাফা মিয়া, সাবেক উপাধ্যক্ষ মুহাম্মদ সিরাজ উদ্দীন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ সোহরাওয়ার্দী, নরসিংদী ইনডিপেনডেন্ট কলেজের অধ্যক্ষ মশিউর রহমান মৃধা, জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ নরসিংদীর সাধারণ সম্পাদক রায়হানা সরকার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য বাবু রঞ্জিত কুমার সাহা, প্রগতি লেখক সংঘের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি জাকির হোসেন, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল আলম। এ ছাড়া তাঁর পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বড় মেয়ে ফেরদৌসী পাঠান (সুরভী), ছোট বোন ফাতেমা বেগম ও ছোট ভাই বরকত উল্লাহ পাঠান।

মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠানের বড় মেয়ে ফেরদৌসী পাঠান সুরভী তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘জীবদ্দশাতেই আমার বাবার সম্মানের ভান্ডার পূর্ণ ছিল। মৃত্যুর পরও এ মিলনায়তনে গুণী মানুষেরা একত্র হয়ে আমার বাবাকে সম্মান জানাচ্ছেন। আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে আপনারা সবাই কৃতজ্ঞতা জানবেন। বাবার কর্মকাণ্ড নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি জাদুঘরের অসমাপ্ত কাজ এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে সবার সহযোগিতা চাই।’

অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমার জীবনে দেখা একজন সেরা মানুষ মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান। ১৯৯৬ সালে তাঁর সঙ্গে পরিচয়, ২০০০ সাল থেকে একসঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছি। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক যে এত উঁচুমানের চিন্তা করতে পারেন, সেটা তাকে না দেখলে বুঝতাম না। প্রত্নতত্ত্বের একজন ছাত্র-শিক্ষক-গবেষক হয়েও মাথা হেট হয়ে যায় তাঁর ডেডিকেশন (নিষ্ঠা) দেখে। তিনি এমন উচ্চতায় পৌঁছেছেন, দেশের পণ্ডিত-গবেষকদেরও কিন্তু তাঁকে মূল্যায়ন করতে হয়। কারণ, অ্যাচিভ করার টার্গেট তাঁর অনেক হাই ছিল।’

গঙ্গাঋদ্ধি জাদুঘরের নির্মাণকাজ থমকে থাকার আক্ষেপ নিয়ে সুফি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বিদ্যমান পরিস্থিতিতে জাদুঘরটির কাজ এগিয়ে নিতে পারব কি না, দ্বিধা-দ্বন্দ্বে আছি। পরিবেশ এতটা ঘোলাটে। ভবনটি দাঁড়িয়েছে, ইনটেরিয়র বাকি আছে। প্রকল্পের ঠিকাদারসহ তৎকালীন প্রকৌশলী, চেয়ারম্যান ও শিল্পমন্ত্রী মিলে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে টাকাগুলো খেয়েছেন।’ জাদুঘরের নির্মানকাজ সম্পন্ন করার ব্যাপারে যাঁর যাঁর জায়গা থেকে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে সুফি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ঠিক করেছি শেষ জীবনে বটেশ্বরে স্যাটেল হব, এ জাদুঘরের দায়িত্ব নেব। হানীফ পাঠান শুরু করেছিলেন, মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান দায়িত্ব তাঁর কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। তাঁর অসমাপ্ত কাজগুলো শেষ করার দায়িত্ব এবার আমার।’

হাবিবুল্লা পাঠানের রচনাবলি প্রকাশের পরিকল্পপনা সম্পর্কে জানান সাইমন জাকারিয়া। তিনি বলেন, ‘বড় কাজ হবে, যদি তাঁর অপ্রকাশিত গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া যায়। এ ব্যাপারে বাংলা একাডেমি সহযোগিতা করবে। এ ছাড়াও তিনি যেহেতু বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক, পরিবারের সম্মতি পেলে তাঁর রচনাবলি প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

গত ২১ মার্চ ঈদের দিন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নরসিংদীর বেলাব উপজেলার বটেশ্বর গ্রামে নিজ বাড়িতে মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠানের মৃত্যু হয়। ওই দিন বাদ আসর বটেশ্বর উচ্চবিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে নির্মাণাধীন গঙ্গাঋদ্ধি জাদুঘরের সড়কের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ফুসফুসের ক্যানসারে ভুগছিলেন।