লিবিয়ার বন্দিশালায় দালালের নির্যাতনে মাদারীপুরে তরুণ মো. জহিরুল আকনের মৃত্যুতে তাঁর পরিবারে বইছে মাতম। মঙ্গলবার দুপুরে ডাসার উপজেলার দক্ষিণ ধূয়াসায়
লিবিয়ার বন্দিশালায় দালালের নির্যাতনে মাদারীপুরে তরুণ মো. জহিরুল আকনের মৃত্যুতে তাঁর পরিবারে বইছে মাতম। মঙ্গলবার দুপুরে ডাসার উপজেলার দক্ষিণ ধূয়াসায়

ইতালি নেওয়ার কথা বলে ৫০ লাখ টাকা নিয়েও বন্দিশালায় আটকে নির্যাতন, তরুণের মৃত্যু

অবৈধপথে ইতালি যাওয়ার পথে লিবিয়ার বন্দিশালায় দালালের নির্যাতনে মাদারীপুরের আরও এক তরুণের মৃত্যু হয়েছে। গত রোববার তাঁর মৃত্যু হলেও গতকাল সোমবার রাতে মৃত্যুর খবর পায় তাঁর পরিবার। এর পর থেকেই ওই তরুণের বাড়িতে মাতম চলছে।

নিহত ওই তরুণের নাম মো. জহিরুল আকন (২৮)। তিনি ডাসার উপজেলা বালিগ্রাম ইউনিয়নের দক্ষিণ ধূয়াসা গ্রামের শামসুল হক আকনের ছোট ছেলে। এর আগে গত এক মাসে ডাসার ও কালকিনি উপজেলার দুই যুবকের মুক্তিপণের টাকার জন্য দালালের নির্যাতনে লিবিয়াতে মৃত্যু হয়েছে।

নিহত জহিরুলের মেজ ভাই জালাল আকন প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে কোনো ঝামেলা ছাড়াই ২৫ লাখ টাকার চুক্তিতে ১৭ দিনে ইতালি নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়েছিলেন স্থানীয় দালাল জাকির মাতুব্বর। পরে দেড় মাস লিবিয়াতে বসবাসকারী বাংলাদেশি মাফিয়াদের (দালাল) কাছে বন্দী ছিলেন। মুক্তিপণের জন্য প্রথমে ১৫ লাখ, পরে ১০ লাখ টাকাও দিছি। শুরুতে চুক্তির ২৫ লাখ তো আগেই দিয়েছি। আমাগো টোটাল ৫০ লাখ টাকাও গেল, তবুও ভাইডারে বাঁচাইতে পারলাম না।’

কথাগুলো বলে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন জহিরুলের মেজ ভাই জালাল আকন। তিনি একসময় প্রবাসে থাকলেও বর্তমানে দেশেই কৃষিকাজ করছেন।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জহিরুল স্থানীয় একটি কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। পরে আনসারে চাকরি নেন। চাকরি করা অবস্থায় বিয়ে করেছেন। একপর্যায়ে চাকরি ছেড়ে বড় ভাইয়ের সঙ্গে গ্রামের কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন জহিরুল। উন্নত জীবনের আশায় বিদেশ যাওয়ার পরিকল্পনা করেন তিনি। ছয় মাস আগে ডাসার উপজেলার বালিগ্রাম এলাকার তারক দাস ও জাকির মাতুব্বর নামে স্থানীয় দুই দালালের প্রলোভনে পড়েন জহিরুল। তাঁরা মাত্র ১৭ দিনের মাথায় ইতালি পৌঁছে দেওয়ার প্রলোভন দেখালে রাজি হয়ে যান জহিরুল। পরে ২৫ লাখ টাকা চুক্তিতে প্রথমে বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচের দেশ সৌদি আরবে নিয়ে যায় দালাল চক্র। সেখানে কয়েক দিন রাখার পর সৌদি আরব থেকে আকাশপথে লিবিয়া নেওয়া হয়। পরে লিবিয়ার উপকূল থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে তাঁকে প্রায় সাড়ে তিন মাস একটি বন্দিশালায় আটকে রাখা হয়। এই সাড়ে তিন মাস জহিরুলের ওপর কোনো নির্যাতন চালায়নি দালাল চক্র।

জহিরুল আকনের মৃত্যুতে তাঁর স্বজনদের আহাজারি

পরিবারের লোকজন জানান, দেড় মাস আগে লিবিয়ার উপকূলে যাওয়ার পথে স্থানীয় মাফিয়াদের (দালাল) হাতে জিম্মি হন জহিরুল। পরে তাঁকে গোপন একটি বন্দিশালায় আটকে রেখে মুক্তিপণের জন্য অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। নির্যাতনের সেই ভিডিও জহিরুলের পরিবারের কাছে পাঠিয়ে মুক্তিপণের জন্য ২৫ লাখ টাকা চাওয়া হয়। পরে জহিরুলের পরিবার স্থানীয় দালাল জাকির মাতুব্বরের মাধ্যমে প্রথমে ১৫ লাখ ও পরে ১০ লাখ টাকা দেয়। মুক্তিপণের ২৫ লাখ টাকা দালাল জাকির নেওয়ার পরও মুক্তি মেলে না জহিরুলের। একপর্যায়ে দালালের হাতে বন্দিশালার মধ্যেই রোববার জহিরুল মারা যান।

স্থানীয় দালাল জাকির মাতুব্বর নিজেই জহিরুলের মৃত্যুর সংবাদ তাঁর পরিবারের কাছে জানিয়ে সমঝোতার প্রস্তাব দেন বলে জানান স্বজনেরা। বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে আত্মগোপনে চলে যান দালাল জাকিরসহ তাঁর লোকজন। এ ঘটনায় দালালের সর্বোচ্চ শাস্তি ও জহিরুলের মরদেহটি দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন স্বজনেরা।

আজ মঙ্গলবার সরেজমিন দক্ষিণ ধূয়াসা এলাকার জহিরুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িভরা লোকজন। আত্মীয়স্বজন ও বাড়ির লোকজন কান্নাকাটি করছেন। তাঁদের আহাজারিতে আশপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে। প্রতিবেশীরাও জহিরুলের বাড়িতে ভিড় জমিয়ে স্বজনদের সান্ত্বনা দিচ্ছেন। জহিরুলের স্ত্রী, মা-বাবা বারবার আহাজারি করতে করতে চিৎকার করছিলেন।

জহিরুল আকন

স্থানীয় বাসিন্দা পারভীন আক্তার বলেন, ‘জহিরুলের দুই মেয়ের মধ্যে ১০ মাস বয়সী বড় মেয়ে বাবার মৃত্যুর বিষয়টি কিছুটা বুঝতে পারলেও ছয় বছরের ছোট অবুঝ মেয়েটি জানেই না তার বাবা আর কখনো ফিরে আসবে না। বাবা হারানো মেয়ে দুটির মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। আমাদেরও খুব কষ্ট হচ্ছে।’

জহিরুলের মা রিজিয়া বেগম আহাজারি করতে করতে বলেন, ‘আমার পোলাডার জান ভিক্ষা চাইছিলাম, ওরা দিল না। হায় আল্লাহ, তুমি আমার পোলাডারে ফিরাইয়া আইনা দাও। আমার পোলাডা এভাবে মরতে পারে না। ওরে ফিরাইয়া দাও।’

এদিকে স্বামী জহিরুলের মৃত্যুর খবর মানতে পারছেন না তাঁর স্ত্রী সাথী আক্তার। তিনি বলেন, ‘অভাবের সংসারে একটু ভালো থাকতে চাইছিলাম। কিন্তু এমন পরিণতি হবে জানলে আমার স্বামীরে পাঠাইতাম না। ওরা কইছিল (দালাল) কোনো ঝামেলা নাই। ২৫ লাখে ইতালি নিয়া যাইব, কিন্তু নিয়া গেল না। দালাল জাকির মাতুব্বর আমাগো কাছ থিকা অনেক টাকা নিছে। টাকা নিয়া হইলেও ওরে বাঁচাইয়া রাখত। এখন আমার মাইয়া দুইডারে কে দেখব। সামনে ওগের কী হবে?’

এদিকে জহিরুলের পরিবার মীমাংসায় রাজি না হওয়ায় আত্মগোপনে চলে গেছেন মূল অভিযুক্ত দালাল ডাসার উপজেলার বালিগ্রাম এলাকার জাকির মাতুব্বর ও তারক দাস। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তাঁরা দুজন দীর্ঘদিন ধরে মানব পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত। স্থানীয় আরেক দালাল হাবিবুর রহমান খন্দকার ওরফে হাবিব মাস্টারের হয়ে কাজ করেন। হাবিবুরের বাড়ি ডাসার উপজেলার গোপালপুর এলাকায়। তিনি একটি মাদ্রাসার সাবেক শিক্ষক, বাংলাদেশে থেকে লিবিয়ার মানব পাচার চক্রের অন্যতম সদস্য হিসেবে কাজ করে আসছেন। দীর্ঘদিন ধরে এই পেশায় জড়িত থাকলেও পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে আছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কালকিনি ও ডাসার উপজেলা থেকে অন্তত তিন শতাধিক যুবককে লিবিয়া হয়ে ইতালিতে পাঠিয়েছেন হাবিবুর খন্দকার। এখনো লিবিয়ার বন্দিশালায় তাঁর অন্তত শতাধিক অভিবাসনপ্রত্যাশী আছেন।

জানতে চাইলে জাকির মাতুব্বর, তারক দাস ও হাবিবুর রহমান খন্দকারের মুঠোফোনে কল দিলে তাঁদের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এ বিষয়ে অভিযুক্ত দালাল তারক দাসের মা মিনতী দাস বলেন, ‘তারক দাস শতাধিক লোক লিবিয়া দিয়ে ইতালিতে পাঠিয়েছে এমন ঘটনার প্রমাণ দেন। আমার ছেলে কোথায় আছে, তা জানি না। তবে তারক কোনো খারাপ কাজে জড়িত নয়।’

মাদারীপুর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অবস্) জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘লিবিয়ার বন্দিশালায় এক তরুণের মৃত্যুর খবর আমরা নিহত ব্যক্তির স্বজনদের মাধ্যমে জানতে পেয়েছি। নিহত ব্যক্তির পরিবার পুলিশের কাছে এ বিষয়ে আইনি যেকোনো সহযোগিতা চাইলে তা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে দালালদের বিষয়ে পুলিশের জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ পেলেই তাঁদের গ্রেপ্তার করা হবে।’

দালালের প্রলোভনে পড়ে অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার এই প্রতিযোগিতা বন্ধে সবাইকে সচেতন হওয়ার অনুরোধ জানান পুলিশের ওই কর্মকর্তা।