
সমবয়সী অন্য শিশুরা যখন ক্লাস শুরুর অপেক্ষায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক তখন পায়ে শিকল পরা আরেক শিশু হেঁটে যাচ্ছে। সঙ্গে আছেন শিশুটির বাবা। স্কুলপড়ুয়া সব ছেলেমেয়ে শিকল পরা ছেলেটির দিকে তাকিয়ে আছে। মঙ্গলবার সকালে কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের আগরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে এ দৃশ্য চোখে পড়ে।
শিকলে বাঁধা অবস্থায় কুলিয়ারচরের রামদী ইউনিয়নের আগরপুর মধ্যপাড়া এলাকার শিশু রিফাত মিয়ার (১০) জীবন চলছে। মানসিক প্রতিবন্ধী ধারণা করে তার মা–বাবা এক বছর ধরে তার পায়ে শিকল বেঁধে রেখেছেন। অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে না পারায় শিকলে বাঁধা অবস্থাতেই তার খাওয়াদাওয়া ও প্রাত্যহিক সব কাজ চলছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মোবারক মিয়া ও নিমা আক্তার দম্পতির ছেলে রিফাত মিয়া। ছোটবেলায় তেমন বোঝা না গেলেও শিশুটি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার অস্বাভাবিক আচরণ নজরে পড়ে। দুই বছর ধরে সে অন্য শিশুদের সঙ্গে মিশতে গেলেই তাদের মারধর করে, বিরক্ত করে। নিজের বাড়ি ছাড়াও প্রতিবেশীদের বাড়িতে ঢুকে জিনিসপত্র ভাঙচুর করে। মাঝেমধ্যে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। নিরুপায় হয়ে মা–বাবা তাকে শিকলে বেঁধে রাখার সিদ্ধান্ত নেন। বাড়িতে থাকলে শিকলসহ তালা দিয়ে শিশুটিকে আটকে রাখা হয়। বাইরে গেলে বাবা মোবারক সারাক্ষণ শিশুটির সঙ্গে থাকেন। তবে সব সময় তার পায়ে শিকল লাগানো থাকে।
মঙ্গলবার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, আগরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে রামদী ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে সরকারি ভিজিএফের ১০ কেজি চাল নিতে আসেন মোবারক মিয়া। বাড়িতে অন্যদের অস্থির করে ফেলবে বলে শিশু রিফাতকেও শিকলে বাঁধা অবস্থায় বাবা সঙ্গে নিয়ে আসেন।
স্থানীয় লোকজন জানান, মোবারক মিয়ার পাঁচ সন্তান। এর মধ্যে চার ছেলে ও এক মেয়ে। রিফাত দ্বিতীয় সন্তান। তাঁর বড় সন্তান মোশারফ (১৫) শারীরিক প্রতিবন্ধী। সে বাড়িতেই থাকে। তৃতীয় সন্তান আরাফাত আগরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ছাত্র। মেয়ে সাদিয়া আক্তারের বয়স তিন বছর। দুই মাস আগে তাঁদের সাইমন মিয়া নামে আরেকটি ছেলে হয়েছে।
মোবারক মিয়া বলেন, ‘বড় ছেলে শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়ে দীর্ঘদিন ধরে ঘরে পড়ে আছে। অন্যের সাহায্য ছাড়া নিজে চলাফেরা করতে পারে না। তাকে নিয়ে আমাদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। এর মধ্যে দ্বিতীয় ছেলে কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন হওয়ায় আমাদের জীবনটা আরও কঠিন হয়ে গেছে। এখন তাদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’
মোবারক জানান, তিনি অন্যের জমিতে কৃষিশ্রমিকের কাজ করে কোনোরকমে জীবিকা নির্বাহ করেন। দুই অসুস্থ সন্তানকে সঠিক সময়ে পর্যাপ্ত চিকিৎসা দিতে পারেননি। কিশোরগঞ্জ জেলাসহ বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসক ও কবিরাজ দেখিয়েছেন। কিন্তু টাকার অভাবে চিকিৎসা বেশি দূর এগোয়নি। বড় ছেলেটা শান্ত থাকলেও ছোট ছেলে রিফাত খুব অস্থির। সুযোগ পেলেই অন্যের ক্ষতি করাসহ ঘর থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তাই নিরুপায় হয়ে এক বছর ধরে তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। অভাবের সংসারে দুই প্রতিবন্ধী শিশুর লালন-পালন করা তাঁদের জন্য কষ্টকর হয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে কুলিয়ারচর উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাকিল আহমদ বলেন, ‘আমি জানতে পেরেছি, মোবারক মিয়ার একটি সন্তান স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে। শিশু রিফাতও স্কুলে পড়ত, যদি সে সুস্থ হতো। তবে তাকে উপযুক্ত চিকিৎসা দিলে হয়তো সে সুস্থ হতে পারে। সমাজের বিত্তবান লোকজনসহ সরকারের পক্ষ থেকে এই পরিবারের পাশে দাঁড়ানো উচিত।’