
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় কাস্টমস কর্মী আবু রায়হান তালুকদার (৪০) হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
বাড়ির কেয়ারটেকার (দেখভালকারী) রাজু মির্জা (১৯) স্বীকার করেছেন, তিনি টাকা আত্মসাতের জন্য তাঁকে (রায়হান) হত্যা করেন। প্রথমে তিনি দুধের সঙ্গে ২০টি ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে রায়হানকে পান করান। অচেতন হওয়ার পর তাঁর মাথায় লোহার রড দিয়ে আঘাত করেন। পরে তাঁর সহযোগী সোহেল মির্জা ওরফে জিতুলকে (২০) ডেকে এনে লাশ ১৫ টুকরা করে ব্যাগ ও কাপড়ে পেঁচিয়ে বাড়ির পাশে পুকুরে ফেলে দেন। ওই দুজনের জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ এ তথ্য জানিয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে ময়মনসিংহের আদালতে রাজু মির্জা ও সোহেল মির্জাকে হাজির করা হয়। জ্যেষ্ঠ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইকবাল হোসেনের আদালতে দুজনের জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। এর আগে গত মঙ্গলবার রাতে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশন এলাকা থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
নিহত আবু রায়হান তালুকদার ফুলবাড়িয়া উপজেলার এনায়েতপুর ইউনিয়নের সোয়াইতপুর গ্রামের মৃত ছিদ্দিক তালুকদারের ছেলে। তিনি ঢাকার কমলাপুরে কাস্টমসের নিরাপত্তা শাখায় সেপাই হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
আসামি রাজু মির্জার বাড়ি সোয়াইতপুর গ্রামে। তিনি চার বছর ধরে আবু রায়হান তালুকদারের বাড়ির কেয়ারটেকার হিসেবে কাজ করছিলেন। তিনি আবু রায়হানের মা রাহেলা খাতুনকে দেখাশোনা করতেন। দীর্ঘদিন সঙ্গে থাকার সুযোগে রাজু পরিবারের আর্থিক লেনদেন ও মূল্যবান সামগ্রীর তথ্য জানতেন।
জবানবন্দিতে রাজু বলেন, টাকার লোভে ২৪ জুলাই রাতে পরিকল্পনা অনুযায়ী দুধের সঙ্গে ২০টি ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে আবু রায়হানকে পান করান। ওষুধ খাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আবু রায়হান গভীর অচেতন হয়ে পড়েন। এরপর রাজু লোহার রড দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করে তাঁকে হত্যা করেন এবং ঘরের ভেতরে থাকা কিছু টাকা ও মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করেন। তিনি নিহত ব্যক্তির ব্যবহৃত আইফোন নিয়ে ঢাকায় চলে যান এবং ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেন। এ ছাড়া রায়হানের নিখোঁজ থাকার সময়ে তাঁর মোবাইল ব্যাংকিং ও ব্যাংক কার্ড ব্যবহার করে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা উত্তোলন করেন রাজু মির্জা।
রাজু আরও জানান, হত্যাকাণ্ডের পর তিনি সোহেল মির্জাকে ডেকে আনেন। দুজনে মিলে মরদেহটি ঘরেই চাপাতি দিয়ে ১৫ খণ্ড করেন। সেগুলো তিনটি ব্যাগ ও কাপড়ে পেঁচিয়ে আবু রায়হানের বাড়ি থেকে প্রায় ৩০০ গজ পূর্বে একটি পরিত্যক্ত ডোবার ঝোপের ভেতর ফেলে আসেন। মরদেহ লুকিয়ে ফেলার পর ঘরের মেঝে ও বাথরুম পরিষ্কার করতে তারা ডিটারজেন্ট, হ্যান্ডওয়াশ ও হারপিক ব্যবহার করেন।
২ আগস্ট বিকেলে নিখোঁজের ৯ দিন পর রায়হান তালুকদারের বাড়ির পেছনের একটি পরিত্যক্ত পুকুর থেকে তিনটি ট্রাভেল ব্যাগ ও চাদরে প্যাঁচানো অবস্থায় তাঁর ১৫ টুকরা মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ৪ আগস্ট নিহত ব্যক্তির বড় ভাই নুরুল ইসলাম বাদী হয়ে থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। এজাহারে অভিযোগ করা হয়, টাকা ও সম্পত্তি ভোগদখলের লোভে কেয়ারটেকার রাজু মির্জা, তাঁর বন্ধু সোহেল মির্জা ওরফে জিতুল ও অজ্ঞাতনামা আসামিরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে ডোবায় ফেলে রেখে যান।
এখন পর্যন্ত এ দুজনের বাইরে আর কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য ছিল নিহত ব্যক্তির টাকা আত্মসাৎ। ঘটনার পরপর নিহত ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ (জব্দ) করে দেওয়া হয়। তাঁরা ব্যাংক কার্ড ও মোবাইল ব্যাংকিং থেকে টাকা বেশি পরিমাণ টাকা উত্তোলন করতে পারেননি।মো. আবদুল্লাহ আল মামুন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ), ময়মনসিংহ
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, বাড়ির বিশ্বস্ত কেয়ারটেকার রাজু টাকার লোভে একাই হত্যা করেন। লাশ গুম করার জন্য বন্ধুর সহযোগিতা নেন। এখন পর্যন্ত এ দুজনের বাইরে আর কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য ছিল নিহত ব্যক্তির টাকা আত্মসাৎ। ঘটনার পরপর নিহত ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ (জব্দ) করে দেওয়া হয়। তাঁরা ব্যাংক কার্ড ও মোবাইল ব্যাংকিং থেকে টাকা বেশি পরিমাণ টাকা উত্তোলন করতে পারেননি। দুজন আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন। পরে তাঁদের দুজনকে কারাগারে পাঠানো হয়।