
‘হাটে এখন ১৫-১৬ টাকা কেজি দরে মরিচ বেচতেছি। অথচ জমি থেকে এক কেজি মরিচ তুলতিই শ্রমিককে দেওয়া লাগে ১০ থেকে ১২ টাকা। এর সঙ্গে হাটে আনা ও বাড়িতে ফেরার খরচ আছে কেজিতে আরও ৩-৪ টাকা। তাহলে মরিচ বেইচ্যা খালি তোলার আর আনার খরচই কোনোরকমে উঠতেছে। সার, বীজ, ওষুধ আর জমির বর্গার (ভাড়া) খরচ তো পুরাটাই লস।’
কথাগুলো বলছিলেন পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার বায়া গ্রামের কৃষক আইয়ুব আলী সরদার। ভালো ফলনের মধ্যেও কাঁচা মরিচের দাম পড়ে যাওয়ায় লোকসানের শঙ্কায় রয়েছেন তিনি। তাঁর মতো উপজেলার হাজারো মরিচচাষির অবস্থাও এখন একই।
দেশের সবজিভান্ডার হিসেবে পরিচিত সাঁথিয়া উপজেলায় এবার কাঁচা মরিচের ব্যাপক ফলন হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে বাজারে সরবরাহও বেড়েছে। ফলে দাম কমে যাওয়ায় বাম্পার ফলনেও কৃষকের মুখে হাসি নেই।
গতকাল বৃহস্পতিবার উপজেলার বায়া, শামুকজানি, ছেঁচানিয়া, ঘুঘুদহসহ বিভিন্ন এলাকার মরিচের খেত ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি জমিতেই প্রচুর মরিচ ধরেছে। গাছ থেকে মরিচ সংগ্রহে ব্যস্ত কৃষকেরা। তবে তাঁদের চোখেমুখে স্বস্তির ছাপ নেই।
কৃষকেরা জানান, মরিচ না তুললে গাছের ক্ষতি হয় এবং পরবর্তী ফলন কমে যেতে পারে। তাই বাধ্য হয়ে লোকসান দিয়েই মরিচ তুলছেন তাঁরা। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকের পাশাপাশি বাড়ির নারী সদস্য ও শিক্ষার্থীরাও মরিচ তোলার কাজে যুক্ত হচ্ছেন।
ছেঁচানিয়া গ্রামের কৃষক আরিফ হোসেন বলেন, ‘গাছে ঝুমাঝুম মরিচ ধরিছে। না তুললি গাছ নষ্ট হবি। কিন্তু যে দামে বেচতেছি, তাতে লাভ তো দূরের কথা, খরচও উঠতেছে না।’
কৃষক ও ব্যবসায়ীরা জানান, কয়েক বছর ধরেই মরিচের বাজার নিয়ে চাষিদের অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হচ্ছে। কোনো বছর ফলন কম হলে দাম বাড়ে, আবার উৎপাদন বেশি হলে দাম পড়ে যায়। গত বছরের এ সময়ে কাঁচা মরিচের দাম ১১০ থেকে ১২০ টাকা কেজি পর্যন্ত উঠেছিল। তবে বৃষ্টির কারণে গাছে রোগ দেখা দেওয়ায় ফলন কমে গিয়েছিল। ফলে দাম বেশি থাকলেও কৃষকেরা কাঙ্ক্ষিত লাভ পাননি।
সাঁথিয়া উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ২ হাজার ২৭০ হেক্টর জমিতে কাঁচা মরিচের আবাদ হয়েছে। এ বছর মোট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৩ হাজার ৮৩৫ টন। প্রতি হেক্টরে ১০ দশমিক ৫ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
সাঁথিয়ায় সাধারণত মে মাস থেকে কাঁচা মরিচের ফলন শুরু হয়। মে থেকে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত খেত থেকে মরিচ পাওয়া যায়। সেই হিসাবে বর্তমানে উপজেলায় কাঁচা মরিচের ভরা মৌসুম চলছে। আগামী আরও প্রায় দুই মাস উৎপাদন অব্যাহত থাকবে।
সাঁথিয়ার করমজা চতুরহাটে গিয়ে দেখা যায়, হাটে প্রচুর পরিমাণে কাঁচা মরিচ উঠছে। মরিচচাষি ও ব্যবসায়ীরা জানান, সপ্তাহ দুয়েক আগেও এই হাটে ৩০ থেকে ৪০ টাকা কেজি দরে মরিচ বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে সরবরাহ বেশি থাকায় দাম কমে গেছে।
সাঁথিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় মরিচের ফলন খুব ভালো হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে কৃষকেরা ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে মরিচ বিক্রি করে ভালো দাম পেয়েছেন। এখন সরবরাহ বেশি থাকায় দাম কমেছে। তবে সামনে আবার দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।