গাজীপুর

এক পায়ে বেঁচে থাকার লড়াই 

শহরের রাজবাড়ী মাঠ। শিশুরা খেলছে, মঞ্চে বাজছে গান। কিন্তু এর মধ্যেও মন খারাপ করে মাঠের এক কোণে বসেছিল শামিম।

ক্রাচে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শামীম। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গাজীপুরের রাজবাড়ি মাঠে
 ছবি: আল-আমিন

শেষ বিকেলের সূর্যটা দিগন্তে মিলিয়ে যেতেই একটু একটু করে নেমে এসেছে অন্ধকার। ঘড়ির কাঁটায় সময় তখন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ছয়টা। চারদিকে হালকা ঠান্ডা বাতাস। শীত শীত ভাব। এর মধ্যেই মানুষে গমগম করছে গাজীপুর শহরের রাজবাড়ী মাঠ। ‘বিজয় মেলা’ উপলক্ষে পুরো মাঠ সেজেছে রঙিন সাজে। মাঠের এক পাশে তৈরি করা হয়েছে বিশাল মঞ্চ। মঞ্চের চারপাশে বসেছে ফুচকা-চটপটিসহ নানা পণ্যের দোকান। বাজছে গান। দর্শনার্থীরা কেউ ঘুরে দেখছেন, কেউবা শুনছেন গান। সব মিলিয়ে এক আনন্দময় পরিবেশ।

কিন্তু এর মধ্যেই হঠাৎ চোখ আটকে গেল শারীরিক প্রতিবন্ধী শামিমের (১২) দিকে। তার একটি পা নেই। ক্রাচে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাঠের এক কোণে। বন্ধু, পরিচিতজনেরা মেলায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। আনন্দ করছে। কেউ কেউ সেজেছে রঙিন সাজে। কিন্তু এসব রং বা আনন্দের কোনো ছোঁয়াই লাগছে না তার মনে। ক্লান্ত পায়ে দাঁড়িয়ে আছে মাঠের এক কোণে। মেলায় আনন্দের পরিবর্তে জীবিকার তাগিদে ছুটতে হচ্ছে মানুষের দ্বারে দ্বারে। ভিক্ষা চাইতে গিয়ে কখনো কখনো হতে হচ্ছে অপমানিত, কখনোবা মিলছে তির্যক মন্তব্য।

মেলায় মাঠের এক পাশে শিশুদের জন্য স্থাপন করা হয়েছে নাগরদোলা। দিনভর ভিক্ষা শেষে কিছুটা ক্লান্ত শামিম। অন্যান্য শিশুকে নাগরদোলায় চড়তে দেখে তারও ইচ্ছা হয়। ক্রাচে ভর দিয়ে সে ধীরে ধীরে এসে দাঁড়ায় টিকিট কাউন্টারের পাশে। টিকিটের মূল্য ৩০ টাকা। শামিমের কাছে আছে ১০ টাকা। শামিম দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিকে ১০ টাকা নিয়েই নাগরদোলায় সুযোগ দিতে অনুরোধ করে। কিন্তু ওই ব্যক্তি কিছুতেই রাজি হচ্ছেন না। একপর্যায়ে নাগরদোলায় না চড়েই ফিরে আসে সে।

এ বিষয়ে কথা হলে প্রতিবেদকের কাছে শামিম বলছিল, ‘সারা দিন ভিক্ষা কইর‌্যা যা পাইছিলাম, সন্ধ্যায় মা আইস্যা নিয়া গেছে। হেল লাইগ্যা আমার কাছে পুরা (৩০) ট্যাকা নাই। আমি অনেকবার কইছিলাম উডায়তে, বলছি পরে ট্যাকা দিয়া দিমু। কিন্তু রাজি অয় নাই। হেল লাইগ্যা ফিরা আইছি।’

কিছুটা সময় গল্প হলে শামিম জানায়, তার পুরো নাম মো. শামিম হাসান। তার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের নান্দাইল এলাকায়। বাবা ইস্তাফিল দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। এর পর থেকেই মা রুমা আক্তার আর বড় তিন বোনকে নিয়ে সে ভাড়া থাকে গাজীপুরের ভোগড়া বাইপাস এলাকায়। প্রায় দেড় বছর আগে ট্রেন থেকে নামতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে ট্রেনের চাপায় তার বাঁ পা কাটা যায়। এর পর থেকেই সে প্রতিবন্ধী। মা চাকরি করেন পোশাক কারখানায়। বোনেরাও কর্মোপযোগী নয়। তাই সংসারের হাল ধরতে সে নিজেই ভিক্ষার পথ বেছে নেয়। 

শামিম আরও জানায়, অভাবের তাড়নায় তৃতীয় শ্রেণির গণ্ডি পেরোতেই তাকে নামতে হয়েছে কাজে। একসময় রেলস্টেশন বা নগরের রাস্তাঘাটে পানি বিক্রি করত সে। কিন্তু এর মধ্যেই হঠাৎ একদিন ট্রেন থেকে পড়ে গিয়ে সে পা হারায়। প্রতিদিন ভিক্ষা করে তার আয় ২০০–২৫০ টাকা। মা আর তার আয় দিয়েই চলছে সংসার।