
রাত থেকেই আট বছরের শিশু মুসার পেটে সমস্যা শুরু হয়। ভোর হতেই পাতলা পায়খানা। সকাল সাড়ে সাতটার দিকে তাকে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১৫ থেকে ২০ মিনিট পরপরই তাঁকে টয়লেটে নিয়ে যেতে হচ্ছে। ছেলের এমন অবস্থায় উদ্বিগ্ন তার মা ময়না বেগম।
ময়না বেগমের বাড়ি বরগুনা সদর উপজেলার বদরখালী ইউনিয়নে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে তাঁর ছেলেকে হাসপাতালে ভর্তি করেন। তিনি বলেন, ‘শুনছি হাম বাড়ছে, এখন আবার ডায়রিয়া। কী যে হবে, বুঝতে পারছি না।’
হামের পাশাপাশি বরগুনায় এখন ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে শ্বাসকষ্ট ও ঠান্ডাজনিত রোগ নিয়ে হাসপাতালে ভিড় করছেন অনেকেই। এমন পরিস্থিতিতে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
২৫০ শয্যার বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের পরিসংখ্যান বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১৪৮ জন চিকিৎসা নিয়েছেন, এর মধ্যে ৭২টিই শিশু। ঠান্ডাজনিত ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ৭১৭ শিশু। গত সোমবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ২৫ জন রোগী। গত তিন মাসে এই হাসপাতালে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ হাজার ২১৮ জন।
জেলায় ডেঙ্গুর প্রকোপও পুরোপুরি থামেনি। গত বছর বরগুনায় ৯ হাজার ৭৪৯ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন, মারা যান ১৫ জন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ৬০ জন।
হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, পুরোনো ভবনের দ্বিতীয় তলায় বেডের পাশাপাশি মেঝেতেও বিছানা করে ডায়রিয়া রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
সদর উপজেলার কেওড়াবুনিয়া ইউনিয়নের তুলসীবাড়িয়া এলাকার বাসিন্দা সবুজ মিয়া তাঁর ছয় বছরের ছেলে সিয়ামকে জ্বর ও পাতলা পায়খানার উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করেছেন। বেড না পেয়ে ডায়রিয়া ওয়ার্ডের মেঝেতেই চিকিৎসা চলছে। সবুজ মিয়া বলেন, হাসপাতাল থেকে শুধু স্যালাইন দেওয়া হয়েছে, অন্য ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।
জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৫৭ জন ডায়রিয়া রোগী বিভিন্ন হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছেন। গত এক সপ্তাহে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৮২ জন। আর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত জেলায় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৪৩০ জন।
বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা তাজকিয়া সিদ্দিকাহ বলেন, বাসি ও পচা খাবার খাওয়া, অতিরিক্ত গরম এবং অনিরাপদ পানি ব্যবহারের কারণে ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়ছে। সুপেয় পানির অভাব ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে টাইফয়েড, প্যারাটাইফয়েডসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগও ছড়িয়ে পড়ছে। রাতে পুকুর বা নদীর পানি দিয়ে ভাত সংরক্ষণ করে সকালে সেই ভাত খাওয়ার প্রবণতাও সংক্রমণ বাড়ানোর একটি কারণ বলে জানান তিনি।