লোডশেডিংয়ে বরফসংকট, সাগরে যেতে পারছেন না জেলেরা

পটুয়াখালীর কলাপাড়ার আন্ধারমানিক নদের ঘাটে অলস সময় কাটাচ্ছিলেন জেলে নাসির খান (৪০)। অথচ এ সময় তাঁর ইলিশ ধরার জন্য বঙ্গোপসাগরে থাকার কথা। কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে স্থানীয় বরফকলগুলো ঠিকমতো সচল না থাকায় বরফ উৎপাদন কমে গেছে। ট্রলারে সংরক্ষণের জন্য বরফ সংগ্রহ করতে না পারায় তিনি সাগরে যেতে পারেননি। তাঁর মতো অসংখ্য জেলে-মাঝিমাল্লা মাছ ধরতে সাগরে যেতে পারছেন না। লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে তাঁদের মাছ ধরায় ও জীবন-জীবিকায়।

জেলে নাসির খান প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের ট্রলারে তিনিসহ ১৫ জন জেলে ও মাঝিমাল্লা। ৪ দিনের জন্য ট্রলার নিয়ে সাগরে যেতে ১২০টি ক্যান প্রয়োজন হয়। কিন্তু এক সপ্তাহ ধরে বরফকলগুলোতে ঘুরে তাঁরা পর্যাপ্ত বরফ পাচ্ছেন না। ১৫০ টাকার প্রতিটি ক্যান ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সেটাও আবার আগাম অনুরোধ জানিয়ে পাওয়া যাচ্ছে না। ১৮ হাজার টাকার বরফ এখন ৩৬ হাজার টাকা দিয়ে কিনলে তো আর সাগরে দ্বিগুণ মাছ পাওয়া যাবে না।

সাগরে জেলে ও মাঝিমাল্লারা সাধারণত ট্রলার নিয়ে ৪ দিন, ৭ দিন, ১০ দিন কিংবা ১৫ দিনের জন্য মাছ ধরার সফরে যান। মাছ ধরার পর সংরক্ষণের জন্য ট্রলারে করে তাঁরা প্রয়োজনীয় বরফ নিয়ে যান। আবার মাছ ধরে ফিরে এসে তা সংরক্ষণেও বরফের প্রয়োজন পড়ে। তবে বরফসংকটে এখন মাছ ধরতে যাওয়া জেলে ও মাঝিমাল্লার সংখ্যা কমে গেছে। আগে দিনে গড়ে আড়াই থেকে তিন হাজার জেলে সাগরে যেতেন, এখন যেতে পারেন ৭০০ থেকে ৮০০ জন। অর্থাৎ, ৭০ শতাংশের বেশি জেলের সাগরে যাওয়া হচ্ছে না।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, জেলায় প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৩০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৮৫ মেগাওয়াট। ঘাটতি আছে ৪৫ মেগাওয়াট। এ কারণে চাহিদার প্রায় ৬৫ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার আন্ধারমানিক নদের দুই পাড়ে অবস্থিত মহিপুর ও আলীপুর মৎস্যবন্দরে ছোট-বড় ৩৬টি বরফকল আছে। প্রতিটি বরফকলে ১২ থেকে ১৫ জন করে প্রায় ৫০০ জন শ্রমিক দিনমজুর হিসেবে কাজ করেন। বরফকল–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, দুই ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের পর দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছেন।

লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন প্রায় ৭০ শতাংশ কমেছে। কোনো কোনো বরফকল দিনে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ ক্যান বরফ উৎপাদন করতে পারছে। আবার কোনো কোনোটি সর্বোচ্চ ২০০ ক্যান পর্যন্ত উৎপাদন করছে। অথচ প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ হাজার ক্যান বরফের প্রয়োজন হয়। স্বাভাবিক উৎপাদনক্ষমতার তুলনায় বর্তমানে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ উৎপাদিত হচ্ছে।

মহিপুর ও আলীপুর মৎস্যবন্দরে ছোট-বড় ৩৬টি বরফকল আছে। প্রতিটি বরফকলে ১২ থেকে ১৫ জন করে প্রায় ৫০০ জন শ্রমিক দিনমজুর হিসেবে কাজ করেন। বরফকল–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, দুই ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের পর দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছেন।

মহিপুর মৎস্যবন্দর ও আড়ত মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সুমন দাস বলেন, ইলিশ মৌসুমে প্রতিদিন মহিপুর-আলীপুর বন্দর থেকে গড়ে ২০০টি ট্রলার সাগরে যায়। এখন বরফ উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে ৫০ থে‌কে ৬০‌টি, আবার কখনো ৩০‌টি ট্রলার সাগরে যাচ্ছে। গত ১৫ দিনে তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে বরফকলগুলো প্রায় অচল। এতে জেলে, ট্রলারমালিক, আড়তদার, মৎস্য ব্যবসায়ীসহ এক লাখ মানুষ ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এর নেতিবাচক প্রভাব জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়বে।

গত মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, মহিপুর ও আলীপুর মৎস্যবন্দরে সারি সারি ট্রলার বাঁধা। এসব ট্রলার সগরে যাওয়া কথা ছিল। একটি সূত্র বলছে, বরফের অভাবে এক সপ্তাহ ধরে এসব ট্রলার সাগরে যেতে পারছে না। প্রায় দেড় হাজার মাছ ধরার ট্রলার দুটি মৎস্যবন্দরে বাঁধা আছে।

বরফ তৈরির প্রক্রিয়ায় টানা ১২ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন বলে জানান মহিপুর বরফকল মালিক সমিতির সভাপতি ও গাজী আইস প্ল্যান্টের মালিক গাজী মজনু মিয়া। তিনি বলেন, তাঁরা দুই ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ পাচ্ছেন। এতে বরফ তৈরির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং প্রতিবারই প্রথম থেকে উৎপাদন শুরু করতে হচ্ছে। ফলে আগের দুই ঘণ্টা বরফকল সচল রাখতে যে বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে, তা কাজে আসছে না।

ইলিশ মৌসুমে প্রতিদিন মহিপুর-আলীপুর বন্দর থেকে গড়ে ২০০টি ট্রলার সাগরে যায়। এখন বরফ উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে ৫০ থে‌কে ৬০‌টি, আবার কখনো ৩০‌টি ট্রলার সাগরে যাচ্ছে। গত ১৫ দিনে তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে বরফকলগুলো প্রায় অচল।
সুমন দাস, মহিপুর মৎস্যবন্দর ও আড়ত মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক

মহিপুর মৎস্যবন্দরের বরফকল থেকে ট্রলারে বরফ তোলার কাজ করেন শ্রমিক মহাসীন মিয়া (৪৫)। বরফের প্রতিটি ক্যান ট্রলারে তুলে দিলে তিনি ২০ টাকা মজুরি পান। দিনে ৩০–৪০ ক্যান বরফ পরিবহন করে তাঁর আয় হতো ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা।

মহাসীন মিয়া জানান, ইলিশের মৌসুমে মহিপুর-আলীপুর মৎস্যবন্দরে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ শ্রমিক শুধু ট্রলারে বরফ পরিবহনের কাজ করেন। এখন কাজ প্রায় বন্ধ। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘এভাবে চলতে থাকলে সংসার চালামু ক্যামনে?’

মহিপুর–আলীপুর মৎস্যবন্দরের বরফকলের মালিকেরা নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ পাওয়ার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন। পটুয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আবুল কাশেম প্রথম আলোকে বলেন, বরফকলমালিকদের অনুরোধে বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। সেই সঙ্গে সামনের দিনগুলোতে বরফকলগুলো যাতে সচল থাকে, সেই ব্যবস্থা করা হবে।