রংপুরের বদরগঞ্জ থানা
রংপুরের বদরগঞ্জ থানা

‘স্যার, ও এমন চোর খালি ধরা পড়ে, জরিমানা দিতে দিতে আমার সব শেষ’

‘স্যার, দয়া করে ওর (ছেলের) একটা ব্যবস্থা করেন। গ্রামে চুরি করে। আর ও এমন চোর খালি ধরা পড়ে। সবাই বিচার বসায়, জরিমানা চায়। জরিমানা দিতে দিতে আমার সব শেষ। আর জরিমানা দেওয়ার উপায় নেই স্যার।’

কথাগুলো বলতে বলতে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন এক বাবা। ছেলের নেশা আর চুরির কাণ্ডে তিনি যে কতটা অসহায়, তা যেন আর আড়াল করতে পারছিলেন না। রংপুরের বদরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান জাহিদ সরকারের সামনে দাঁড়িয়ে এভাবেই নিজের কষ্টের কথা বলছিলেন ওই বাবা।

গ্রামটাত ছোট ছইলেরাও (ছেলেরাও) নেশা খায়। মোর ভালো ছইলটাও দুই বছর থাকি খারাপ হয়া গেইছে। মোর টাকা নাই, চিকিৎসাপাতি কইরবার পাও না। তোরা মোর ছইলটাক ভালো করি দেও।
অভিযুক্ত কিশোরের মা

ওই ব্যক্তি জানান, তাঁর ১৫ বছরের কিশোর ছেলেটি মাদকাসক্ত। গ্রামে প্রায়ই তার বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ ওঠে। একের পর এক জরিমানা দিতে গিয়ে পরিবারের শেষ সম্বল দুটি গরু ও দুটি ছাগলও বিক্রি করতে হয়েছে। এবার বাজারে ব্যাটারিচালিত রিকশা চুরি করতে গিয়ে জনতার হাতে ধরা পড়ে সে। মারধরের পর পুলিশ তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে।

আজ শুক্রবার দুপুরে বদরগঞ্জ থানায় কথা হয় ওই কিশোর, তার মা–বাবা ও ওসির সঙ্গে। মারধরের যন্ত্রণায় কিশোর ঠিকমতো কথা বলতে পারছিল না। চোখেমুখে ছিল আতঙ্ক। বারবার শুধু বলছিল, ‘আমি পানি খাব।’ হাঁটু সোজা করে দাঁড়ানোর শক্তিও যেন ছিল না তার। দুই পুলিশ সদস্য ধরে তাকে ওসির সামনে নিয়ে আসেন। ছেলের এমন অবস্থা দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন মা–বাবা। কীভাবে সন্তানকে এই জীবন থেকে ফিরিয়ে আনবেন, বুঝে উঠতে পারছিলেন না তাঁরা।

‘পরিচয় দিলে আমাকেও মারত’

আজ বেলা ১১টার দিকে বদরগঞ্জ হাটের হক সাহেবের মোড়ের পাশে নিজের ব্যাটারিচালিত রিকশা রেখে চা পান করছিলেন সমছের আলী। রিকশার চাবি লাগানোই ছিল। এই সুযোগে ওই কিশোর রিকশায় উঠে সেটি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। সমছের আলী দৌড়ে গিয়ে তাকে ধরে ফেলেন। তাঁর ‘চোর, চোর’ চিৎকারে হাটের আশপাশের লোকজন জড়ো হয়। একপর্যায়ে তাঁরা ওই কিশোরকে মারধর করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে।

ছেলেকে আটকের খবর পেয়ে থানায় ছুটে যান বাবা। ওসিকে জানান, ঘটনার সময় বাজারে একটি ভটভটিতে ভাড়ায় গরু পরিবহনের জন্য তুলছিলেন। তখন এক ব্যক্তি তাঁকে ছেলের রিকশা চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ার খবর দেন।

ওই কিশোরের বাবা বলেন, ‘শুনে সব ফেলে ছুটে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি, ছেলেটাকে সবাই মারতেছে। ভয়ে কাউকে নিজের পরিচয় না দিয়ে চলে এসেছি। পরিচয় দিলে মানুষ আমাকেও মারত। ওই বাচ্চা ছেলে আর কত মাইর হজম করবে স্যার? ওর দেহাত (শরীরে) কিচ্ছু নাই।’

ওসির সামনে ছেলের কাণ্ডের কথা বলতে গিয়ে বাবার কণ্ঠে ফুটে ওঠে দীর্ঘদিনের জমে থাকা অসহায়ত্ব। ছেলেকে নেশা ও চুরির পথ থেকে ফেরাতে না পারার কষ্ট তাঁকে এই পরিস্থিতিতে দাঁড় করিয়েছে।

‘দুইটা গরু, দুইটা ছাগল বিক্রি করেছি’

ওই কিশোরের বাবা জানান, তাঁর দুই ছেলে। বড় ছেলে ফেনীতে একটি বেসরকারি কারখানায় কাজ করেন। ছোট ছেলে গ্রামে পরিবারের সঙ্গে থাকত। মাদ্রাসায় পড়ত। একসময় সে ভালোই ছিল। কিন্তু গ্রামের মাদকাসক্ত ছেলেদের সঙ্গে মিশে ধীরে ধীরে নেশায় জড়িয়ে পড়ে।

বাবার অভিযোগ, তাঁদের গ্রামে অনেক ছেলে গাঁজা ও ইয়াবা সেবন করে। তাঁর ধারণা, গ্রামের ১৫ থেকে ২০ জন ছেলে এখন মাদকাসক্ত। তাদের সঙ্গে মিশেই তাঁর ছেলের জীবন বদলে গেছে। দুই বছর ধরে ছেলেকে নেশা থেকে ফেরানোর চেষ্টা করছেন তিনি, কিন্তু তাতে কাজ হয়নি। উল্টো বাড়ির জিনিসপত্র বিক্রি করে নেশা করে ছেলে। মাঝেমধ্যে গ্রামে তার বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ ওঠে।

বাবা বলেন, ‘সে এমন চোর যেখানে চুরি করে, সেখানেই ধরা পড়ে। বিচার-সালিসে জরিমানা দিতে দিতে দুইটা পালিত গরু আর দুইটা ছাগল বিক্রি করেছি। বাড়িতে আর কোনো সম্বল নাই বিক্রি করার।’

‘মোর ছেলেটাক ভালো করি দেও’

বাবার মতো ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে একই রকম দুশ্চিন্তায় ভুগছেন মা। অসহায় কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘বাবা, মুই তো ছেলেটার সাথে পারনু না। গ্রামটাত ছোট ছইলেরাও (ছেলেরাও) নেশা খায়। মোর ভালো ছইলটাও দুই বছর থাকি খারাপ হয়া গেইছে। মোর টাকা নাই, চিকিৎসাপাতি কইরবার পাও না। তোরা মোর ছইলটাক ভালো করি দেও।’

দুই বছর ধরে ছেলেকে নেশা থেকে ফেরানোর চেষ্টা, চুরির অভিযোগে বারবার জরিমানা প্রদান, পরিবারের শেষ সম্বল বিক্রি—সবশেষে জনতার মারধর। একের পর এক ঘটনায় দিশাহারা এই দম্পতি। এখন তাঁদের একটাই চাওয়া, চিকিৎসার মাধ্যমে ছেলে সুস্থ হয়ে উঠুক, ফিরে আসুক স্বাভাবিক জীবনে।

পুনর্বাসনকেন্দ্রে পাঠাল পুলিশ

মা–বাবার আকুতি শুনে ওই কিশোরকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছেন বদরগঞ্জ থানার ওসি হাসান জাহিদ সরকার। তিনি শিশুটিকে রংপুর নগরের আইডিয়াল মোড় এলাকায় অবস্থিত সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠান। সেখানে ওই কিশোরের বিনা মূল্যে চিকিৎসা চলবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি হাসান জাহিদ সরকার প্রথম আলোকে বলেন, চুরি করলেও শিশু আইনে ওই কিশোরের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। ওই কিশোরকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর উদ্দেশ্যে পুনর্বাসনকেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। ওই কিশোরের গ্রামের মাদক কারবারিদের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান ওসি।