এক মাসের ব্যবধানে আবারও ডুবেছে চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকা। টানা ভারী বৃষ্টিতে নগরের বিভিন্ন এলাকা গোড়ালি থেকে হাঁটু পরিমাণ পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও কোমরসমান পানিও হয়েছে। বৃষ্টিতে এমন পরিস্থিতি হওয়ায় আজ সোমবার সকালে বিপাকে পড়েছেন অফিস-আদালতসহ কর্মস্থলমুখী মানুষ।
গতকাল রোববার থেকে চট্টগ্রামে বৃষ্টি শুরু হয়। তবে তা ছিল হালকা থেকে মাঝারি। কিন্তু গতকাল রাত থেকে শুরু হয় ভারী বর্ষণ। আজ সকাল ১০টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভারী বর্ষণ অব্যাহত রয়েছে।
ভবনের নিচতলায় গাড়ি রাখার জায়গায় হাঁটু পরিমাণ পানি। বাইরের সড়কে কোমরসমান পানি। এই পানি ডিঙিয়ে কর্মস্থলে যাওয়া সম্ভব হয়নি।মোহাম্মদ তারেক, বাসিন্দা, কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকা
এবারের বৃষ্টিতে নগরের কাতালগঞ্জ, পাঁচলাইশ, মুরাদপুর, ফরিদারপাড়া, চকবাজার, আগ্রাবাদ, উত্তর কাট্টলী, দক্ষিণ নালাপাড়া, জামালখানসহ বেশ কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। গত জুলাই মাসেও চট্টগ্রামে টানা চার থেকে পাঁচ দিন জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছিল। এর আগে এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে নগরের প্রবর্তক মোড়ে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা হয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ শুরু হয়েছে। আরও দুই থেকে তিন দিন এমন বৃষ্টি হতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস কর্মকর্তা মো. ইসমাইল ভূঁইয়া জানান, গতকাল সকাল ৯টা থেকে আজ সকাল ৯টা পর্যন্ত—২৪ ঘণ্টায় ১৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে আজ সকাল ৬টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে ১০৯ মিলিমিটার, যা অতি ভারী বর্ষণ। বঙ্গোপসাগরের লঘুচাপ ও মৌসুম বায়ু সক্রিয় থাকায় আরও দু-তিন দিন বৃষ্টি হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতার ভোগান্তিতে পড়তে হয় নগরের কাতালগঞ্জ ও পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের। হিজড়া খালের কাজ শেষ না হওয়ায় এসব এলাকায় দ্রুত পানি জমে যায়, যা আটকে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সোমবারের বৃষ্টিতেও একই অবস্থা হয়েছে।
নগরের কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকায় আজ সকালে প্রায় কোমরসমান পানি দেখা গেছে। জলাবদ্ধতার কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা জরুরি প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হতে দুর্ভোগে পড়েছেন। মোহাম্মদ তারেক নামের এক বাসিন্দা বলেন, ‘ভবনের নিচতলায় গাড়ি রাখার জায়গায় হাঁটু পরিমাণ পানি। বাইরের সড়কে কোমরসমান পানি। এই পানি ডিঙিয়ে কর্মস্থলে যাওয়া সম্ভব হয়নি।’
কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকার মতো জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে পাশের পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকায়ও। সেখানেও কোমরসমান পানি জমেছে। ফারজানা আক্তার নামের এক কলেজশিক্ষক জানান, প্রতিবার বৃষ্টিতে এলাকায় পানি জমে যাচ্ছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। যে পরিমাণ পানি জমেছে, তাতে কলেজে যাওয়া সম্ভব হয়নি তাঁর। ছেলেও স্কুলে যেতে পারেনি।
চট্টগ্রাম নগরের দক্ষিণ নালাপাড়ায় প্রায় কোমরসমান পানি ডিঙিয়ে অফিসে এসেছেন শিপ্রা দত্ত নামের এক বেসরকারি চাকরিজীবী। এ জন্য বাড়তি রিকশাভাড়া গুনতে হয়েছে তাঁকে। তিনি বলেন, ‘রাস্তায় পানির তীব্র স্রোত। আর কোমরসমান পানি জমে যাওয়ায় হেঁটে যাওয়া সম্ভব নয়। বাসা থেকে নিউমার্কেট মোড়ে যেতে স্বাভাবিক সময়ে ভাড়া ৩০ থেকে ৪০ টাকা। আজ ৪০ টাকার পরিবর্তে রিকশা ভাড়া নিয়েছে ১৫০ টাকা। শুধু পানি জমে থাকা ১০০ ফুট রাস্তা পার করার জন্য ১০০ টাকা নিয়েছে।’
একই ধরনের পরিস্থিতিতে পড়েছেন নগরের ফরিদার পাড়ার বাসিন্দা আবু জাহেদ। তিনি জানান, ফরিদারপাড়া থেকে বহদ্দারহাট আসতে ২০ টাকা রিকশাভাড়া। কিন্তু আজ নিয়েছে ৫০ টাকা। না দিয়েও উপায় নেই। হাঁটু পরিমাণ পানি ডিঙিয়ে চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই বাড়তি ভাড়া দিয়ে অফিসে এসেছেন।
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও পানি উন্নয়ন বোর্ড মিলে ১৪ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এসব প্রকল্পের সিংহভাগ কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। তবু ভারী বৃষ্টি হলেই আগের মতোই তলিয়ে যাচ্ছে নগর, আর দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
নগরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার প্রসঙ্গে সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, সকালে ভারী বৃষ্টির সঙ্গে জোয়ারের পানির চাপ ছিল। তাই কিছু কিছু এলাকায় পানি জমেছে। পানি নিষ্কাশনের জন্য সিটি করপোরেশনের কর্মীরা কাজ করছেন। বৃষ্টি থামলে পানি দ্রুত নেমে যাবে।