ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট থেকে ৪৬টি গরুর চামড়া নিয়ে আসেন শম্ভুগঞ্জের হাটে রামলাল রবিদাস। কিন্তু কোনো পাইকার কিংবা ট্যানারি প্রতিনিধি না থাকায় চামড়া স্তূপ করে কাগজ দিয়ে ঢেকে চলে যাচ্ছিলেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আজ বড় বাজার হওয়ার কথা। কিন্তু ব্যাপারী নাই একজনও, মাল বেচতে পারতাছি না। ব্যাপারী থাকলে তো মাল বেচতাম। চামড়া নিয়া আমরা এখন বেকায়দায় আছি।’
রামলাল রবিদাস আরও বলেন, ‘১০০ থেকে ৭০০ টাকায় কাঁচা চামড়া কিনে ২০০ টাকার লবণ ও ১০০ টাকার শ্রমিক খরচ করতে হয়েছে। এখন বাজারে কেনার লোক নাই। দুই–তিন বছর ধইরা খালি লস দিতাছি। এমন চললে ব্যবসা বন্ধ কইরা দিতে হবে। এ ছাড়া তো আর কিছু করার নাই।’
বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় চামড়ার হাট শহরতলির শম্ভুগঞ্জে। আজ শনিবার হাট বসার কথা ছিল। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া নিয়ে অপেক্ষা করলেও ট্যানারিমালিক ও পাইকারের দেখা মেলেনি। বাজারজুড়ে পর্যাপ্ত চামড়া থাকলেও বিক্রি না হওয়ায় চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। আজ শনিবার সকাল ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত শম্ভুগঞ্জ চামড়াবাজারে অবস্থান করে দেখা গেছে এমন চিত্র।
কোরবানির পর এ হাটে বিভাগের ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা জেলা ছাড়াও সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ জেলার কিছু এলাকা থেকেও চামড়া নিয়ে আসেন ব্যবসায়ীরা। এ হাট থেকে ঢাকার ট্যানারিমালিকেরা চামড়া কিনে নিয়ে যান। শনিবার সাপ্তাহিক চামড়ার হাট থাকলে ঈদ উপলক্ষে মঙ্গলবারও বিশেষ হাট বসে। এ বছর ঢাকার ভেতরে গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
আজ সকালে হাটে গিয়ে দেখা যায়, বাইরের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিক্রির জন্য চামড়া নিয়ে আসছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা করে চামড়া এনে দেখেন, হাটে নেই পাইকার ও ট্যানারি প্রতিনিধি। বাধ্য হয়ে অনেকে কাগজ কিনে তাতে স্তূপ করে রেখে যাচ্ছিলেন। বাজারে থাকা ছোট ছোট ব্যবসায়ীর কাছেও অনেকে বিক্রির জন্য দরদাম করছিলেন।
জেলার তারাকান্দা উপজেলার ঢাকির কান্দা গ্রামের সুরেশ রবিদাস এক দশক ধরে চামড়ার ব্যবসায় জড়িত। তিনি এবার ৮০টি গরুর চামড়া কিনে এনেছেন। গত বছর ৪২ হাজার টাকা লস করতে হয় চামড়ায়। এ বছরও লস গেলে আর চামড়া কিনবেন না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর লাভের আশায় চামড়া কিনি, কিন্তু লস করতে হয়। গত বছরও গরু বেইচ্চা লস ভরছি। চামড়ার এই অবস্থা কেরে, চামড়া কী বিদেশ নেয় না। বাজারে আয়াই ব্যাপারীরা জোট কইরা ফেলায় আমারে চামড়ার দামই কয় না। জুতার দাম এত, চামড়ার দাম হস্তা কে? একটা জুতার দাম ১ হাজার ৫০০–২ হাজার আর চামড়ার দাম ১০০–২০০। আমরার চামড়া ন্যায্যমূল্যে নেইন যে আর না অইলে চামড়া কিনা বাদ যাইবো।’
একই উপজেলার মাঝিয়ালী এলাকা থেকে খাসির চামড়া একটি বস্তায় ভরে বিক্রির জন্য নিয়ে এলেও তা নিয়ে ফেরত যান সুগ্রীম রবিদাস। তিনি বলেন, ‘ব্যবসা করতেছি ৪০ বছর ধইরা। আগে তো বাজার ভালো আছিল। আগে ছোট খাসির চামড়া কিনলেও মনে করুন যেন ১০০–১২৫ টাকা বেচন গেছে। ১৫০ টাকাও বেচন গেছে। বড় বড় খাসির চামড়া ১৫০–২০০ টাকাও বিহি হইছে। আর অহন ২০ টাকা, ৩০ টাকাই বেচন যায় না। এহন চামড়া কিইনা আমরা কী করব?’ তিনি আরও বলেন, ৪০টা চামড়া কিনলেও বিক্রির জন্য ১৬টা চামড়া এনেছেন। একেকটা চামড়ায় লবণ গেছে ১০-১২ টাকার। বাকি চামড়া কেটে কুকুরকে খাইয়েছেন। বাজারে যেগুলো এনেছেন, সেগুলোর দামও কেউ বলে না।
জেলার ঈশ্বরগঞ্জের হারুয়া থেকে ২০টি চামড়া নিয়ে আসেন সুধন রবিদাস। তিনি বলেন, ‘বাজার জমবে মনে কইরা মাল লইয়া আইছি, কিন্তু ব্যাপারী আইলো না। অহন আমরা চামড়া কী করবাম। অহন চামড়া টাল দিয়া থইয়া যাইতাছি। পরে যেদিন বাজার জমবো, হেইদিন আবার আসমু।’
স্থানীয় পাইকার মো. আবদুল কাদির বলেন, ‘আমি দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে ব্যবসা করি। সরকার দাম নির্ধারণ করে দিলেও আমরা কাঙ্ক্ষিত দাম পাই না। প্রতিবছর দাম লস করতে করতে এখন সব সম্বল শেষ হয়ে পথে বসার উপক্রম। ট্যানারিমালিকেরা যদি যথাযথ মূল্যটা দেন, তাহলে হয়তো আমরা আসল নিয়া ঘরে ফিরতে পারব। আর না হইলে যে অবস্থা আমাদের পথে বসা ছাড়া আর কোনো নাই।’
ট্যানারিমালিক ও পাইকার না আসায় হাট জমেনি জানিয়ে হাটের ইজারাদারে প্রতিনিধি মো. মোস্তফা কামাল বলেন, ‘আমরা ট্যানারিমালিকদের আহ্বান জানিয়েছি এখানে এসে চামড়া কেনার জন্য, যাতে চামড়া ব্যবসায়ীরা সঠিক মূল্য পান। এ বিষয়ে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি। কারণ, ট্যানারিরা একটা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এখানে চামড়ার মূল্য একেবারে কমিয়ে দেয়। এতে প্রান্তিক ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা গত বছরও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এইবার সরকারের ঠিক করে দেওয়া মূল্য দিয়ে ট্যানারিমালিকেরা চামড়া কিনবেন বলে আমরা আশা করছি।’
ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান বলেন, ‘বাধ্য হয়ে যে চামড়া বিক্রি করতে হবে, এটি রোধ করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আমরা স্টেকহোল্ডারদের প্রশিক্ষণ দিয়েছি। যাঁরা মৌসুমি ব্যবসায়ী, তাঁদের বিনা মূল্যে লবণ দেওয়া হয়েছে। লবণ দেওয়া চামড়া ৩০ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। কম দাম হলে তো তাঁরা চামড়া বিক্রি করবেন না। সে জন্যই সরকারের পক্ষ থেকে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা যেন ন্যায্যমূল্য পান এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ যেন নষ্ট না হয়। যাঁরা চামড়া কেনেন, তাঁদের বলা হয়েছে যেন সরকারনির্ধারিত মূল্যে চামড়া কেনা হয়।’