চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার বৈতরণি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে দুটি সড়ক নির্মাণ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে বন বিভাগ। তবে আপত্তি সত্ত্বেও সড়ক নির্মাণের প্রক্রিয়া বন্ধ হয়নি। বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, আট মাস আগে সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। এখানে সড়ক হলে বনভূমি দখল, অবৈধ অনুপ্রবেশ, গাছ কাটা ও বনসম্পদ পাচারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতায় আইআরআইডিপি-৩ প্রকল্পের অধীনে সাতকানিয়ার দোহাজারী রেঞ্জের বৈতরণি বিটের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে দুটি সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সড়ক দুটি হলো বড়ুয়া পাড়া সড়ক এবং সুয়ালক সেতু থেকে সিদ্দিক খামার সড়ক। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় দেড় কোটি টাকা।
বন বিভাগের নথি অনুযায়ী, বৈতরণি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের আয়তন ১ হাজার ৫৩১ একর। এ বনাঞ্চলের সুয়ালক সেতু থেকে সিদ্দিক খামার সড়কের দৈর্ঘ্য ৬০০ মিটার। এর মধ্যে প্রায় ১৭০ মিটার সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতর পড়েছে। অন্যদিকে বড়ুয়া পাড়া সড়কের দৈর্ঘ্য ৫৭০ মিটার। পুরো সড়কটিই সংরক্ষিত বনভূমির ওপর নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো প্রথম আলোকে বলেন, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে রাস্তা হলে সেটি বনের জন্য হুমকি তৈরি করবে। বন্য প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বনের ভেতর দিয়ে রাস্তা হলে সেখানে মানুষের যাতায়াত বাড়ে। অনেক ক্ষেত্রে এর সুযোগ নিয়ে বন দখল, গাছ কাটা ও বনসম্পদ পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়। সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে এ ধরনের সড়ক নির্মাণের সুযোগ নেই।
সুয়ালক সেতু থেকে সিদ্দিকের খামারের দিকে এগোলেই চারপাশে পাহাড় ও বন। সড়কের দুই পাশে গাছপালা, ঝোপঝাড় ও টিলা। কোথাও উঁচু পাহাড়, কোথাও সমতল ভূমি। এর মধ্য দিয়েই নেওয়া হচ্ছে নতুন সড়ক। গত সোমবার বিকেলে সরেজমিনে বৈতরণি এলাকায় গিয়ে এ দৃশ্য দেখা যায়।
সড়ক নির্মাণের জন্য কয়েকটি জায়গায় টিলার মাটি কাটা হয়েছে। টিলার গায়ে এখনো সেই কাটার দাগ রয়েছে। কোথাও মাটি কেটে সমান করা হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে সড়কের ভিত্তি। কয়েকটি অংশে ফেলা হয়েছে বালু ও ইটের খোয়া।
প্রায় আট মাস আগে শুরু হয় সড়কের কাজ। সুয়ালক সেতু থেকে প্রায় ৪৫০ মিটার পর্যন্ত অংশে কাজ হয়েছে। ওই অংশে মাটি কেটে প্রায় ১২ ফুট প্রশস্ত করে সড়ক তৈরি করা হয়েছে। পরে বালু ও ইটের খোয়া দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। এরপরই শুরু হয়েছে সংরক্ষিত বনাঞ্চল। কাঁঠাল বারিছা টিলার পাদদেশ ঘেঁষে থাকা প্রায় ১৭০ মিটার অংশে এসে থেমে গেছে কাজ। ওই অংশে মাটি কেটে সড়কের কাঠামো তৈরি করা হলেও ভরাট করা হয়নি। বন বিভাগের বাধার পর প্রায় তিন মাস ধরে সেখানে কাজ বন্ধ রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কের আশপাশে বড় কোনো বসতি নেই। তিন থেকে চারটি বসতবাড়ি ছাড়া পুরো এলাকা পাহাড় ও বনভূমিতে ঘেরা। একই চিত্র দেখা গেছে বড়ুয়া পাড়া সড়কেও। চারদিকে শুধু বন, পাহাড় আর গাছপালা।
স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে সড়ক দুটি দরকার। সেখানে রাস্তাঘাটের অবস্থা খুব খারাপ। অসুস্থ মানুষ চলাচল করতে গিয়ে দুর্ভোগে পড়েন।মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন আহমেদ, সংসদ সদস্য
সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণের বিষয়ে শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছে বন বিভাগ। গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর দোহাজারী রেঞ্জ কর্মকর্তা সাতকানিয়া উপজেলা প্রকৌশলীকে চিঠি দিয়ে নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার অনুরোধ জানান। চিঠিতে বলা হয়, বৈতরণি মৌজার সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে বনভূমিতে অবৈধ প্রবেশ, দখল, গাছ কাটা ও বনসম্পদ পাচারের ঝুঁকি তৈরি হবে।
এর পরও কাজ চলেছে বলে অভিযোগ বন বিভাগের। গত ১৭ মে বন বিভাগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সড়ক নির্মাণের জন্য সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পাহাড়ি ঢাল কাটা হয়েছে। এতে প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতির পরিবর্তন হয়েছে। বর্ষায় ভূমিধসের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি বনের গভীরতা ও বনায়নের ক্ষতি হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সড়ক নির্মাণ হলে বনাঞ্চল খণ্ডিত হয়ে যাবে। এতে বন্য প্রাণীর চলাচল বাধাগ্রস্ত হবে এবং তাদের আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. সোয়েল রানা প্রথম আলোকে বলেন, আইন অনুযায়ী সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণের সুযোগ নেই। এ বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে বন অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
বন বিভাগের আপত্তির পর এলজিইডি কাজ বন্ধ রাখার কথা জানালেও বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন আহমেদ তৎপর হয়েছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সংসদ সদস্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে সড়ক নির্মাণের বিষয়ে আধা সরকারি পত্র (ডিও লেটার) দিয়েছেন।
এ বিষয়ে এলজিইডি চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবদুল মতিন প্রথম আলোকে বলেন, এলজিইডির এই সড়কের দুটি প্যাকেজ রয়েছে। এর কিছু অংশ বন বিভাগের জায়গার মধ্যে পড়েছে। এ বিষয়ে বন বিভাগ আপত্তি জানিয়েছে। আপত্তির পর ঠিকাদারকে কাজ না করতে বলা হয়েছে।
নির্বাহী প্রকৌশলী আরও বলেন, ‘এর মধ্যে স্থানীয় সংসদ সদস্য আমাকে বলেছেন, জনস্বার্থে রাস্তাটি প্রয়োজন, তাই কাজটি করতে হবে। আমি তাঁকে জানিয়েছি, বন বিভাগ যেহেতু আপত্তি করেছে, আমরা সেখানে কাজ করতে পারি না। বন বিভাগের দেওয়া চিঠিটিও তাঁকে পাঠিয়ে দিয়েছি। এরপর সংসদ সদস্য জানিয়েছেন, তিনি বিষয়টি নিয়ে বন বিভাগের সঙ্গে কথা বলবেন। পরে তিনি বন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন বলেও জানিয়েছেন। আমাকে ছবিও পাঠিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত আমরা লিখিত কোনো অনুমোদন পাইনি। তাই ঠিকাদারকে লিখিতভাবে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়নি।’
রাস্তার প্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গে নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল মতিন বলেন, এটি নতুন রাস্তা নয়। এলাকায় আগে থেকেই একটি কাঁচা রাস্তা আছে। মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সেটি ব্যবহার করছে। কাঁচা রাস্তা হওয়ায় দুর্ভোগের কারণে স্থানীয়বাসিন্দারা এটি পাকা করার আবেদন করেছেন। তিনি বলেন, এলাকাবাসীর প্রয়োজন বিবেচনা করেই প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের দরপত্র হয়েছে। প্রকল্পপত্রও প্রায় তিন বছর আগে তৈরি করা হয়েছিল।
বনের ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণ হলে জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। বন খণ্ডিত হবে। বাড়বে জবরদখল ও গাছ কাটার প্রবণতা।মোহাম্মদ কামাল হোসাইন, অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
বন বিভাগের আপত্তির পরও সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ ও ডিও লেটার দেওয়ার বিষয়ে কথা হয় চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-সাতকানিয়ার একাংশ) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন আহমেদের সঙ্গে। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে সড়ক দুটি দরকার। সেখানে রাস্তাঘাটের অবস্থা খুব খারাপ। অসুস্থ মানুষ চলাচল করতে গিয়ে দুর্ভোগে পড়েন। এ ছাড়া সড়ক নির্মাণের প্রকল্পটি প্রায় এক বছর আগে নেওয়া হয়েছে। রাস্তার কাজ প্রায় ৭০ শতাংশ শেষ হয়ে গেছে। এখন অল্প কিছু অংশ বাকি আছে।
বনভূমির অংশ নিয়ে প্রশ্ন করলে সংসদ সদস্য বলেন, ‘বনের জায়গার মধ্যে যদি সমস্যা থাকে, তাহলে ওই অংশ বাদ দিয়ে বাকি কাজ করা যেতে পারে। আমি ডিও লেটার দিয়েছি মানুষের স্বার্থে। এলাকার উন্নয়নের ধারাবাহিকতা যেন বন্ধ না হয়, সে জন্য বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের নজরে আনা হয়েছে।’
সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসাইন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বনের ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণ হলে জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। বন খণ্ডিত হবে। বাড়বে অবৈধ প্রবেশ, জবরদখল ও গাছ কাটার প্রবণতা।
মোহাম্মদ কামাল হোসাইন আরও বলেন, বনভূমি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। একজন জনপ্রতিনিধির দায়িত্বও বন রক্ষা করা। তাই কোনো সংসদ সদস্যের উদ্যোগে সংরক্ষিত বনের ভেতর সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সরকার যখন প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা ও পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্ব দিচ্ছে, তখন সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতর এমন অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ সেই লক্ষ্যকে ব্যাহত করবে।