
বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গড়ে উঠছে বিতর্ক ক্লাব, হচ্ছে কর্মশালা ও প্রতিযোগিতা। বাংলা বিতর্কের পাশাপাশি শুরু হয়েছে ইংরেজি বিতর্কের চর্চাও।
কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলায় কয়েক বছর আগেও স্কুল-কলেজে নিয়মিত বিতর্কের আয়োজন কম ছিল। এখন সে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গড়ে উঠছে বিতর্ক ক্লাব, হচ্ছে কর্মশালা ও প্রতিযোগিতা। বাংলা বিতর্কের পাশাপাশি শুরু হয়েছে ইংরেজি বিতর্কের চর্চাও।
আয়োজক ও বিতর্ক–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিভিন্ন সংগঠন ও বিদ্যালয়গুলোর ধারাবাহিক উদ্যোগে ভৈরবে বিতর্কের সুদিন ফিরছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে ভৈরব উপজেলার ৩০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে অন্তত ১৩টিতে নিয়মিত বিতর্কচর্চা হচ্ছে। আরও সাতটিতে বিতর্কচর্চা প্রতিযোগিতা–নির্ভর।
ভৈরব আইডিয়াল স্কুল, ভৈরব উদয়ন স্কুল, এমবিশন পাবলিক স্কুল, ব্লু বার্ড স্কুল, ভৈরব পৌর পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও আফছর উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ে গড়ে উঠেছে বিতর্ক ক্লাব। এসব ক্লাবে সদস্য ২০ থেকে ৪০ জন। কলেজ পর্যায়েও বিতর্কের চর্চা চলছে। ভৈরব সরকারি হাজি আসমত কলেজে দুই বছর আগে বিতর্ক ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রফিকুল ইসলাম মহিলা কলেজ ও জেড রহমান প্রিমিয়ার ব্যাংক স্কুল অ্যান্ড কলেজেও নিয়মিত বিতর্ক হয়।
ভৈরবের বাসিন্দা সৈয়দ মারুফ আহমেদ তেজগাঁও কলেজ ডিবেটিং ক্লাবের বিতর্ক ও কর্মশালাবিষয়ক সম্পাদক। তিনি স্থানীয় বিতার্কিকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।
মারুফ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষার্থীরা এখন শুধু প্রতিযোগিতার জন্য বিতর্ক করছে না, নিয়মিত অনুশীলন করছে, দল গঠন করছে এবং নিজেদের মধ্যে বিতর্কের আয়োজন করছে। এতে তারা প্রশ্ন করতে, বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয় বিশ্লেষণ করতে এবং দেশ ও সমাজ নিয়ে ভাবতে শিখছে। গত সেপ্টেম্বরে উপজেলা মিলনায়তনে পার্লামেন্টারি বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়েছে বলেও জানান তিনি।
শিক্ষার্থীরা এখন শুধু প্রতিযোগিতার জন্য বিতর্ক করছে না, নিয়মিত অনুশীলন করছে, দল গঠন করছে এবং নিজেদের মধ্যে বিতর্কের আয়োজন করছে। এতে তারা প্রশ্ন করতে, বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয় বিশ্লেষণ করতে এবং দেশ ও সমাজ নিয়ে ভাবতে শিখছে।সৈয়দ মারুফ আহমেদ, ভৈরবের বাসিন্দা ও বিতার্কিক
বিতর্ক–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নব্বইয়ের দশকে ভৈরবে বিতর্কের ভালো চর্চা ছিল। তখন স্কুল-কলেজের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও শিশু সংগঠনও বিতর্কের দল গঠন করত। তবে ২০০০ সালের পর এ চর্চায় ভাটা পড়ে।
২০২১ সালে বিতর্কচর্চা ফেরাতে উদ্যোগ নেয় প্রথম আলোর পাঠক সংগঠন ভৈরব বন্ধুসভা। ওই বছর ১৬টি বিদ্যালয় ও চারটি কলেজ নিয়ে বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে সংগঠনটি। এরপর প্রতিবছর প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হচ্ছে। চলতি মাসেও চলছে প্রতিযোগিতা। ৬ অক্টোবরের বিতর্ক কর্মশালায় অংশ নেন ৩৮ জন। এ ছাড়া ২০১৮ ও ২০২৩ সালে ভৈরবে অনুষ্ঠিত হয় পুষ্টি-প্রথম আলো বিতর্ক উৎসব।
ভৈরব বন্ধুসভার সভাপতি জান্নাতুল মিশু বলেন, কয়েক বছরে শিক্ষার্থীদের বিতর্কের মান উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাঁদের আয়োজনগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। দর্শকদের কাছ থেকেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়।
২০২১ সালের ১২ ও ১৩ অক্টোবর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দুই দিনের কর্মশালায় ২০টি বিদ্যালয়ের ১৬০ জনকে বিতর্কের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বন্ধুসভার পাশাপাশি ভৈরব বইমেলা পরিষদ, নিরাপদ সড়ক চাই ভৈরব শাখা ও দুর্নীতি দমন প্রতিরোধ কমিটি নিয়মিত বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করছে। উপজেলা প্রশাসনও বিভিন্ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। বইমেলা পরিষদ সনাতনী বিতর্কের পাশাপাশি রম্য বিতর্ক এবং কাকলি খেলাঘর আসর পার্লামেন্টারি বিতর্কের আয়োজন করে। ভৈরব শিল্পকলা একাডেমি চলতি বছরের ৩ সেপ্টেম্বর বারোয়ারি বিতর্কের আয়োজন করে। শিল্পকলা একাডেমিতে প্রতি শুক্রবার বিতর্কের ক্লাস হয়। বর্তমানে সেখানে শিক্ষার্থী ১৬ জন।
ভৈরব আইডিয়াল স্কুলের শিক্ষার্থী মনভিলা হক নিয়মিত বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। সে বলেছে, ‘নানা মঞ্চে বিতর্ক করার সুযোগ পাচ্ছি। স্কুলেও চর্চার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। নিজের স্কুলের পাশাপাশি অন্য স্কুলের শিক্ষার্থীরাও এখন আমাকে বিতার্কিক হিসেবে চেনে।’
ভৈরব আইডিয়াল স্কুল, ভৈরব উদয়ন স্কুল ও ব্লু বার্ড স্কুলে বাংলা বিতর্কের পাশাপাশি ইংরেজি বিতর্কের চর্চা হচ্ছে। গত ৯ ও ১১ জুন ভৈরব উদয়ন স্কুল ও ব্লু বার্ড স্কুলের মধ্যে প্রীতি ইংরেজি বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে গত ২ মে এ বিষয়ে কর্মশালা হয়।
ভৈরব উদয়ন স্কুলের পরিচালক ও বিতর্ক সংগঠক সাগর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, নিয়মিত চর্চা ধরে রাখতেই তাঁরা ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেছেন। ক্লাবের সদস্য ৪০ জন। প্রতিবছর নিজেদের মধ্যে বিতর্ক উৎসব হয়। চলতি মাসের উৎসবে আটটি দলে ২৪ জন বিতার্কিক অংশ নেয়।
ব্লু বার্ড স্কুলের বিতর্ক ক্লাবে সদস্য ২১ জন। প্রশিক্ষক নাফিস রহমান বলেন, মাসে দুবার ক্লাবের সদস্যরা প্রীতি বিতর্কের আয়োজন করে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে উচ্চবিদ্যালয়, সরকারি কাদির বখস পাইলট উচ্চবিদ্যালয়, কালিপুর হাইস্কুল, হাজি জহির উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়, শিমুলকান্দি হাইস্কুল ও কালিকাপ্রসাদ হাইস্কুল ও জেড রহমান প্রিমিয়ার ব্যাংক স্কুলে শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে বিতর্কের দল গঠন ও চর্চা চলছে।
কয়েকজন মানুষের ধারাবাহিক উদ্যোগ, বিশেষ করে বন্ধুসভার ভূমিকা ভৈরবে বিতর্কের সুদিন ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করেছে বলে জানান আফছর উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম। বিতার্কিক তৈরি করতে গত বছরের ১২ ও ১৩ অক্টোবর বিদ্যালয়ে কর্মশালার আয়োজন করার কথা জানান তিনি।
বিতর্কভিত্তিক সংগঠন বিতর্ক মঞ্চের প্রধান উদ্যোক্তা রকিবুল হান্নান বলেন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিতর্ক ক্লাব গড়ে ওঠা ইতিবাচক। তবে নিয়মিত চর্চার জন্য বাজেট, শিক্ষকদের সহযোগিতা ও ভালো প্রশিক্ষক প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা যেন কোনো অজুহাতে চর্চার বাইরে না থাকে, সেদিকে নজর দিতে হবে। এসব ঘাটতি থাকলে বিতর্কের নতুন জোয়ার দীর্ঘস্থায়ী না–ও হতে পারে।
বিভিন্ন বিতর্ক আয়োজনে আমন্ত্রণ পেলে উপস্থিত থাকার চেষ্টা করেন ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে এম মামুনুর রশীদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ভৈরবে বিতর্কের সুদিন ফিরে আসার বিষয়টি তিনি কাছ থেকে উপভোগ করছেন। এ পরিবেশ ধরে রাখতে উপজেলা প্রশাসনের সব ধরনের সহযোগিতা থাকবে।