
একটি মাম্মি সফেদাগাছের দাম চাওয়া হচ্ছে ৩০ হাজার টাকা। ফলসহ পার্সিমনগাছের দাম ২৫ হাজার টাকা শুনে চোখ কপালে উঠতে পারে। তবে খুলনার বৃক্ষমেলায় এবার এমন বিদেশি ও দুর্লভ ফলগাছের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে ক্রেতাদের। শুধু বিদেশি ফলগাছ নয়, এবারের মেলায় সামগ্রিকভাবেই চারার বিক্রি বেড়েছে। ইতিমধ্যে মেলায় কোটি টাকার চারা বিক্রি হয়েছে।
দেশি ফল, বনজ, ঔষধি ও শোভাবর্ধনকারী গাছের পাশাপাশি এবারের মেলায় জায়গা করে বিদেশি জাতের নানা ফলের গাছ। পাশাপাশি বিক্রি হচ্ছে নানা দেশি জাতের গাছ। মেলা শুরুর পর থেকে গতকাল শুক্রবার রাত পর্যন্ত দেশি-বিদেশি মিলিয়ে ৬৭ হাজার ১০২টি চারা বিক্রি হয়েছে। এসব চারার মোট বিক্রিমূল্য ৯৫ লাখ ৯২ হাজার টাকা।
গত বছরের পুরো মেলায় ৪৩ হাজার ৭২১টি চারা বিক্রি হয়েছিল, যার দাম ছিল প্রায় ৫৯ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। সেই হিসাবে গত বছরের পুরো মেলার চেয়ে এবার ২৩ হাজার ৩৮১টি চারা বেশি বিক্রি হয়েছে। বিক্রির পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৫৪ শতাংশ। মেলার দিন যত গড়াচ্ছে, বিক্রিও বাড়ছে। খুলনা জেলা প্রশাসন ও সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের আয়োজনে খুলনা সার্কিট হাউস মাঠে ১১ জুন শুরু হওয়া এ মেলা চলবে ১১ আগস্ট পর্যন্ত।
মেলায় গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত বনজ ৫ হাজার ৭১৩টি, ফলদ ১৮ হাজার ৮৭৩টি, ঔষধি ৩ হাজার ৩৭৬টি, শোভাবর্ধনকারী ১৭ হাজার ৬৩৫টি, ফুল ১৬ হাজার ৬৫৩টি এবং অন্যান্য ৪ হাজার ৮৫২টি চারা বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে ফলদ গাছ। গত বছর বিক্রি হয়েছিল বনজ ২ হাজার ১৭৭টি, ফলদ ১২ হাজার ৬১৯টি, ঔষধি ২ হাজার ৫৮১টি, শোভাবর্ধনকারী ১২ হাজার ৮৬৮টি, ফুল ১০ হাজার ৪২৭টি ও অন্যান্য ৩ হাজার ৪৯টি চারা।
মেলার বিভিন্ন স্টলে দেশি-বিদেশি নানা ধরনের ফলের গাছ ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে। পার্সিমন, রামবুটান, পিচ, অ্যাভোকাডো, জয়তুন, কোরিয়ান জাম, মাম্মি সফেদা, আচচাইরু, বেলজিয়াম লিচু, ভিয়েতনামি লাল কাঁঠাল, ভিয়েতনামি পিংক কাঁঠাল, ডুরিয়ান, থাই লংগান, কফিগাছ, হরিমন-৯৯ আপেল, থাই বাতাবি, রুবি লংগান, কাজুবাদাম, লটকন, লাল শরিফা, আলুবোখারা, পিমপম লংগান, সুপার ভায়োগা, সাদা লংগান, নাশপাতিসহ নানা গাছ বিক্রি হচ্ছে মেলায়।
করিম নার্সারির স্টলে গাছে ধরে থাকা পার্সিমনও দৃষ্টি কাড়ছে ক্রেতাদের। নার্সারিটির একজন স্বত্বাধিকারী মো. আকবার বিন ওসমানী বলেন, এবার বিক্রি ভালো। মানুষ বিদেশি নানা প্রজাতির গাছের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। ইতিমধ্যে তাঁদের ২ হাজার ৩৬০টি গাছ বিক্রি হয়েছে। তিনি বলেন, একেকটি মাম্মি সফেদাগাছের দাম চাওয়া হচ্ছে ৩০ হাজার টাকা। ফলসহ রামবুটান ২৫ হাজার, আপেল ২৬ হাজার, পার্সিমন ২৫ হাজার, পিচ ফল ১৫ হাজার, বেলজিয়াম লিচু ১২ হাজার, বলিভিয়ার আচচাইরু ১৫ হাজার, ডুরিয়ান ১২ হাজার এবং রুবি লংগান ৬ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ক্রেতারা তুলনামূলক কম দামের গাছ বেশি কিনতে চান বলে জানান মালঞ্চ পুষ্পকেন্দ্র নার্সারির মালিক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, এবার বেচাকেনা খারাপ নয়; বরং গতবারের চেয়ে ভালো। তবে মেলাটি শিববাড়ি মোড়ের জিয়া হল চত্বরে হলে বিক্রি আরও বেশি হতো। সন্ধ্যার পর অনেকে এখানে আসতে চান না।
শনিবার দুপুরে দুই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে মেলায় এসেছিলেন রুকাইয়া ইয়াসমিন। তিনি ছয়টি গাছ কিনেছেন। রুকাইয়া বলেন, কিছু গাছের দাম কম মনে হয়েছে। মেলায় অনেক জানা-অজানা গাছ দেখতে পেয়েছেন। বিদেশি অনেক ফলের গাছ দেখেছেন, যেগুলো সম্পর্কে জানলেও আগে কখনো গাছ দেখেননি।
শুধু গাছ কেনাবেচা নয়, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের সঙ্গেও মেলার দর্শনার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের ম্যানগ্রোভ সিলভিকালচার বিভাগের ম্যানগ্রোভ নার্সারি। মেলার প্রবেশমুখে থাকা এ স্টলের সামনে ছোট ছোট সাদা কাঁকড়া, লাল কাঁকড়া, সুন্দরী, ভাতকাঠি, পশুরসহ বিভিন্ন জাতের ম্যানগ্রোভ গাছের চারা লাগানো আছে। প্রতিটি গাছের নামের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক নামও উল্লেখ করা হয়েছে। এতে সুন্দরবনের বিভিন্ন গাছ সম্পর্কে জানার সুযোগ পাচ্ছেন দর্শনার্থীরা।
একই স্টলে ফরমালিনে সংরক্ষিত সুন্দরবনের বিভিন্ন গাছ ও প্রাণীর নমুনাও প্রদর্শন করা হয়েছে। পশুরগাছের ফল, বহেলা ফল, কাঁকড়া ফল, সুন্দরী ফলের পাশাপাশি মাছ, সাপ, শামুক, ঝিনুক, চিংড়ি, কাঁকড়া এবং বাঘের মাথার খুলি দেখা যাচ্ছে।
স্টলটি ঘুরে দেখছিলেন শিক্ষার্থী অনিকা তাসনিম সুবহা। তিনি বলেন, সুন্দরবনের অনেক অজানা প্রাণী ও আগে না দেখা গাছের ফল সম্পর্কে জানতে পেরেছেন। ভালো লাগছে।
শাওন নামের আরেক দর্শনার্থী বলেন, সংরক্ষিত জিনিসগুলো দেখতে সুন্দর। এগুলো দেখলে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে কিছুটা হলেও ধারণা পাওয়া যায়।