খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়া ইউনিয়নের দুর্গম নারাইছড়ির একটি পাড়া। এখান থেকে ভোটকেন্দ্রের দূরত্ব পাঁচ কিলোমিটার
খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়া ইউনিয়নের দুর্গম নারাইছড়ির একটি পাড়া। এখান থেকে ভোটকেন্দ্রের দূরত্ব পাঁচ কিলোমিটার

দুর্গম পাহাড়ের বাসিন্দা চাইহ্লাউ মারমারা যে কারণে ভোট দিতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন

খাগড়াছড়ির প্রত্যন্ত এলাকাগুলোয় অনেক ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে যেতে পাঁচ থেকে ছয় কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এই দূরত্ব পাড়ি দিতে বেশ কয়েক ঘণ্টা লেগে যায়। যানবাহন ঠিক করে ভোটকেন্দ্রে যেতে যে ভাড়া লাগে, তা–ও দেওয়ার সামর্থ্য নেই বেশির ভাগ ভোটারের। এ অবস্থায় অনেকেই ভোট দিতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

ভোটকেন্দ্র ছয় কিলোমিটার দূরে। ভোটের দিন মূল সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে। হেঁটে যাওয়া কষ্টসাধ্য, মোটরসাইকেল ছাড়া বিকল্প নেই। তাতেও আসা-যাওয়ার ভাড়া জনপ্রতি ৩০০ টাকা। খাগড়াছড়ি সদরের সাতভাইয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা দিনমজুর চাইহ্লাউ মারমার ঘরে ভোটার সাতজন। সবাই ভোট দিতে গেলে খরচ পড়বে ২ হাজার ১০০ টাকা, যা এই পরিবারের পক্ষে বহন করা প্রায় অসম্ভব। তাই ভোট দিতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তই নিয়েছেন তাঁরা।

এমন বাস্তবতা শুধু একটি গ্রামের নয়। খাগড়াছড়ির দুর্গম পাহাড়ি ও সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোয় ভোটকেন্দ্রের দূরত্ব, যাতায়াত ব্যয় ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি ভোটারদের ভোট দেওয়ার বিষয়ে অনাগ্রহী করে তুলেছে।

নির্বাচন কমিশনে পাঠানো জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার তালিকা অনুযায়ী, খাগড়াছড়ি সংসদীয় আসনের (২৯৮) ২০৩টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১৮৯টিই ঝুঁকিপূর্ণ এবং এর মধ্যে ৬৮টি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। সবচেয়ে বেশি ১৬টি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র রয়েছে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলায়। এরপর রামগড়, গুইমারা, মানিকছড়ি, মহালছড়িসহ প্রায় সব উপজেলাতেই ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র রয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এই সংসদীয় আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ৫৪ হাজার ১১৪ জন। এর মধ্যে ৬৮টি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ভোটার ১ লাখ ৪৯ হাজার ৬২৬ জন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূগোল, জনবসতি ও জীবনধারা বিবেচনায় নিয়ে কেন্দ্র বিন্যাস জরুরি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রথাগত নেতৃত্বের সঙ্গে আগাম আলোচনা ছাড়া কেন্দ্র নির্ধারণ করলে ভোটার অংশগ্রহণ কমতেই থাকবে।
অধ্যাপক বোধিসত্ত্ব দেওয়ান, সাবেক সভাপতি, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)

দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়া ইউনিয়নের নারাইছড়ি কেন্দ্রের ভোটার সুজন বিকাশ চাকমা বলেন, ‘সমতলের মতো করে পাহাড়ে ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়। অথচ এখানে মানুষ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। জীবন-জীবিকার বাস্তবতা বিবেচনায় না নেওয়ায় ভোট দিতে অনীহা বাড়ছে।’

খাগড়াছড়ির গুইমারার দূরছড়ি পাড়া থেকে ভোটকেন্দ্রের দূরত্ব আট কিলোমিটার। এখানকার অনেক ভোটার এমন দূরত্ব পাড়ি দিয়ে ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন

লক্ষ্মীছড়ির সাবেক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সুপার জ্যোতি চাকমা বলেন, অনেক ভোটারকে ভোটের আগের দিনই কেন্দ্রের আশপাশে স্বজনের বাড়িতে এসে থাকতে হয়। বয়স্ক, প্রতিবন্ধী ও অসুস্থ মানুষ চাইলেও ভোট দিতে পারেন না।

মাটিরাঙ্গা উপজেলার সাপমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ৪টি ওয়ার্ডের ৩৫টি পাড়ার ভোটাররা ভোট দেন। এখানকার ভোটার কল্যাণী ত্রিপুরা ও হরিচন্দ্র ত্রিপুরা বলেন, ‘প্রায় পাঁচ কিলোমিটার হেঁটে কেন্দ্রে যেতে হয়। কাছাকাছি নতুন কেন্দ্র হলে অনেকেই ভোট দিতে পারতেন। আশা করি, ভবিষ্যতে কাছাকাছি ভোটকেন্দ্র হবে।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক বোধিসত্ত্ব দেওয়ান বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূগোল, জনবসতি ও জীবনধারা বিবেচনায় নিয়ে কেন্দ্র বিন্যাস জরুরি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রথাগত নেতৃত্বের সঙ্গে আগাম আলোচনা ছাড়া কেন্দ্র নির্ধারণ করলে ভোটার অংশগ্রহণ কমতেই থাকবে।

খাগড়াছড়ি জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এস এম শাহাদাত হোসেন বলেন, পুলিশের বিশেষ শাখার পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে কেন্দ্রগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে এবং শান্তিপূর্ণ ভোট গ্রহণে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

খাগড়াছড়ি পুলিশ সুপার সায়েম মির্জা মাহমুদ বলেন, অধিক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোয় অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হবে।