
দখল-দূষণ ও ভরাটে বিপন্ন হওয়ার পথে কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া একসময়ের স্রোতস্বিনী নরসুন্দা নদী। নদীর পাড় দখলের প্রতিযোগিতা চলছে দীর্ঘদিন ধরে। এবার নদীর মাঝখানেও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টা চলছে। সম্প্রতি জেলা শহরের পুরানথানা এলাকায় একটি অংশে নরসুন্দা নদীর প্রায় মাঝখানে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে ছয়তলা বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যদিও মালিকপক্ষের দাবি, পৌরসভার অনুমোদন নিয়ে নিজেদের জায়গাতেই ভবন নির্মাণ করা হবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক দিন ধরেই নদীর মধ্যে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজ চলছে। নিচের অংশ সম্পন্ন করে ওপরের প্রাচীর ওঠালে জনসাধারণের দৃষ্টিগোচর হয়। এ–সংক্রান্ত একটি ছবি শুক্রবার রাত থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে (ভাইরাল) পড়লে সমালোচনার ঝড় ওঠে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষ ও জনপ্রতিনিধির নজরে আসে।
গতকাল শনিবার স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান কিশোরগঞ্জ-১ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য মাজহারুল ইসলাম। এ সময় তিনি জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে নরসুন্দা নদী দখল করে নির্মাণাধীন এ স্থাপনা দুই দিনের মধ্যে উচ্ছেদের জন্য মালিকপক্ষকে সময় বেঁধে দেন। সংসদ সদস্য মাজহারুল ইসলাম বলেন, নরসুন্দা শুধু একটি নদী নয়, এটি কিশোরগঞ্জবাসীর আবেগ ও ঐতিহ্যের একটি অংশ। এই নদী দখল করে কোনো ধরনের অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টা করলে সেটা শক্ত হাতে প্রতিহত করা হবে। এ ছাড়া নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে ও নদীর অস্তিত্ব রক্ষার্থে সব ধরনের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে।
ভবনটি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন পুরানথানা এলাকার বাসিন্দা কামরুল হাসান ও হুমায়ুন কবির নামে দুই ব্যক্তি। তাঁরা জানান, মূল ভবনের কাজ এখনো শুরু হয়নি, শুধু সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে।
কামরুল হাসান জানান, সিএস ও আরওআর মূলে তিনি নিজ মালিকানাধীন ৬ শতাংশ জায়গায় ছয়তলা ভবন নির্মাণের অনুমোদন নিয়েছেন। এখানে তাঁর মোট সোয়া ৯ শতাংশের মতো জায়গা রয়েছে। পৌরসভার অনুমোদন নিয়েই ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবনের জায়গার বাইরে নির্মাণ করা সীমানাপ্রাচীরের কিছু অংশ নদীর মাঝখানে দেখা গেলেও ওই জায়গাও নিজের বলে দাবি করেন কামরুল হাসান। তিনি বলেন, নদীর পাড় থেকে ১০০ সাড়ে ৭ ফুট জায়গা। এর মধ্যে প্রায় ৬ শতাংশ আনুমানিক ৭০ ফুট জায়গাতে ছয়তলাবিশিষ্ট মূল ভবনের অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সীমানাপ্রাচীর যে জায়গায় শেষ হয়েছে, এর বাইরেও আরও অন্তত পাঁচ ফুট জায়গা তিনি পাবেন বলে দাবি করেন। এরপরও স্থানীয় সংসদ সদস্যের নির্দেশনা পাশাপাশি পৌরসভা থেকে রোববার এ–সংক্রান্ত একটি চিঠি দেওয়ায় সীমানাপ্রাচীরের কিছু অংশ অপসারণ করে নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে আজ রোববার কিশোরগঞ্জ পৌরসভার প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক জেবুন নাহার (শাম্মী) ভবনের মালিক কামরুল হাসানকে অবৈধ স্থাপনা অপসারণ ও অনুমোদন স্থগিতকরণ প্রসঙ্গে একটি চিঠি দিয়েছেন।
ওই চিঠিতে বলা হয়, সরেজমিনে দেখা গেছে, ওই জায়গায় বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডের (বিএনবিসি) আরোপিত শর্ত অমান্য করে অনুমোদিত নকশাবহির্ভূত নরসুন্দা নদীর মাঝবরাবর সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে। বিষয়টি ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ১৯৯৬, স্থানীয় সরকার আইন (পৌরসভা) ২০০৯, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫, প্রাকৃতিক জলাধার আইন ২০১০ ও পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ২০২৩–এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বিধিবহির্ভূতভাবে নরসুন্দা নদীর জায়গায় পানিপ্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে স্থাপনা নির্মাণের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ৩০ নভেম্বর জারীকৃত অনুমোদন স্থগিত করা হলো। এই পত্র প্রাপ্তির তিন দিনের মধ্যে অবৈধ স্থাপনা নিজ উদ্যোগে অপসারণ করার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হলো। অন্যথায় ইমারত নির্মাণ বিধিমোতাবেক যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আজ রোববার বেলা আড়াইটার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন নির্মাণশ্রমিক মিলে সীমানাপ্রাচীর ভেঙে অপসারণ করছেন। এ ছাড়া শহরের বড় বাজার, গৌরাঙ্গ বাজার, কাছারি বাজারসহ কয়েকটি জায়গায় দেখা যায়, ময়লা-আবর্জনা ও জবাই করা পশুর বর্জ্য ফেলা হচ্ছে নরসুন্দা নদীতে। দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ আশপাশের মানুষ। নদীপারের পথে (ওয়াকওয়ে) ও পদচারী-সেতু দিয়ে চলাচলকারী মানুষকে নাক চেপে ধরে চলাচল করতে দেখা গেছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) কিশোরগঞ্জ জেলা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, নরসুন্দা নদী রক্ষায় ২০১২ সালে নেওয়া হয় ১১০ কোটি টাকার প্রকল্প। প্রকল্পটির আওতায় কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর থেকে নীলগঞ্জ পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার পুনঃখনন ও পুনর্বাসনের কাজ করা হয়। এত টাকা ব্যয় করা হলেও নদী নাব্যতা ফিরে পায়নি। জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এলজিইডি ও কিশোরগঞ্জ পৌরসভা যৌথভাবে কাজটি করে। প্রকল্পের কাজ শেষ হয় ২০১৬ সালে। প্রকল্পের টাকা নিয়েও লুটপাটের অভিযোগ আছে।
নদীবিষয়ক আন্দোলনকারী ফয়সাল আহমেদসহ কয়েকজন জানান, দেশে অন্য সব নদ-নদীর মতো ধীরে ধীরে কিশোরগঞ্জ শহরবাসীর প্রাণের নরসুন্দাও মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বহুদিন ধরে নরসুন্দাকে বাঁচাতে আন্দোলন হচ্ছে, কিন্তু এর বিপরীতে তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। দ্রুত নরসুন্দা নদী খনন করে পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি সব ধরনের দখল ও দূষণমুক্ত করে নৌ চলাচল উপযোগী করা দরকার। এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তারা জানায়, সবাই চায় প্রবহমান স্বচ্ছ পানির নরসুন্দা দেখতে। পুনঃখনন ও পুনর্বাসন প্রকল্পে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। প্রশাসনের উচিত নদী ভরাটের উৎসব, অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করাসহ নদীর কচুরিপানা সরিয়ে নদীতে স্বচ্ছ পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি শহরের ময়লা-আবর্জনা, পলিথিনসহ অন্য কোনো ময়লায় যাতে নদীটি দূষিত না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সোচ্চার থাকা দরকার