ভোরের কুয়াশা তখনো কাটেনি। বেগুনি ফুলে ছেয়ে থাকা খেতের ভেতর দিয়ে হাঁটতেই চোখে পড়ে থোকা থোকা শিম। কোথাও কৃষক শিম তুলছেন, কোথাও মাচা ঠিক করছেন। শীতের হাওয়া এখনো জেঁকে বসেনি। অথচ খেত থেকে আগাম শিম উঠে যাচ্ছে বাজারে। মৌসুমের শুরুতে আগাম শিম বাজারে তুলতে পেরে কোনো কোনো কৃষক প্রতি কেজি ১৫০ টাকা দাম পেয়েছেন। তবে খেতে শিমের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমেছে দাম।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার জামালপুর ও পীরগঞ্জ উপজেলার খনগাঁও ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে এখন মাঠের পর মাঠ আগাম শিমের আবাদ। গত রোববার সকালে সদর উপজেলার বালিয়াখুড়ি ও পীরগঞ্জের চানগাঁও এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বেগুনি শিমফুলের ফাঁকে ফাঁকে কচি শিমের থোকা। কয়েকজন কৃষক খেতেই শিম বাছাই করে বস্তায় তুলছিলেন। সরবরাহ আরও বাড়ার আগেই ভালো দামে শিম বিক্রি করে লাভ তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছেন তাঁরা।
কৃষকেরা বলছেন, অন্য ফসলের তুলনায় শিম চাষে খরচ কম, ফলনও আসে দ্রুত। তাই মৌসুমের শুরুতে বাজারে শিম তুলতে পারলে ভালো দাম মেলে। কিন্তু একসঙ্গে অনেক কৃষকের শিম বাজারে উঠলে দ্রুতই দাম কমে যায়। ফলে আগাম শিমে যেমন লাভের সম্ভাবনা আছে, তেমনি দর পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও আছে।
কৃষকের কাছ থেকে পাইকাররা এখন শিম কিনছেন ৮৫ টাকা কেজি। পরে তা আড়তে বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকায়। আর ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি বাজারে ভোক্তাকে একই শিম কিনতে হচ্ছে ১৪০ টাকা কেজি।
শুরুর দাম আর নেই
সদর উপজেলার বালিয়াখুড়ি গ্রামের কৃষক দেলোয়ার হোসেন ২৫ শতক জমিতে শিম চাষ করেছেন। এ পর্যন্ত চার দফায় শিম তুলেছেন তিনি। প্রথম দফায় ১০ কেজি শিম বিক্রি করেছেন প্রতি কেজি ১৫০ টাকায়। দ্বিতীয় দফায় ১৮ কেজি ১২০ টাকায়, তৃতীয় দফায় ৩০ কেজি ১০০ টাকায়। সর্বশেষ ১০০ কেজি বিক্রি হয়েছে ৮৫ টাকা দরে। চার দফায় তাঁর ১৫ হাজার টাকার শিম বিক্রি হয়েছে।
দেলোয়ার বলেন, ২৫ শতক জমিতে বীজ, সার, কীটনাশক ও মাচা তৈরিতে তাঁর খরচ হয়েছে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা। খেতে এখনো অনেক শিম আছে। দাম ভালো থাকলে খরচ উঠে লাভ হবে বলে আশা করছেন তিনি।
পীরগঞ্জের চানগাঁও গ্রামের হামিদুল ইসলাম (৪৮) এবার ৩৩ শতক জমিতে শিম চাষ করেছেন। ইতিমধ্যে দুই মণ শিম বিক্রি করেছেন। তিনি বলেন, শুরুতে বিক্রি করেছেন প্রতি কেজি ১৪০ টাকায়, আর গত শনিবার বিক্রি করেছেন ৯০ টাকায়। তিনি জানান, মৌসুমের শুরুতে দাম ভালো থাকে বলেই আগেভাগে শিম চাষ করেন।
একই উপজেলার শিমুলপুর গ্রামের সাদেকুল ইসলাম (৩৫) ছয় বছর ধরে ২৫ শতক জমিতে আগাম শিম চাষ করছেন। এবার তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ২৩ হাজার টাকা। এরই মধ্যে দুই দফায় এক মণ শিম বিক্রি করেছেন। গত বছর একই জমি থেকে পেয়েছিলেন প্রায় ৯০ মণ শিম। শুরুতে ১৫০ টাকা কেজি বিক্রি করলেও পরে দাম দ্রুত কমে যায়। একপর্যায়ে প্রতি কেজি ১০ টাকায়ও বেচতে হয়েছিল বলে জানান তিনি।
বালিয়াখুড়ি গ্রামের পরিমল রায় (৫৮) এবার ৫০ শতক জমিতে আগাম শিমের চাষ করেছেন। এ পর্যন্ত দুই মণ শিম বিক্রি করেছেন। দুই দিন আগে ৫৫ কেজি শিম বিক্রি করেছেন, প্রতি কেজি ১১০ টাকায়। আর শনিবার সকালে ২৫ কেজি বিক্রি করেছেন প্রতি কেজি ৮৫ টাকায়।
পরিমলের পাশের ১৫ শতক জমিতে ১০ বছর ধরে আগাম শিমের চাষ করছেন চানগাঁওয়ের আশরাফুল ইসলাম (৫৫)। এ বছর তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ১২ হাজার টাকা। এরই মধ্যে প্রায় ১০ হাজার টাকার শিম বিক্রি করেছেন।
আগাম শিম চাষে ঝুঁকিও আছে। চানগাঁও গ্রামের কৃষক শরিফুল ইসলাম (৬২) বলেন, অতিবৃষ্টি, অসময়ে বৃষ্টি ও তীব্র গরমে শিমগাছের ফুল ঝরে যায়। কখনো শিকড় পচে যায়। এ ছাড়া ফল ছিদ্রকারী পোকা ও জাব পোকার (এই পোকা গাছের পাতা, কাণ্ড, ফুল ও কচি ফলের রস চুষে খায়) আক্রমণও হয়। তখন বাড়তি বালাইনাশক ব্যবহার করতে হয়। আবহাওয়া খারাপ হলে উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়।
কৃষকের কাছে ৮৫, ভোক্তার কাছে ১৪০
খেত থেকে বাজারে যাওয়ার পথে শিমের দামের ব্যবধানও চোখে পড়ার মতো। কৃষকের কাছ থেকে পাইকাররা এখন শিম কিনছেন ৮৫ টাকা কেজিতে। পরে তা আড়তে বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকায়। আর ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি বাজারে ভোক্তাকে একই শিম কিনতে হচ্ছে ১৪০ টাকা কেজি।
কৃষকের খেত থেকে আড়তে শিম সরবরাহ করেন পীরগঞ্জের লোহাগাড়া গ্রামের জহিরুল ইসলাম (৩৭)। তিনি বলেন, খেত থেকে শিম কেনার পর বাছাই করতে হয়। এতে কিছু শিম বাদ পড়ে। এরপর যোগ হয় শ্রমিক ও পরিবহন খরচ। সব খরচ হিসাব করেই বিক্রির দাম ঠিক করতে হয়।
ঠাকুরগাঁও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে শীতকালীন সবজির আবাদের লক্ষ্যমাত্রা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। তবে গত বছর জেলায় ৫৪৫ হেক্টর জমিতে আগাম শিমের আবাদ হয়েছিল। এসব শিম জেলার চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করা হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ঠাকুরগাঁও কার্যালয়ের উপপরিচালক মাজেদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ঠাকুরগাঁও সবজি চাষের জন্য উপযোগী। আগাম শিমসহ শীতকালীন সবজি চাষে কৃষকদের আগ্রহ আছে। সাধারণত মার্চ-এপ্রিলে আগাম শিমের বীজ বপন করা হয়, মে-জুনেও বপন চলে। কৃষকদের মানসম্মত বীজ সরবরাহের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আবাদ ভালো হয়েছে। তবে সরবরাহ বাড়লে দাম কমে আসে, তাই কৃষকদের বাজার পরিস্থিতির দিকে খেয়াল রাখতে হবে।