
মানিকগঞ্জে কৃষিজমিতে কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন কৃষকেরা। কীটনাশকের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে মাঠপর্যায়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক (বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইনডিজেনাস নলেজ) পরিচালিত এক সমীক্ষায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে মানিকগঞ্জ প্রেসক্লাব মিলনায়তনে ‘জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব’ শীর্ষক মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানমূলক সমীক্ষার ফল প্রকাশ করে বারসিক। এ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সমীক্ষার তথ্য উপস্থাপন করেন বারসিকের গবেষণা সহকারী গাজী নাফিউর রহমান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বারসিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী বিমল চন্দ্র রায়।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বারসিকের সভাপতি অধ্যাপক মনোয়ার হোসেন, মানিকগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বিশ্বাস, বারসিক কর্মকর্তা নজরুল ইসলামসহ স্থানীয় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকেরা।
সমীক্ষায় জানানো হয়, মানিকগঞ্জের চারটি উপজেলায় কীটনাশক ব্যবহারকারী ২১ জন কৃষকের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে ১৮ জনই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। তাঁদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, ডায়েরিয়া, দুর্বলতা, উচ্চ রক্তচাপ, বিষণ্নতা, অরুচি, খিঁচুনি, স্নায়বিক সমস্যা, চর্মরোগ ও ঘুমজনিত সমস্যার প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। এ ছাড়া তাঁদের ১০টি গরু, ১১টি হাঁস এবং ১টি পুকুরের মাছ মারা গেছে। এতে আনুমানিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১১ লাখ ৮৮ হাজার ৫০০ টাকা।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাজারে নিষিদ্ধ চারটি কীটনাশক—কার্বোফুরান, প্যারাকোয়াট, গ্লাইফোসেট ও অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইডের পাশাপাশি বিপজ্জনক অনেক কীটনাশক এখনো সহজলভ্য। কৃষকেরা এক মৌসুমে গড়ে ২৬ হাজার ৭৫৭ টাকার কীটনাশক কিনছেন। যদিও সরাসরি কীটনাশকে কারও মৃত্যুর ঘটনা পাওয়া যায়নি, তবে অনেকেই গুরুতর অসুস্থ হয়েছেন এবং ঘরোয়া চিকিৎসায় সেরে উঠেছেন বলে জানানো হয়।
সমীক্ষা আরও বলছে, অধিকাংশ কৃষক কীটনাশকের গায়ে লেখা সতর্কতা বোঝেন না। কেউ কেউ জানেন যে এটি ক্ষতিকর; তবে তা গবাদিপশু ও পরিবেশের ওপর কী প্রভাব ফেলে, সে সম্পর্কে তাঁরা জানেন না। অনেকে দোকানদারের পরামর্শে কীটনাশক প্রয়োগ করেন।
বারসিকের মতে, কৃষকদের অসচেতনতা, নিষিদ্ধ কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, বাজারজাতকরণে দুর্বল মনিটরিং এবং তথ্যপ্রযুক্তির অভাব মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। এ ছাড়া কৃষি বিভাগ, বিপণন ব্যবস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সব পর্যায়ে তথ্যঘাটতি বিদ্যমান।
গবেষকেরা বলছেন, বছরের পর বছর কৃষকেরা ক্ষতিকর কীটনাশক ব্যবহার করে আসছেন। এসব বিষাক্ত রাসায়নিকের প্রভাবে শুধু ফসল নয়, মানবস্বাস্থ্য ও প্রাণবৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে।