
নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের জন্য নির্মাণাধীন বীরনিবাসে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগে ফেস্টুন নিয়ে বসে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন এক বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। সোমবার দুপুর ১২টার দিকে উপজেলা পরিষদের ফটকের সামনে এ কর্মসূচি পালন করেন তিনি।
প্রতিবাদকারী তরুণের নাম সাকিব মোল্লা (২৩)। তিনি উপজেলার একদুয়ারিয়া ইউনিয়নের বাসুলীকান্দি গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা মৃত মোহাম্মদ উল্লাহ মোল্লার ছেলে এবং ঢাকার সরকারি তিতুমীর কলেজের ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র।
এ সময় ব্যাগে ভরে নিয়ে আসা নির্মাণকাজে ব্যবহৃত ইট, বালুসহ বিভিন্ন সামগ্রী উপস্থিত লোকজনকে দেখান সাকিব। তাঁর পেছনে থাকা ফেস্টুনে লেখা ছিল ‘অনিয়ম-দুর্নীতিমুক্ত উপহার দিন, না হলে উপহার ফিরিয়ে নিন’, ‘প্রধানমন্ত্রীর উপহার বীরনিবাস নির্মাণ প্রকল্পে দুর্নীতি কেন’, ‘উপহারের নামে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রতিকার চাই’।
মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে সারা দেশে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের অংশ হিসেবে মনোহরদীতে ১০ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার জন্য তিন কক্ষের ‘বীরনিবাস’ নির্মাণ করে দেওয়া হচ্ছে। গৃহহীন ও ভূমিহীন হওয়ায় মাকে নিয়ে নানাবাড়িতে বসবাস করছেন সাকিব মোল্লা। এতে বীরনিবাসে একটি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয় মুক্তিযোদ্ধা পরিবারটিকে।
বীরনিবাস নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ এনে এর আগে গত ৩০ আগস্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ উল্লাহ মোল্লার স্ত্রী রুবি বেগম। এরপর ১২ দিন পেরিয়ে গেলেও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় আজ অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন সাকিব মোল্লা।
আধা ঘণ্টা ধরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করার পর সাকিব মোল্লাকে নিজ অফিস কক্ষে ডেকে নিয়ে যান ইউএনও এ এস এম কাশেম।
সাকিব মোল্লা বলেন, ‘এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন ইউএনও। এরপর আমি চলে আসি। পরে ইউএনওর নির্দেশে ওই বীরনিবাস পরিদর্শনে যান উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা।’
জানতে চাইলে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ফখরুদ্দিন রাজি বলেন, ‘আমি যা দেখেছি, সে বিষয়ে ইউএনও মহোদয়কে জানাব।’
অভিযুক্ত ঠিকাদার সুমন বর্মণ উপজেলা আওয়ামী লীগের সহপ্রচার সম্পাদক। জানতে চাইলে মুঠোফোনে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এরই মধ্যে বীরনিবাস প্রকল্পের নয়টি ঘর নির্মাণ শেষ হয়েছে—ওই পরিবারগুলো আমার কাজে সন্তুষ্ট। কিন্তু সাকিব মোল্লার আমার কাজ পছন্দ না। তাঁর আপত্তির কারণে দীর্ঘদিন ওই বীরনিবাস নির্মাণের কাজ বন্ধ রেখেছিলাম। সম্প্রতি সম্পন্ন হওয়া নয়টি বীরনিবাস নির্মাণকাজের বিল জমা দিতে গিয়েছিলাম। এ সময় উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সব কটি ঘরের কাজ শেষ না হলে বিল উঠানো যাবে না বলে জানান। পরে নিজে ইটভাটায় গিয়ে সবচেয়ে ভালো ইট কিনে এনে গত শনিবার থেকে বাকি ঘরটির কাজ শুরু করি। এরপরও সাকিবের ভাষ্য, এই ইট দুই নম্বর।’
গত ৩০ আগস্ট দেওয়া লিখিত অভিযোগে সাকিব মোল্লার মা রুবি বেগম উল্লেখ করেন, তাঁদের জন্য বরাদ্দ ওই ঘরের নির্মাণকাজে নিম্নমানের ইট, বালুসহ অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁরা সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে বারবার বললেও তিনি বলেন, এসব সামগ্রী দিয়েই কাজ চলবে। এ নিয়ে কাউকে কিছু বলে লাভ হবে না।
মুঠোফোনে সাকিব মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুরু থেকেই বীরনিবাসের নির্মাণকাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে। এর প্রতিকার চেয়ে আমার মা ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। এত দিনেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আমি কয়েক দফা বাধা দিলেও তাঁরা নির্মাণকাজ বন্ধ রাখছেন না। তাই বাধ্য হয়ে আজ অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছি।’
জানতে চাইলে ইউএনও এ এস এম কাশেম প্রথম আলোকে বলেন, ‘উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে বীরনিবাসের নির্মাণকাজ দেখে আসার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁর কাছ থেকে বিস্তারিত জেনে আমি নিজেও সেখানে যাব। কোনো ধরনের অনিয়মের সত্যতা পেলে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হবে।’