চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির সভাপতি পদে তারিক আহমদ (বাঁয়ে) ও সাধারণ সম্পাদক পদে মো. মঈনুদ্দীন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন
চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির সভাপতি পদে তারিক আহমদ (বাঁয়ে) ও সাধারণ সম্পাদক পদে মো. মঈনুদ্দীন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন

চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির ‘একতরফা’ নির্বাচনে বিএনপিপন্থীদের জয়

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ সব কটি পদে বিএনপিপন্থী আইনজীবী ঐক্য ফোরামের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সমর্থক আইনজীবীরা বাধার মুখে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে পারেননি। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী–সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ আইনজীবী পরিষদ মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করলেও নির্বাচন কমিশনের প্রতি অনাস্থা এনে তারা নির্বাচন বর্জন করে।

সমিতির সভাপতি পদে আইনজীবী ঐক্য পরিষদের তারিক আহমদ ও সাধারণ সম্পাদক পদে মো. মঈনুদ্দীন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এ ছাড়া বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত অন্যরা হলেন সিনিয়র সহসভাপতি সেলিমা খানম, সহসাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম, অর্থ সম্পাদক আবুল মনছুর সিকদার, পাঠাগার সম্পাদক তৌহিদ হোছাইন সিকদার, সাংস্কৃতিক সম্পাদক বিলকিস আরা মিতু, ক্রীড়া সম্পাদক মো. সরোয়ার হোসাইন লাভলু, তথ্য ও প্রযুক্তি সম্পাদক মো. লোকমান শাহ। নির্বাচন কমিশন থেকে বলা হয়, এসব পদে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় তাঁদের বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে।

সম্পাদকীয় ১০টি পদের মধ্যে ৯ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। তবে সহসভাপতি পদে আইনজীবী ঐক্য ফোরামের নিলুফার ইয়াসমিন লাভলী ১ হাজার ৭৬৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাহী সদস্য পদেও ঐক্য ফোরাম ও ঐক্যবদ্ধ আইনজীবী পরিষদের মোট ২২ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এর মধ্যে ফোরামের ১১ বিজয়ী সদস্য হলেন আলী আকবর, দিদারুল আলম, দিলদার আহমেদ ভূঁইয়া, মো. ইকবাল হোসেন, মো. জসিম উদ্দিন, মোহাম্মদ হাসান, মোকতার উদ্দিন, মোমেনুল হক, সাদিয়া খান, সাইফুল ইসলাম ও শেখ মো. ফয়সাল উদ্দিন। বিজয়ী সবাই বিএনপি–সমর্থিত। জামায়াত–সমর্থিত প্রার্থীরা নির্বাচন বর্জন করলেও ব্যালটে তাঁদের নাম থেকে যাওয়ায় ভোট পড়ে।

নির্বাচন কমিশন একতরফা নির্বাচন আয়োজন করেছে বলে অভিযোগ আওয়ামী লীগ ও জামায়াতপন্থী আইনজীবীদের। জামায়াত–সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ আইনজীবী পরিষদ ৬ মে এক সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়। ১৭ মে নির্বাচন কমিশনার, তফসিল ও নির্বাচন বাতিলের দাবিতে আদালতে মামলা করে। তারা নির্বাচন স্থগিত চেয়েও আদালতে আবেদন করে। একই দাবিতে জামায়াতপন্থী সংগঠনটি ১৯ মে এক তলবি সভার আহ্বান করেছিল। এতে নির্বাচনের পক্ষে ভোট পড়ে ২৮৯ ভোট আর বিপক্ষে ভোট পড়ে ১৭১। এদিকে নির্বাচন বর্জনের দাবিতে এক সপ্তাহ ধরে আদালতপাড়ায় বিক্ষোভ মিছিল ও কালো পতাকা মিছিল করে আসছেন আওয়ামী ও জামায়াত–সমর্থিত আইনজীবীরা।

মুখ্য নির্বাচন কর্মকর্তা রৌশন আরা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপি–সমর্থিত আইনজীবী ঐক্য ফোরামের প্রার্থীরা পূর্ণ প্যানেলে ২১টি পদের সব কটিতে বিজয়ী হয়েছেন। সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ ১০ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ১টি সহসভাপতি ও ১১টি সদস্য পদে ভোট হয়েছে। সমিতিতে এবার ভোটার হয়েছেন ৪ হাজার ৫০০ জন। এর মধ্যে ২ হাজার ১৬০ সদস্য ভোট দিয়েছেন।

নির্বাচনে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আদালত এলাকায় বিপুল পরিমাণ পুলিশ মোতায়েন করা হয়। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না দেওয়ার অভিযোগ এনে একতরফা নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা দিনভর আদালত এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করেছেন। জামায়াতপন্থী আইনজীবীরাও নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়ে মিছিল ও দুপুর থেকে নির্বাচনী প্রচার ক্যাম্পের সামনে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে মানববন্ধন করেছেন। নির্বাচনের প্রতিবাদে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা শাপলা ভবনের সামনে প্রতিবাদী গান করেন।

আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবী ও জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এইচ এম জিয়া উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, সমিতির ১৩৩ বছরের ইতিহাসে কখনো ভোটবিহীন বা ‘অটো কমিটি’ গঠনের নজির নেই। অতীতেও, এমনকি করোনাকালেও সমিতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হয়েছে। তিনি বলেন, জামায়াতপন্থী আইনজীবীরাও ইতিমধ্যে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। বর্তমান নির্বাচন কমিশন একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে সমিতির ঐতিহ্য নষ্ট করছেন।

জানতে চাইলে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম চট্টগ্রামের সদস্যসচিব কামরুল ইসলাম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দল-সমর্থিত আইনজীবীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের পরিবেশ নেই। তাই তাঁদের অংশগ্রহণের সুযোগও নেই।

দুই সাংবাদিক লাঞ্ছিত

চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহের সময় দুই সাংবাদিককে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন চ্যানেল ওয়ান চট্টগ্রামের ব্যুরোর প্রধান শাহনেওয়াজ রিটন ও ক্যামেরাপারসন অমিত দাস। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে এ ঘটনা ঘটে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, শাহনেওয়াজ রিটন বুম হাতে লাইভে যুক্ত ছিলেন। তিনি ভোট গ্রহণ কক্ষে মুখ্য ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা রৌশন আরার কাছে জানতে চান, সাংবাদিকদের সংবাদ সংগ্রহে কোনো বাধা আছে কি না। জবাবে রৌশন আরা কোনো বাধা নেই বলে জানান। এরপর রিটন তাঁদের বাধা দেওয়া হয়েছে জানালে রৌশন আরা বলতে থাকেন, ‘এখন দুপুর হয়েছে। কেউ নামাজ পড়তে গেছে। কেউ ভাত খেতে গেছে। এখন আপনি এসে খালি ভোট গ্রহণ কক্ষের....।’ কথা শেষ না হতেই আরেকজন নির্বাচন কর্মকর্তা রিটনকে বলেন, ‘আপনি এ পর্যন্ত সাতবার এখানে ঢুকেছেন। বারবার আপনাকে বলা হয়েছে। আপনি বিদায় নিয়ে বের হয়েও আবার ঢুকেছেন।’ এর মধ্যেই কয়েকজন আইনজীবী শাহনেওয়াজ রিটনকে ‘ফ্যাসিস্টের ভাষায় কথা বলছেন’ বলে আক্রমণ করে চিৎকার করতে করতে লাইভের মাঝপথে কক্ষ থেকে বের করে দেন।